| বিশ্লেষণ

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ: ফেসবুকে আওয়ামীপন্থীদের হুমকি, দায় চাপানোর রাজনীতি ও উদযাপন

১৬ মার্চ ২০২৬


ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ:
ফেসবুকে আওয়ামীপন্থীদের হুমকি, দায় চাপানোর রাজনীতি ও উদযাপন



নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার একদিন পর, শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর), ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, জুলাইয়ের অন্যতম মুখ শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়।  নভেম্বর মাস থেকেই আওয়ামীপন্থীরা ওসমান হাদিকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার পরপরই, একদিকে আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও প্রোপাগান্ডা মাধ্যমগুলো এই ঘটনার দায় বিদ্যমান সক্রিয় রাজনৈতিক মহলের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি শুরু করে। অন্যদিকে, আওয়ামী বিভিন্ন এক্টিভিস্টদের মধ্যে এই ঘটনায় উল্লাস প্রকাশ করতেও দেখা যায়। 

এখানে উল্লেখ্য যে, ৯ নভেম্বর থেকে ১৬ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত মোট ৬৮টি আগুন সন্ত্রাসের ঘটনা রেকর্ড করেছে বাংলাফ্যাক্ট। এসব ঘটনাতেও আওয়ামী লীগের এক্টিভিস্টরা উস্কানি ও নির্দেশনা দিয়েছিল। বিস্তারিত পড়ুন বাংলাফ্যাক্টের প্রতিবেদন: ইন্টারনেটে আগুন সন্ত্রাসের নির্দেশনা ও উষ্কানি দিচ্ছে আওয়ামী লীগের এক্টিভিস্টরা



দেয়া হচ্ছিল হুমকি


ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ডাল্টন সৌভাত হীরা ওসমান হাদিকে নিয়ে বেশ কয়েকবার হুমকি দেন, তাঁর উপর সহিংসতার আহ্বান জানান এবং তাঁর ঠিকানা ও ফোন নাম্বার উন্মুক্ত করেন।


গত ১৩ নভেম্বর আওয়ামীলীগের কথিত লকডাউন কর্মসূচির আগে, ১১  নভেম্বরে ডাল্টন সৌভাত হীরা একটি পোস্টে লেখেন, “১৩ তারিখের মধ্যে কিছু মানুষ কে যেন তাদের পাওনা টুকু বুঝিয়ে দেয়া হয়, যদি তারা সাহস করে বের হয়। হাদী একজন।” 


১৪ নভেম্বর তিনি “হাদী মিশন অন দ্য ওয়ে” লিখে আরেকটি পোস্ট দেন, এবং ইনকিলাব মঞ্চের ফাতিমা তাসনিম জুমাকেও হুমকি দেন। 


সেদিনই তিনি ওসমান হাদির ফোন নাম্বার ও স্থায়ী ঠিকানা ফেসবুকে পোস্ট করেন এবং ওসমান হাদী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের উপর সহিংসতার আহ্বান জানান। ওইদিন তিনি হাদীকে নিয়ে অন্তত ৫টি পোস্ট দেন। এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বরে ওসমান হাদীকে হত্যা করা “কতলে ওয়াজিব” বলে একটি পোস্ট দেন। 


উল্লেখ্য, ওইদিন ওসমান হাদি তিন ঘণ্টার মধ্যে দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নাম্বার থেকে কল ও টেক্সটে হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।



দায় চাপানোর রাজনীতি 


ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পেইজ ও এক্টিভিস্টরা কোনো ধরনের তথ্যপ্রমাণ ছাড়া বিদ্যমান সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর নামে দায় চাপানোর রাজনীতি শুরু করেন। কখনো দায় চাপানো হয় বিএনপির ওপর, আবার কখনো বা জামায়াতে ইসলামীর ওপর। 


প্রাথমিকভাবে আজকের কণ্ঠ ও ডাল্টন সৌভাত হীরা বিএনপির মির্জা আব্বাসের নির্দেশে হামলা হয়েছে মর্মে প্রচার করেন, তবে সুশান্ত দাশ গুপ্ত, দস্তগীর জাহাঙ্গীরসহ অনেকে হামলার জন্য দায়ী করেন জামায়াতকে।


