| বিশ্লেষণ

গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতির বইয়ের প্রচ্ছদকে গ্রেটার বাংলাদেশ-এর ম্যাপ দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিক অপপ্রচার

২৫ জানুয়ারী ২০২৬


গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতির বইয়ের প্রচ্ছদকে গ্রেটার বাংলাদেশ-এর ম্যাপ দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিক অপপ্রচার

ভারতীয় মূলধারার একাধিক গণমাধ্যম সম্প্রতি “গ্রেটার বাংলাদেশ” নামে একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ঘিরে ধারাবাহিক গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। একটি গ্রাফিতির ছবিকে কেন্দ্র করে তারা নিয়মিত মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করছে, যার কয়েকটিতে বিষয়টিকে “যুদ্ধ পরিকল্পনা” পর্যন্ত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। 

গত ৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড মোহাম্মদ ইউনূসের সাথে তুর্কি সংসদীয় প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎকালে প্রধান উপদেষ্টা তাঁদেরকে Art of Triumph নামক গ্রাফিতির একটি বইটি উপহার দেন। বইটির প্রচ্ছদে শহীদ আবু সাইদ ও বাংলাদেশের মানচিত্রভিত্তিক একটি দেয়ালচিত্র (গ্রাফিতি) আঁকা রয়েছে।

প্রচ্ছদে আঁকা এই গ্রাফিতিতে কেন্দ্র করেই “ড ইউনূস তুর্কি কর্মকর্তাদের একটি “Greater Bangladesh” মানচিত্র উপহার দিয়েছে্ন” মর্মে ভারতের মূলধারার মিডিয়া ফিনানসিয়াল এক্সপ্রেস, ফার্স্ট পোস্ট, ইন্ডিয়া ডট কম, এবিপি লাইভ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গ্রাফিতির বইকে ডকুমেন্ট আখ্যা দিয়ে এর মধ্যে “যুদ্ধ পরিকল্পনা” আছে বলেও বায়বীয় সূত্রের বরাতে দাবি করেছে নিউজ এইটিন

প্রধান উপদেষ্টা যে বইটি উপহার দিয়েছেন, সেটি মূলত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে আঁকা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত গ্রাফিতির সংকলন। ওই অভ্যুত্থানের পরের মাসেই, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, ড. মোহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৭৯তম অধিবেশনে যোগ দেন। সেখানে তিনি জো বাইডেন, বিল ক্লিন্টন, জাস্টিন ট্রুডোসহ বিশ্বনেতাদেরকে এই বইটি উপহার দেন।  

পরবর্তীতে আরও অনেক কুটনীতিক, প্রতিনিধি, ও বিশ্বনেতাদের তিনি এই বই উপহার দিয়েছেন। এমনকি গত বছর ৯ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির সাক্ষাতের সময়ও প্রধান উপদেষ্টা তাঁকে এই বইটি দেখান। এ বছর জানুয়ারিতে তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রীকে ড ইউনূস বইটি উপহার দেন (দেখুন ছবি)।

বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গকে ড. ইউনূসের “Art of Triumph” বইটি উপহার দেয়ার ছবি দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, ও এখানে

বইটির প্রচ্ছদে যে মানচিত্রের ছবি দেখা যায়, সেটি মূলত একটি গ্রাফিতি চিত্র—যা কোনো পেশাদার শিল্পী বা সরকারি উদ্যোগে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আঁকা। স্বাভাবিকভাবেই, এ ধরনের গ্রাফিতি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক মানচিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি পরিমিত (perfect)ভাবে মেলেনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে চিত্রটিতে বাংলাদেশের বাইরে কোনো ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বইটির এই প্রচ্ছদকেই তথাকথিত “গ্রেটার বাংলাদেশ”-এর প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন শুরু করে ভারতীয় গণমাধ্যম গত ১৫ অক্টোবর, যখন প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস পাকিস্তানের যৌথ বাহিনীর চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সময় বইটি উপহার দেওয়ার একটি ছবিকে ঘিরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচার শুরু করে যে, ড. ইউনূস নাকি পাকিস্তানি জেনারেলকে এমন একটি মানচিত্র উপহার দিয়েছেন যেখানে বাংলাদেশের পতাকায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সংযুক্ত করা হয়েছে। (দেখুন, ইন্ডিয়া টুডে, দ্যা ইকোনমিক টাইমস, হিন্দুস্তান টাইমস, বেনিফিট নিউজ)   

