| বিশ্লেষণ

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে

১৫ মে ২০২৬


নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও মন্তব্যের বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ইস্যুকে ঘিরে সরকারে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের নামে বিভিন্ন ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে অথবা আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হবে না - এমন ধরনের মন্তব্য দেদারছে ছড়ানো হচ্ছে। 


এই ধরনের মন্তব্য প্রচারেরও নির্দিষ্ট কৌশল খেয়াল করা যায়। সাধারণত মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন সম্বলিত ফটোকার্ড দিয়ে এই মন্তব্যগুলো প্রচার করা হয়। এই ধরনের ফটোকার্ড দ্রুত জনমানসে বিভ্রান্তি তৈরি করে।  


বিগত কয়েকদিন ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু ভুয়া মন্তব্য নিয়ে এই প্রতিবেদন করা হয়েছে। এর বাইরেও আরো অনেক মন্তব্য থাকতে পারে। আবার, এই ফটোকার্ডগুলোও একের অধিক জায়গা থেকে প্রচারিত হয়েছে। 


উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচারকার্য  সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ  করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। একই দিনে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।



“আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি”


বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান “আওয়ামীলীগের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিবে না বিএনপি” এমন মন্তব্য করেছেন দাবি করে যমুনা টিভির লোগো যুক্ত একটি ফটোকার্ড গত বছরের ডিসেম্বরের শেষের দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে দাবিটির পক্ষে গণমাধ্যম বা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। 


যমুনা টিভি এমন ফটেকার্ড প্রকাশ করেছে কিনা তা জানতে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানটির নিউ মিডিয়া বিভাগের এডিটর রুবেল মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাংলাফ্যাক্টকে তিনি জানান, “ফটোকার্ডটি ভুয়া।” 


এই বিষয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলাফ্যাক্টকে জানান, “তারেক রহমান এমন কোনো মন্তব্য করেননি।”


আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না


“আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিবে না মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর” শিরোনামে গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ প্রতিদিনের ডিজাইনের অনুরূপ একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমন মন্তব্য করেননি এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনও এমন ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি। গণমাধ্যমটির ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে সেসময় প্রকাশিত ফটোকার্ডগুলো পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত দাবির অনুরূপ কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। 


তাছাড়া, তাদের মূল ফটোকার্ডের ফন্টের সাথেও আলোচিত ফটোকার্ডের ফন্টের পার্থক্য পাওয়া যায়। এছাড়া, গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইটেও সেসময় উক্ত দাবির বিষয়ে কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আসলে, প্রযুক্তির সহায়তায় গণমাধ্যমটির প্রচলিত ফটোকার্ডের ডিজাইন নকল করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।


“আ.লীগ চাইলে বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে”

গত বছরের ডিসেম্বরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের ছবিসহ “আ.লীগ চাইলে বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে- সালাউদ্দিন” শিরোনামে যমুনা টিভির ডিজাইনের অনুরূপ একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েতবে তিনি এমন মন্তব্য করেননি এবং যমুনা টিভিও এমন ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি। দাবিটির পক্ষে গণমাধ্যম বা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, প্রযুক্তির সহায়তায় গণমাধ্যমটির প্রচলিত ফটোকার্ডের ডিজাইন নকল করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

“আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না আসলে নির্বাচন বৈধ হবে না”

গত বছরের ডিসেম্বরে “আওয়ামিলীগ নির্বাচনে না আসলে নির্বাচন বৈধ হবে না” শিরোনামে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে উদ্ধৃত করে আরটিভির ডিজাইন ও লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে তিনি এমন মন্তব্য করেননি এবং আরটিভিও এমন ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে সেসময় এমন শিরোনামের কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইটেও এ দাবির বিষয়ে কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া, অন্যকোনো গণমাধ্যমেও এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি৷

“আওয়ামী লীগের পায়ে ধরা ছাড়া সরকার গঠন করা সম্ভব না”


গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম “আওয়ামী লীগের পায়ে ধরা ছাড়া সরকার গঠন করা সম্ভব না” বলে মন্তব্য করেছেন দাবিতে একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে তিনি এমন মন্তব্য করেননি। গণমাধ্যম কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে এ দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। মূলত, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের নাম ও লোগো নকল করে তৈরি ‘GojobVision’ নামে একটি ব্যাঙ্গাত্মক ফেসবুক পেজ থেকে নাহিদ ইসলামের নামে ভুয়া এই মন্তব্যটি প্রচার করা হয়েছে।


“আওয়ামী লীগ ছাড়াই নির্বাচন হবে না”


গত বছরের ডিসেম্বরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে উদ্ধৃত করে “আওয়ামী লীগ ছাড়াই নির্বাচন হবে না” শিরোনামে অনলাইন গণমাধ্যম বাংলাদেশ টাইমস এর ডিজাইন ও লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ড ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেসময় তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি এবং বাংলাদেশ টাইমসও এমন ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে গত ৩০ নভেম্বর “আওয়ামী লীগ ছাড়াই নির্বাচন হবে” শিরোনামের ফটোকার্ডটি প্রযুক্তির সহায়তায় বিকৃত করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।


“আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের সুযোগ দিলে কোনো দলেরই বেল থাকবে না”


প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম “আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের সুযোগ দিলে কোনো দলেরই বেল থাকবে না” বলে মন্তব্য করেছেন দাবি করে ডিবিসি নিউজের ডিজাইন ও লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ড গত বছরের নভেম্বরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেসময় শফিকুল আলম আলোচিত মন্তব্যটি করেননি এবং এমন শিরোনামে ডিবিসি নিউজও কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি। দাবিটির পক্ষে গণমাধ্যম কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, ডিবিসি’র ফেসবুক পেজে গত ১৫ নভেম্বরে “আওয়ামী লীগ ফেসবুকভিত্তিক প্রতিবাদী দল, মাঠে তাদের শক্তি খুব কম” শিরোনামের ফটোকার্ডটি বিকৃত করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।


“আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরানো হবে”


ঢাকা-৯ সংসদীয় আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা “আওয়ামীলীগ ও শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরানো হবে” বলে মন্তব্য করেছেন দাবি করে একটি ফটোকার্ড গত বছরের ডিসেম্বরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে তিনি এমন মন্তব্য করেননি। গণমাধ্যম কিংবা বিশ্বস্ত কোনো সূত্রে তাঁর এমন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আসলে Janina Television’ নামের একটি ব্যাঙ্গাত্মক ফেসবুক পেজে গত ২৪ ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি পোস্ট থেকে ছড়ানো মন্তব্যকে আসল দাবি করে প্রচার করা হয়েছে।


পর্যালোচনায় দেখা যায়, আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ইস্যুতে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো আলোচিত মন্তব্যগুলোর কোনোটিরই পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূলধারার গণমাধ্যমের আদলে তৈরি জাল ফটোকার্ড, বিকৃত শিরোনাম অথবা স্যাটায়ার পেজের কনটেন্টকে আসল বলে প্রচার করা হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জনমত প্রভাবিত করতে এসব মন্তব্য ছড়ানো হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। 


তাই নির্বাচনকালীন সময়ে তথ্য যাচাই ছাড়া এমন কোনো দাবি বিশ্বাস বা শেয়ার না করার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।





Topics:



পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপির জয়ে ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ বয়ানের প্রভাব
৭ মে ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপির জয়ে ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ বয়ানের প্রভাব

সীমান্তের কাল্পনিক চিত্র আর ভুল তথ্য দিয়ে বানানো গেরুয়া-সবুজ ম্যাপ 
সীমান্তের কোনোদিকেই কোনও দল একচেটিয়া আসন পায়নি
৬ মে ২০২৬

সীমান্তের কাল্পনিক চিত্র আর ভুল তথ্য দিয়ে বানানো গেরুয়া-সবুজ ম্যাপ 

সীমান্তের কোনোদিকেই কোনও দল একচেটিয়া আসন পায়নি

আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি-পাচারের কারণেই বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ৫০ হাজার কোটি টাকা
৯ এপ্রিল ২০২৬

আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি-পাচারের কারণেই বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ৫০ হাজার কোটি টাকা

কালের কণ্ঠের  উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘উদ্বেগ’ 




যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫২%
৮ এপ্রিল ২০২৬

কালের কণ্ঠের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘উদ্বেগ’ 

যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫২%

অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাতে তথ্য সচিবকে জুলাইবিরোধী হিসেবে অপপ্রচার
৫ এপ্রিল ২০২৬

অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাতে তথ্য সচিবকে জুলাইবিরোধী হিসেবে অপপ্রচার

আপনার মতামত দিন

এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?

এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!

0%

0%

আপনার মতামত শেয়ার করুন:

| মন্তব্য সমূহ:

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!



নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে

বিশ্লেষণ

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে

১৫ মে ২০২৬

<p><span style="font-size: 24px;">নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে</span><br /></p>

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও মন্তব্যের বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ইস্যুকে ঘিরে সরকারে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের নামে বিভিন্ন ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে অথবা আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হবে না - এমন ধরনের মন্তব্য দেদারছে ছড়ানো হচ্ছে। 


এই ধরনের মন্তব্য প্রচারেরও নির্দিষ্ট কৌশল খেয়াল করা যায়। সাধারণত মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন সম্বলিত ফটোকার্ড দিয়ে এই মন্তব্যগুলো প্রচার করা হয়। এই ধরনের ফটোকার্ড দ্রুত জনমানসে বিভ্রান্তি তৈরি করে।  


বিগত কয়েকদিন ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু ভুয়া মন্তব্য নিয়ে এই প্রতিবেদন করা হয়েছে। এর বাইরেও আরো অনেক মন্তব্য থাকতে পারে। আবার, এই ফটোকার্ডগুলোও একের অধিক জায়গা থেকে প্রচারিত হয়েছে। 


উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচারকার্য  সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ  করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। একই দিনে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।



“আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি”


বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান “আওয়ামীলীগের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিবে না বিএনপি” এমন মন্তব্য করেছেন দাবি করে যমুনা টিভির লোগো যুক্ত একটি ফটোকার্ড গত বছরের ডিসেম্বরের শেষের দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে দাবিটির পক্ষে গণমাধ্যম বা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। 


যমুনা টিভি এমন ফটেকার্ড প্রকাশ করেছে কিনা তা জানতে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানটির নিউ মিডিয়া বিভাগের এডিটর রুবেল মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাংলাফ্যাক্টকে তিনি জানান, “ফটোকার্ডটি ভুয়া।” 


এই বিষয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলাফ্যাক্টকে জানান, “তারেক রহমান এমন কোনো মন্তব্য করেননি।”


আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না


“আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিবে না মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর” শিরোনামে গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ প্রতিদিনের ডিজাইনের অনুরূপ একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমন মন্তব্য করেননি এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনও এমন ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি। গণমাধ্যমটির ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে সেসময় প্রকাশিত ফটোকার্ডগুলো পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত দাবির অনুরূপ কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। 


তাছাড়া, তাদের মূল ফটোকার্ডের ফন্টের সাথেও আলোচিত ফটোকার্ডের ফন্টের পার্থক্য পাওয়া যায়। এছাড়া, গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইটেও সেসময় উক্ত দাবির বিষয়ে কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আসলে, প্রযুক্তির সহায়তায় গণমাধ্যমটির প্রচলিত ফটোকার্ডের ডিজাইন নকল করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।


“আ.লীগ চাইলে বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে”

গত বছরের ডিসেম্বরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের ছবিসহ “আ.লীগ চাইলে বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে- সালাউদ্দিন” শিরোনামে যমুনা টিভির ডিজাইনের অনুরূপ একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েতবে তিনি এমন মন্তব্য করেননি এবং যমুনা টিভিও এমন ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি। দাবিটির পক্ষে গণমাধ্যম বা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, প্রযুক্তির সহায়তায় গণমাধ্যমটির প্রচলিত ফটোকার্ডের ডিজাইন নকল করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

“আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না আসলে নির্বাচন বৈধ হবে না”

গত বছরের ডিসেম্বরে “আওয়ামিলীগ নির্বাচনে না আসলে নির্বাচন বৈধ হবে না” শিরোনামে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে উদ্ধৃত করে আরটিভির ডিজাইন ও লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে তিনি এমন মন্তব্য করেননি এবং আরটিভিও এমন ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে সেসময় এমন শিরোনামের কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইটেও এ দাবির বিষয়ে কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া, অন্যকোনো গণমাধ্যমেও এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি৷

“আওয়ামী লীগের পায়ে ধরা ছাড়া সরকার গঠন করা সম্ভব না”


গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম “আওয়ামী লীগের পায়ে ধরা ছাড়া সরকার গঠন করা সম্ভব না” বলে মন্তব্য করেছেন দাবিতে একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে তিনি এমন মন্তব্য করেননি। গণমাধ্যম কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে এ দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। মূলত, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের নাম ও লোগো নকল করে তৈরি ‘GojobVision’ নামে একটি ব্যাঙ্গাত্মক ফেসবুক পেজ থেকে নাহিদ ইসলামের নামে ভুয়া এই মন্তব্যটি প্রচার করা হয়েছে।


“আওয়ামী লীগ ছাড়াই নির্বাচন হবে না”


গত বছরের ডিসেম্বরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে উদ্ধৃত করে “আওয়ামী লীগ ছাড়াই নির্বাচন হবে না” শিরোনামে অনলাইন গণমাধ্যম বাংলাদেশ টাইমস এর ডিজাইন ও লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ড ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেসময় তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি এবং বাংলাদেশ টাইমসও এমন ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে গত ৩০ নভেম্বর “আওয়ামী লীগ ছাড়াই নির্বাচন হবে” শিরোনামের ফটোকার্ডটি প্রযুক্তির সহায়তায় বিকৃত করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।


“আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের সুযোগ দিলে কোনো দলেরই বেল থাকবে না”


প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম “আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের সুযোগ দিলে কোনো দলেরই বেল থাকবে না” বলে মন্তব্য করেছেন দাবি করে ডিবিসি নিউজের ডিজাইন ও লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ড গত বছরের নভেম্বরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেসময় শফিকুল আলম আলোচিত মন্তব্যটি করেননি এবং এমন শিরোনামে ডিবিসি নিউজও কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি। দাবিটির পক্ষে গণমাধ্যম কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, ডিবিসি’র ফেসবুক পেজে গত ১৫ নভেম্বরে “আওয়ামী লীগ ফেসবুকভিত্তিক প্রতিবাদী দল, মাঠে তাদের শক্তি খুব কম” শিরোনামের ফটোকার্ডটি বিকৃত করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।


“আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরানো হবে”


ঢাকা-৯ সংসদীয় আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা “আওয়ামীলীগ ও শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরানো হবে” বলে মন্তব্য করেছেন দাবি করে একটি ফটোকার্ড গত বছরের ডিসেম্বরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে তিনি এমন মন্তব্য করেননি। গণমাধ্যম কিংবা বিশ্বস্ত কোনো সূত্রে তাঁর এমন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আসলে Janina Television’ নামের একটি ব্যাঙ্গাত্মক ফেসবুক পেজে গত ২৪ ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি পোস্ট থেকে ছড়ানো মন্তব্যকে আসল দাবি করে প্রচার করা হয়েছে।


পর্যালোচনায় দেখা যায়, আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ইস্যুতে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো আলোচিত মন্তব্যগুলোর কোনোটিরই পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূলধারার গণমাধ্যমের আদলে তৈরি জাল ফটোকার্ড, বিকৃত শিরোনাম অথবা স্যাটায়ার পেজের কনটেন্টকে আসল বলে প্রচার করা হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জনমত প্রভাবিত করতে এসব মন্তব্য ছড়ানো হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। 


তাই নির্বাচনকালীন সময়ে তথ্য যাচাই ছাড়া এমন কোনো দাবি বিশ্বাস বা শেয়ার না করার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।