আওয়ামীলীগের প্রোপাগাণ্ডা মাধ্যম “দৈনিক আজকের কণ্ঠ” সক্রিয়ভাবে অপতথ্য প্রচার শুরু করে। এদিন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পেইজটি থেকে ১৭টি পোস্ট করা হয়। ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপর কোনো রকম তথ্য প্রমাণ ছাড়াই আজকের কণ্ঠের পেইজ থেকে “ব্রেকিং: মির্জা আব্বাসের নির্দেশে গু/লি/বিদ্ধ ওসমান হাদি, নেওয়া হয়েছে ঢামেকে” শিরোনামে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। এর ২০ মিনিট পর “মির্জা আব্বাসের নির্দেশে” করা হয়েছে দাবিতে  আরেকটি ফটোকার্ড  ও ভিডিও পোস্ট করে। পেইজটি থেকে ওসমান হাদির উপর গুলি চালানোকে সমর্থন করেন কিনা, এমন প্রশ্ন দিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। আওয়ামীলীগের সমর্থকদের সেখানে হামলা সমর্থন করতে দেখা যায়। 


আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও হাদীকে ক্রমাগত হুমকি দেয়া ডাল্টন সৌভাত হীরাও অন্তত তিনটি পোস্ট দেন, যেখানে তিনি কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া মির্জা আব্বাসকে দায়ী করেন। 


তবে আওয়ামীলীগের আরেক প্রোপাগান্ডা প্লাটফরম এ টিম-এর সদস্য সুশান্ত দাশ গুপ্ত জামায়াতের উপর দায় চাপান। তিনি প্রথমে ঘটনাটিকে “বিএনপি প্রার্থীর উপর দায় চাপাতে জামায়াতে ইসলামের পরিকল্পিত হামলা” বলে পোস্ট  দেন, পরে জামায়াতকে দায়ী করে আরও দুটি পোস্ট করেন। সময় টিভির সাবেক সাংবাদিক ও আওয়ামীলীগের “গুজবের কণ্ঠস্বর” হয়ে ওঠা ছদ্মবেশী নিউজসাইট দ্যা ভয়েসের সম্পাদক দস্তগীর জাহাঙ্গীর পোস্ট দেন, “হাদী কে দিয়ে মির্জা আব্বাস মাইনাস খেলায় জামাত! কথা পরিষ্কার!




বদলে যায় প্রপাগান্ডার ধরন  


পরবর্তীকালে ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ফয়সাল করিম দাউদ নামে একজনকে শনাক্ত করে পুলিশ। এই ব্যক্তি কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের (এখন নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যম মারফত জানা যায়। এরপর থেকে আওয়ামীপন্থীদের মধ্যে প্রোপাগাণ্ডার ধরনে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা  যায়।


যেমন, প্রথমে হামলাকে মির্জা আব্বাসের নির্দেশ হিসেবে প্রচার করলেও পরে আজকের কণ্ঠ এটিকে “সাজানো হামলা” বলে একটি ফটোকার্ড ও লেখা প্রকাশ  করে। আজ সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে “হাদির ওপর হামলা: হত্যাচেষ্টা নাকি হারানো গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়ার 'মাস্টারপ্ল্যান'?” শীর্ষক ফটোকার্ডে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করে। এতে “অভিযোগ উঠেছে” বলে বলা হয়, “এই হামলা কোনো বিরোধী পক্ষের কাজ নয়, বরং হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধার ও সহানুভূতি আদায়ের লক্ষ্যে সাজানো এক ‘আত্মঘাতী নাটক”।


সুশান্ত দাশ গুপ্ত  সন্দেহভাজন হামলাকারী হিসেবে এআই দিয়ে তৈরী একটি ছবি পোস্ট করে ছবিটিকে “হাদীর বন্ধুর ছোটভাই” বলে দাবি করেন, যা ফ্যাক্টচেকে ভুল প্রমাণিত হয়।


গণমাধ্যমের আদলে সাজানো আওয়ামীলীগের আরেকটি অপতথ্য ছড়ানো ওয়েবসাইট বিডি ডাইজেস্ট গতকাল ১৩ ডিসেম্বর “ছাত্রলীগের কোনো পদেই ছিলেন না ফয়সাল: হাদী গুলিবিদ্ধের ঘটনায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ আসলে কে?” শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে। 


দস্তগীর জাহাঙ্গীরের দ্যা ভয়েসে “আততায়ীকে জেল থেকে ছাড়ার মধ্যে হাদিকে গুলি করার রহস্য!” শিরোনামে সংবাদের আদলে একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রকাশ করা হয়। 


মূলত সন্দেহভাজন ফয়সালের ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতা সামনে আসার পর থেকে প্রোপাগাণ্ডা প্লাটফরমগুলো ফয়সালের ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করে প্রচারণা শুরু করে।


উল্লাস ও উদযাপন


ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় রীতিমতো উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে আওয়ামীপন্থীদের। 