তবে “গ্রেটার বাংলাদেশ” সংক্রান্ত প্রপাগান্ডা এবারই প্রথম নয়। এর আগে চলতি বছরের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেও ব্যাপক গুজব ছড়ানো হয়, যা ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত দেশটির পার্লামেন্ট পর্যন্ত গড়ায়।

গত ১৭ মে ভারতীয় গণমাধ্যম The Economic Times ‘বাংলাদেশে তুরস্ক-সমর্থিত গোষ্ঠী ভারতের ভূখণ্ডসহ 'গ্রেটার বাংলাদেশ' মানচিত্র প্রচার করছে’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দেশটির আরো অন্তত দশটি গণমাধ্যম একই ধরনের সংবাদ পরিবেশন করে।এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তুরস্কভিত্তিক একটি এনজিও নাকি বাংলাদেশে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’-এর মানচিত্র প্রচার করছে।

বাংলাফ্যাক্ট তখন অনুসন্ধান করে দেখায়, ভারতীয় গণমাধ্যমে উল্লেখিত ‘সালতানাত-ই-বাংলা’ নামে কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব বা কার্যক্রমের প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ (CBS) নামের একটি সংগঠন ‘ভালো কাজের হালখাতা’ শিরোনামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। সেখানে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাংলা সালতানাতের মানচিত্র প্রদর্শন করা হয়—যা ছিল ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী, তথাকথিত “গ্রেটার বাংলাদেশ”-এর মানচিত্র নয়।

সিবিএস কোনো এনজিও নয় এবং তুরস্ক ভিত্তিক সংগঠনও নয় বলেও নিশ্চিত হয় বাংলাফ্যাক্ট। বাংলাফ্যাক্টের বিস্তারিত প্রতিবেদন দেখুন এখানে

অথচ ওই প্রদর্শনীর একটি ছবিকেই কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যমে এমন মাত্রায় অপপ্রচার চালানো হয় যে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত দেশটির পার্লামেন্ট পর্যন্ত গড়ায়। গত ৩১ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় কংগ্রেস দলের সংসদ সদস্য রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা “গ্রেটার বাংলাদেশ” প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। এর জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এক লিখিত বিবৃতিতে বাংলাফ্যাক্টকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাফ্যাক্ট’ বলেছে, ‘সালতানাত-ই-বাংলা’ নামে কোনো সংগঠনের অস্তিত্বের প্রমাণ তারা পায়নি। তারা আরও জানিয়েছে, যে মানচিত্রটি দেখানো হয়েছে, তা ছিল ইতিহাসভিত্তিক একটি প্রদর্শনীর অংশ, যেখানে প্রাচীন বাংলার সালতানাত বা ‘সুলতানাত’-এর সময়ের মানচিত্র দেখানো হয়েছিল। এই প্রদর্শনীটি ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয়। আয়োজকরা জানিয়েছেন, তাদের কোনো বিদেশি রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই।’ বিস্তারিত দেখুন এখানে

একটি বইয়ের প্রচ্ছদের ছবিকে কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে প্রপাগান্ডা ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করছে। বাস্তবতা হচ্ছে, এটি ছিল অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে শিক্ষার্থীদের হাতে আঁকা দেয়াললিখন/গ্রাফিতির একটি ছবি। এই ছবিকে কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যমে চলমান ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ প্রপাগান্ডা যেমন ভিত্তিহীন, তেমনি হাস্যকরও বটে।  






Topics:

গ্রেটার বাংলাদেশ

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙা নিয়ে অপপ্রচার
বিভ্রান্তিকর
২২ জানুয়ারী ২০২৬

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙা নিয়ে অপপ্রচার

গণশিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যের খণ্ডাংশ নিয়ে বিভ্রান্তিকর শিরোনামে কালের কণ্ঠের সংবাদ প্রকাশ
২০ জানুয়ারী ২০২৬

গণশিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যের খণ্ডাংশ নিয়ে বিভ্রান্তিকর শিরোনামে কালের কণ্ঠের সংবাদ প্রকাশ

গণশিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যের খণ্ডাংশ নিয়ে কালের কণ্ঠের বিভ্রান্তিকর শিরোনাম
২০ জানুয়ারী ২০২৬

গণশিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যের খণ্ডাংশ নিয়ে কালের কণ্ঠের বিভ্রান্তিকর শিরোনাম

সংশয় নয়, বরং দ্য পোস্ট নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা বিষয়ে উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে
২০ জানুয়ারী ২০২৬

সংশয় নয়, বরং দ্য পোস্ট নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা বিষয়ে উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে

বাংলাদেশিদের সব ধরনের ভিসা স্থগিত করেনি যুক্তরাষ্ট্র
১৫ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশিদের সব ধরনের ভিসা স্থগিত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

আপনার মতামত দিন

এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?

এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!

0%

0%

আপনার মতামত শেয়ার করুন:

| মন্তব্য সমূহ:

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!



গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতির বইয়ের প্রচ্ছদকে গ্রেটার বাংলাদেশ-এর ম্যাপ দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিক অপপ্রচার

বিশ্লেষণ

গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতির বইয়ের প্রচ্ছদকে গ্রেটার বাংলাদেশ-এর ম্যাপ দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিক অপপ্রচার

২৫ জানুয়ারী ২০২৬

<p>গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতির বইয়ের প্রচ্ছদকে গ্রেটার বাংলাদেশ-এর ম্যাপ দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিক অপপ্রচার</p>

ভারতীয় মূলধারার একাধিক গণমাধ্যম সম্প্রতি “গ্রেটার বাংলাদেশ” নামে একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ঘিরে ধারাবাহিক গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। একটি গ্রাফিতির ছবিকে কেন্দ্র করে তারা নিয়মিত মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করছে, যার কয়েকটিতে বিষয়টিকে “যুদ্ধ পরিকল্পনা” পর্যন্ত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। 

গত ৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড মোহাম্মদ ইউনূসের সাথে তুর্কি সংসদীয় প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎকালে প্রধান উপদেষ্টা তাঁদেরকে Art of Triumph নামক গ্রাফিতির একটি বইটি উপহার দেন। বইটির প্রচ্ছদে শহীদ আবু সাইদ ও বাংলাদেশের মানচিত্রভিত্তিক একটি দেয়ালচিত্র (গ্রাফিতি) আঁকা রয়েছে।

প্রচ্ছদে আঁকা এই গ্রাফিতিতে কেন্দ্র করেই “ড ইউনূস তুর্কি কর্মকর্তাদের একটি “Greater Bangladesh” মানচিত্র উপহার দিয়েছে্ন” মর্মে ভারতের মূলধারার মিডিয়া ফিনানসিয়াল এক্সপ্রেস, ফার্স্ট পোস্ট, ইন্ডিয়া ডট কম, এবিপি লাইভ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গ্রাফিতির বইকে ডকুমেন্ট আখ্যা দিয়ে এর মধ্যে “যুদ্ধ পরিকল্পনা” আছে বলেও বায়বীয় সূত্রের বরাতে দাবি করেছে নিউজ এইটিন

প্রধান উপদেষ্টা যে বইটি উপহার দিয়েছেন, সেটি মূলত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে আঁকা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত গ্রাফিতির সংকলন। ওই অভ্যুত্থানের পরের মাসেই, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, ড. মোহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৭৯তম অধিবেশনে যোগ দেন। সেখানে তিনি জো বাইডেন, বিল ক্লিন্টন, জাস্টিন ট্রুডোসহ বিশ্বনেতাদেরকে এই বইটি উপহার দেন।  

পরবর্তীতে আরও অনেক কুটনীতিক, প্রতিনিধি, ও বিশ্বনেতাদের তিনি এই বই উপহার দিয়েছেন। এমনকি গত বছর ৯ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির সাক্ষাতের সময়ও প্রধান উপদেষ্টা তাঁকে এই বইটি দেখান। এ বছর জানুয়ারিতে তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রীকে ড ইউনূস বইটি উপহার দেন (দেখুন ছবি)।

বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গকে ড. ইউনূসের “Art of Triumph” বইটি উপহার দেয়ার ছবি দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, ও এখানে