মোটরসাইকেল থেকে গুলি করার একটি সিসিটিভি ফুটেজ শেয়ার দিয়ে সুশান্ত দাশ গুপ্ত লিখেছেন, “দ্যা মোমেন্ট…*** নাই হইয়া গ্যালো…”। 


আরেক আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও এ-টিম সদস্য অমি রহমান পিয়াল “ছোট বেলা থেকে ট্রাম্পের রাজনীতি ফলো করেন ওসমান হাদী...!!” লেখা সম্বলিত একটি ছবি পোস্ট করেন। 


আজকের কণ্ঠ থেকে “হামলা সমর্থন করেন কিনা” মর্মে যে পোস্ট করা হয়েছে, সেখানেও দলটির সমর্থকদের উল্লাস করতে দেখা গেছে। 




শেখ হাসিনার রায়কে বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগানোর ঘটনায় দেখা গেছে, এসব ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ নেতা ও এক্টিভিস্টদের হুমকি, উস্কানি, এবং ঘটনার পর অপতথ্য প্রচার ও উল্লাস অব্যহত ছিল। ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাতেও একই প্যাটার্ন লক্ষ্য করা গেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দলটির দেশের বাইরে থাকা এক্টিভিস্টরা অনলাইনে ক্রমাগত হুমকি, উস্কানি ও অপতথ্য প্রচারকেই কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করেছে।



Topics:





অন্তর্বর্তী সরকারকে “অবৈধ” বলে আখ্যা: আওয়ামীলীগের পেইজের লেখা যখন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে
৭ মার্চ ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারকে “অবৈধ” বলে আখ্যা: আওয়ামীলীগের পেইজের লেখা যখন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে



অন্তর্বর্তী সরকারকে “অবৈধ” বলে আখ্যা: আওয়ামীলীগের পেইজের লেখা যখন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে
৭ মার্চ ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারকে “অবৈধ” বলে আখ্যা: আওয়ামীলীগের পেইজের লেখা যখন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে

বাংলাভিশনের বিভ্রান্তিকর শিরোনামে পাঠক মনে করছে দেশজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব
বিভ্রান্তিকর
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাভিশনের বিভ্রান্তিকর শিরোনামে পাঠক মনে করছে দেশজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব

বাংলাভিশনের বিভ্রান্তিকর শিরোনামে পাঠক মনে করছে দেশজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব
বিভ্রান্তিকর
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাভিশনের বিভ্রান্তিকর শিরোনামে পাঠক মনে করছে দেশজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব

‘দরিদ্র বাড়িয়ে বিদায় দারিদ্র্যের জাদুকরের’ শিরোনামে একযোগে ভুল সংবাদ প্রকাশ
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

‘দরিদ্র বাড়িয়ে বিদায় দারিদ্র্যের জাদুকরের’ শিরোনামে একযোগে ভুল সংবাদ প্রকাশ

আপনার মতামত দিন

এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?

এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!

0%

0%

আপনার মতামত শেয়ার করুন:

| মন্তব্য সমূহ:

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!



ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ:
ফেসবুকে আওয়ামীপন্থীদের হুমকি, দায় চাপানোর রাজনীতি ও উদযাপন

বিশ্লেষণ

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ: ফেসবুকে আওয়ামীপন্থীদের হুমকি, দায় চাপানোর রাজনীতি ও উদযাপন

১৬ মার্চ ২০২৬

<p><span style="font-size: 24px;">ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ:
ফেসবুকে আওয়ামীপন্থীদের হুমকি, দায় চাপানোর রাজনীতি ও উদযাপন</span>
<br /></p>



নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার একদিন পর, শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর), ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, জুলাইয়ের অন্যতম মুখ শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়।  নভেম্বর মাস থেকেই আওয়ামীপন্থীরা ওসমান হাদিকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার পরপরই, একদিকে আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও প্রোপাগান্ডা মাধ্যমগুলো এই ঘটনার দায় বিদ্যমান সক্রিয় রাজনৈতিক মহলের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি শুরু করে। অন্যদিকে, আওয়ামী বিভিন্ন এক্টিভিস্টদের মধ্যে এই ঘটনায় উল্লাস প্রকাশ করতেও দেখা যায়। 

এখানে উল্লেখ্য যে, ৯ নভেম্বর থেকে ১৬ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত মোট ৬৮টি আগুন সন্ত্রাসের ঘটনা রেকর্ড করেছে বাংলাফ্যাক্ট। এসব ঘটনাতেও আওয়ামী লীগের এক্টিভিস্টরা উস্কানি ও নির্দেশনা দিয়েছিল। বিস্তারিত পড়ুন বাংলাফ্যাক্টের প্রতিবেদন: ইন্টারনেটে আগুন সন্ত্রাসের নির্দেশনা ও উষ্কানি দিচ্ছে আওয়ামী লীগের এক্টিভিস্টরা



দেয়া হচ্ছিল হুমকি


ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ডাল্টন সৌভাত হীরা ওসমান হাদিকে নিয়ে বেশ কয়েকবার হুমকি দেন, তাঁর উপর সহিংসতার আহ্বান জানান এবং তাঁর ঠিকানা ও ফোন নাম্বার উন্মুক্ত করেন।


গত ১৩ নভেম্বর আওয়ামীলীগের কথিত লকডাউন কর্মসূচির আগে, ১১  নভেম্বরে ডাল্টন সৌভাত হীরা একটি পোস্টে লেখেন, “১৩ তারিখের মধ্যে কিছু মানুষ কে যেন তাদের পাওনা টুকু বুঝিয়ে দেয়া হয়, যদি তারা সাহস করে বের হয়। হাদী একজন।” 


১৪ নভেম্বর তিনি “হাদী মিশন অন দ্য ওয়ে” লিখে আরেকটি পোস্ট দেন, এবং ইনকিলাব মঞ্চের ফাতিমা তাসনিম জুমাকেও হুমকি দেন। 


সেদিনই তিনি ওসমান হাদির ফোন নাম্বার ও স্থায়ী ঠিকানা ফেসবুকে পোস্ট করেন এবং ওসমান হাদী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের উপর সহিংসতার আহ্বান জানান। ওইদিন তিনি হাদীকে নিয়ে অন্তত ৫টি পোস্ট দেন। এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বরে ওসমান হাদীকে হত্যা করা “কতলে ওয়াজিব” বলে একটি পোস্ট দেন। 


উল্লেখ্য, ওইদিন ওসমান হাদি তিন ঘণ্টার মধ্যে দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নাম্বার থেকে কল ও টেক্সটে হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।



দায় চাপানোর রাজনীতি 


ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পেইজ ও এক্টিভিস্টরা কোনো ধরনের তথ্যপ্রমাণ ছাড়া বিদ্যমান সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর নামে দায় চাপানোর রাজনীতি শুরু করেন। কখনো দায় চাপানো হয় বিএনপির ওপর, আবার কখনো বা জামায়াতে ইসলামীর ওপর। 


প্রাথমিকভাবে আজকের কণ্ঠ ও ডাল্টন সৌভাত হীরা বিএনপির মির্জা আব্বাসের নির্দেশে হামলা হয়েছে মর্মে প্রচার করেন, তবে সুশান্ত দাশ গুপ্ত, দস্তগীর জাহাঙ্গীরসহ অনেকে হামলার জন্য দায়ী করেন জামায়াতকে।


আওয়ামীলীগের প্রোপাগাণ্ডা মাধ্যম “দৈনিক আজকের কণ্ঠ” সক্রিয়ভাবে অপতথ্য প্রচার শুরু করে। এদিন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পেইজটি থেকে ১৭টি পোস্ট করা হয়। ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপর কোনো রকম তথ্য প্রমাণ ছাড়াই আজকের কণ্ঠের পেইজ থেকে “ব্রেকিং: মির্জা আব্বাসের নির্দেশে গু/লি/বিদ্ধ ওসমান হাদি, নেওয়া হয়েছে ঢামেকে” শিরোনামে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। এর ২০ মিনিট পর “মির্জা আব্বাসের নির্দেশে” করা হয়েছে দাবিতে  আরেকটি ফটোকার্ড  ও ভিডিও পোস্ট করে। পেইজটি থেকে ওসমান হাদির উপর গুলি চালানোকে সমর্থন করেন কিনা, এমন প্রশ্ন দিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। আওয়ামীলীগের সমর্থকদের সেখানে হামলা সমর্থন করতে দেখা যায়। 


আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও হাদীকে ক্রমাগত হুমকি দেয়া ডাল্টন সৌভাত হীরাও অন্তত তিনটি পোস্ট দেন, যেখানে তিনি কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া মির্জা আব্বাসকে দায়ী করেন। 


তবে আওয়ামীলীগের আরেক প্রোপাগান্ডা প্লাটফরম এ টিম-এর সদস্য সুশান্ত দাশ গুপ্ত জামায়াতের উপর দায় চাপান। তিনি প্রথমে ঘটনাটিকে “বিএনপি প্রার্থীর উপর দায় চাপাতে জামায়াতে ইসলামের পরিকল্পিত হামলা” বলে পোস্ট  দেন, পরে জামায়াতকে দায়ী করে আরও দুটি পোস্ট করেন। সময় টিভির সাবেক সাংবাদিক ও আওয়ামীলীগের “গুজবের কণ্ঠস্বর” হয়ে ওঠা ছদ্মবেশী নিউজসাইট দ্যা ভয়েসের সম্পাদক দস্তগীর জাহাঙ্গীর পোস্ট দেন, “হাদী কে দিয়ে মির্জা আব্বাস মাইনাস খেলায় জামাত! কথা পরিষ্কার!