বইটির প্রচ্ছদে যে মানচিত্রের ছবি দেখা যায়, সেটি মূলত একটি গ্রাফিতি চিত্র—যা কোনো পেশাদার শিল্পী বা সরকারি উদ্যোগে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আঁকা। স্বাভাবিকভাবেই, এ ধরনের গ্রাফিতি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক মানচিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি পরিমিত (perfect)ভাবে মেলেনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে চিত্রটিতে বাংলাদেশের বাইরে কোনো ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বইটির এই প্রচ্ছদকেই তথাকথিত “গ্রেটার বাংলাদেশ”-এর প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন শুরু করে ভারতীয় গণমাধ্যম গত ১৫ অক্টোবর, যখন প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস পাকিস্তানের যৌথ বাহিনীর চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সময় বইটি উপহার দেওয়ার একটি ছবিকে ঘিরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচার শুরু করে যে, ড. ইউনূস নাকি পাকিস্তানি জেনারেলকে এমন একটি মানচিত্র উপহার দিয়েছেন যেখানে বাংলাদেশের পতাকায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সংযুক্ত করা হয়েছে। (দেখুন, ইন্ডিয়া টুডে, দ্যা ইকোনমিক টাইমস, হিন্দুস্তান টাইমস, বেনিফিট নিউজ)   

তবে “গ্রেটার বাংলাদেশ” সংক্রান্ত প্রপাগান্ডা এবারই প্রথম নয়। এর আগে চলতি বছরের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেও ব্যাপক গুজব ছড়ানো হয়, যা ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত দেশটির পার্লামেন্ট পর্যন্ত গড়ায়।

গত ১৭ মে ভারতীয় গণমাধ্যম The Economic Times ‘বাংলাদেশে তুরস্ক-সমর্থিত গোষ্ঠী ভারতের ভূখণ্ডসহ 'গ্রেটার বাংলাদেশ' মানচিত্র প্রচার করছে’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দেশটির আরো অন্তত দশটি গণমাধ্যম একই ধরনের সংবাদ পরিবেশন করে।এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তুরস্কভিত্তিক একটি এনজিও নাকি বাংলাদেশে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’-এর মানচিত্র প্রচার করছে।

বাংলাফ্যাক্ট তখন অনুসন্ধান করে দেখায়, ভারতীয় গণমাধ্যমে উল্লেখিত ‘সালতানাত-ই-বাংলা’ নামে কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব বা কার্যক্রমের প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ (CBS) নামের একটি সংগঠন ‘ভালো কাজের হালখাতা’ শিরোনামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। সেখানে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাংলা সালতানাতের মানচিত্র প্রদর্শন করা হয়—যা ছিল ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী, তথাকথিত “গ্রেটার বাংলাদেশ”-এর মানচিত্র নয়।

সিবিএস কোনো এনজিও নয় এবং তুরস্ক ভিত্তিক সংগঠনও নয় বলেও নিশ্চিত হয় বাংলাফ্যাক্ট। বাংলাফ্যাক্টের বিস্তারিত প্রতিবেদন দেখুন এখানে

অথচ ওই প্রদর্শনীর একটি ছবিকেই কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যমে এমন মাত্রায় অপপ্রচার চালানো হয় যে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত দেশটির পার্লামেন্ট পর্যন্ত গড়ায়। গত ৩১ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় কংগ্রেস দলের সংসদ সদস্য রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা “গ্রেটার বাংলাদেশ” প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। এর জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এক লিখিত বিবৃতিতে বাংলাফ্যাক্টকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাফ্যাক্ট’ বলেছে, ‘সালতানাত-ই-বাংলা’ নামে কোনো সংগঠনের অস্তিত্বের প্রমাণ তারা পায়নি। তারা আরও জানিয়েছে, যে মানচিত্রটি দেখানো হয়েছে, তা ছিল ইতিহাসভিত্তিক একটি প্রদর্শনীর অংশ, যেখানে প্রাচীন বাংলার সালতানাত বা ‘সুলতানাত’-এর সময়ের মানচিত্র দেখানো হয়েছিল। এই প্রদর্শনীটি ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয়। আয়োজকরা জানিয়েছেন, তাদের কোনো বিদেশি রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই।’ বিস্তারিত দেখুন এখানে

একটি বইয়ের প্রচ্ছদের ছবিকে কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে প্রপাগান্ডা ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করছে। বাস্তবতা হচ্ছে, এটি ছিল অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে শিক্ষার্থীদের হাতে আঁকা দেয়াললিখন/গ্রাফিতির একটি ছবি। এই ছবিকে কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যমে চলমান ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ প্রপাগান্ডা যেমন ভিত্তিহীন, তেমনি হাস্যকরও বটে।