বদলে যায় প্রপাগান্ডার ধরন  


পরবর্তীকালে ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ফয়সাল করিম দাউদ নামে একজনকে শনাক্ত করে পুলিশ। এই ব্যক্তি কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের (এখন নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যম মারফত জানা যায়। এরপর থেকে আওয়ামীপন্থীদের মধ্যে প্রোপাগাণ্ডার ধরনে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা  যায়।


যেমন, প্রথমে হামলাকে মির্জা আব্বাসের নির্দেশ হিসেবে প্রচার করলেও পরে আজকের কণ্ঠ এটিকে “সাজানো হামলা” বলে একটি ফটোকার্ড ও লেখা প্রকাশ  করে। আজ সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে “হাদির ওপর হামলা: হত্যাচেষ্টা নাকি হারানো গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়ার 'মাস্টারপ্ল্যান'?” শীর্ষক ফটোকার্ডে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করে। এতে “অভিযোগ উঠেছে” বলে বলা হয়, “এই হামলা কোনো বিরোধী পক্ষের কাজ নয়, বরং হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধার ও সহানুভূতি আদায়ের লক্ষ্যে সাজানো এক ‘আত্মঘাতী নাটক”।


সুশান্ত দাশ গুপ্ত  সন্দেহভাজন হামলাকারী হিসেবে এআই দিয়ে তৈরী একটি ছবি পোস্ট করে ছবিটিকে “হাদীর বন্ধুর ছোটভাই” বলে দাবি করেন, যা ফ্যাক্টচেকে ভুল প্রমাণিত হয়।


গণমাধ্যমের আদলে সাজানো আওয়ামীলীগের আরেকটি অপতথ্য ছড়ানো ওয়েবসাইট বিডি ডাইজেস্ট গতকাল ১৩ ডিসেম্বর “ছাত্রলীগের কোনো পদেই ছিলেন না ফয়সাল: হাদী গুলিবিদ্ধের ঘটনায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ আসলে কে?” শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে। 


দস্তগীর জাহাঙ্গীরের দ্যা ভয়েসে “আততায়ীকে জেল থেকে ছাড়ার মধ্যে হাদিকে গুলি করার রহস্য!” শিরোনামে সংবাদের আদলে একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রকাশ করা হয়। 


মূলত সন্দেহভাজন ফয়সালের ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতা সামনে আসার পর থেকে প্রোপাগাণ্ডা প্লাটফরমগুলো ফয়সালের ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করে প্রচারণা শুরু করে।


উল্লাস ও উদযাপন


ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় রীতিমতো উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে আওয়ামীপন্থীদের। 


মোটরসাইকেল থেকে গুলি করার একটি সিসিটিভি ফুটেজ শেয়ার দিয়ে সুশান্ত দাশ গুপ্ত লিখেছেন, “দ্যা মোমেন্ট…*** নাই হইয়া গ্যালো…”। 


আরেক আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও এ-টিম সদস্য অমি রহমান পিয়াল “ছোট বেলা থেকে ট্রাম্পের রাজনীতি ফলো করেন ওসমান হাদী...!!” লেখা সম্বলিত একটি ছবি পোস্ট করেন। 


আজকের কণ্ঠ থেকে “হামলা সমর্থন করেন কিনা” মর্মে যে পোস্ট করা হয়েছে, সেখানেও দলটির সমর্থকদের উল্লাস করতে দেখা গেছে। 




শেখ হাসিনার রায়কে বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগানোর ঘটনায় দেখা গেছে, এসব ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ নেতা ও এক্টিভিস্টদের হুমকি, উস্কানি, এবং ঘটনার পর অপতথ্য প্রচার ও উল্লাস অব্যহত ছিল। ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাতেও একই প্যাটার্ন লক্ষ্য করা গেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দলটির দেশের বাইরে থাকা এক্টিভিস্টরা অনলাইনে ক্রমাগত হুমকি, উস্কানি ও অপতথ্য প্রচারকেই কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করেছে।