| বিশ্লেষণ
সংশয় নয়, বরং দ্য পোস্ট নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা বিষয়ে উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে
২০ জানুয়ারী ২০২৬
গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে বর্তমান সরকার আরও ৬ মাস থাকবে, এমন অপব্যাখ্যা দিয়ে ভিডিও কনটেন্ট প্রচার করেছে দ্য পোস্ট। বিষয়টি নিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রকাশিত হলে দ্য পোস্ট আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলে, তারা সংশয় তুলে ধরতে চেয়েছে। অথচ ক্যাপশন ও ভিডিওতে “প্রশ্ন” হিসেবে নয়, বরং “সিদ্ধান্ত” হিসেবে তারা বলেছে, হ্যাঁ জয়ী হলে নতুন সরকার গঠন হবে না, বর্তমান সরকার আরও ৬ মাস থাকবেন।
১৮ জানুয়ারি প্রকাশিত ভিডিওটির ক্যাপশনে দ্য পোস্ট লিখেছিল, “গণভোট: ‘হ্যাঁ’ জিতলে আরও ৬ মাস ইউনূস সরকার; ‘না’ জিতলে কী?”। এখানে ‘না’ জিতলে কী হবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন রাখা হলেও, শুরুতেই তারা স্থিরভাবে ঘোষণা করেছে যে ‘হ্যাঁ’ জিতলে বর্তমান সরকার আরও ছয় মাস থাকবে। সমালোচনার মুখে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই পরবর্তীতে ক্যাপশন পরিবর্তন করা হলেও, ভিডিওটি এখনো সরানো হয়নি।
এ লেখা পর্যন্ত প্রায় দুই মিলিয়ন ভিউ হওয়া ভিডিওটিতে বলা হয়েছে, “হ্যাঁ ভোট জেতার একটা সাইড এফেক্টও আছে। হ্যাঁ জিতলে নির্বাচনের পরপরই নতুন সরকার গঠিত হবে না।” এখানেও বক্তব্যটি কোনো প্রশ্ন বা সংশয়ের আকারে নয়, বরং নিশ্চিত পরিণতি হিসেবে উপস্থাপিত। পরের অংশে বলা হয়, “অবাক হচ্ছেন তো? নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচিত এমপিরা তখন একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা গণপরিষদ হিসেবে বসবেন। তাদের হাতে সময় থাকবে ১৮০ দিন বা ছয় মাস। এই ছয় মাস ধরে তারা সংবিধান কাটছাঁট করবেন। নতুন আইন পাস করবেন ততদিন ক্ষমতায় কে থাকবে? ডক্টর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার থাকবে ততদিন। মানে নির্বাচনের পরও আরো ছয় মাস ইউনুস সরকার ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে।” অর্থাৎ, ভিডিওটিতে ‘নিয়ম অনুযায়ী’ বর্তমান সরকারের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়বে, এমন ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। অথচ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদই দ্বৈত ভূমিকা পালন করবেন।
পরবর্তীতে বাংলাফ্যাক্ট তাদের এই ভুল শনাক্ত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের অফিশিয়াল পেইজ থেকেও ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়। এরপর আত্মপক্ষ সমর্থন করে দ্য পোস্ট তাদের ফেসবুক পেইজে লেখে “এই কনটেন্ট বা শিরোনাম নিয়ে যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে তার জন্য আমরা পোস্ট-এর পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। এক্ষেত্রে আর্টিকুলেশনের সমস্যার কারণে এমন বিভ্রান্তি ঘটেছে, যা অনিচ্ছাকৃত। আমরা গণভোটের হাঁ ও না বিষয়টি আলাপ করতে গিয়ে জনপরিসরে থাকা এই প্রশ্নটিও তুলতে চেয়েছি যে-' ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতে গেলে ছয় মাস অনিশ্চয়তা থাকবে কিনা?' - যে প্রশ্নটি অন্য গণমাধ্যমেও এসেছে। যেমন রাজনীতি বিশ্লেষক সালেহ উদ্দিন আহমদও প্রথম আলো’র কলামে বলেছেন- " ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতে গেলে ছয় মাস অনিশ্চয়তা থাকবে।....নতুন সরকার কখন গঠিত হবে, তা রোডম্যাপে বলা হয়নি। জামায়াত ও জুলাই আন্দোলনকারীরা দাবি তুলতে পারেন, সনদের ধারাগুলো শাসনতন্ত্রে যত দিন না গৃহীত হবে, তত দিন ড. ইউনূস সরকার ক্ষমতায় থাকবে। এর অর্থ ইউনূস সরকার ফেব্রুয়ারির পর আরও ছয় মাস থেকে যেতে পারে।"
এই ব্যাখ্যাটি বিভ্রান্তিকর। কারণ, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর ৭ অনুচ্ছেদে নির্বাচিত সংসদের দ্বৈত ভূমিকার কথা স্পষ্ট লেখা থাকলেও দ্য পোস্ট তাদের ভিডিওতে সেটি উল্লেখ করেনি, বরং এই আদেশে উল্লিখিত তথ্যের বিপরীত বক্তব্য দিয়েছে। এই বক্তব্য কোনো সংশয় বা প্রশ্নের আকারে নয়, বরং সরাসরি সিদ্ধান্তমূলক হিসেবেই এসেছে।
দ্য পোস্টের ফেসবুক পেইজে গণভোট নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়। গত ছয় দিনে তারা অন্তত পাঁচটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে, যেখানে সরকার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারে কিনা এই বিষয়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে আলোচ্য ভিডিওটিতে প্রশ্ন তুলে ধরা নয়, বরং সরাসরি অপব্যাখ্যা হাজির করা হয়েছে। দ্য পোস্ট এটিকে “প্রশ্ন তুলে ধরা” হিসেবে যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা সঠিক নয়।
উল্লেখ্য, দ্য পোস্টের সিনিয়র ম্যানেজমেন্টে ডিরেক্টর পদে আছেন তিনজন - নূর সাফা জুলহাজ, ফারহানা রহমান এবং ওয়াহিদ তারেক। লাইসেন্সের আবেদন করা হয়েছে ওয়াহিদ তারেকের নামে। নূর সাফা জুলহাজ ইতোপূর্বে একাত্তর টিভিতে শীর্ষ পদে কর্মরত ছিলেন। ফারহানা রহমানও একাত্তর টিভির সাংবাদিক ছিলেন। ওয়াহিদ তারেক চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচিত।
Topics:
ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাঁকে অপসারণ করা হয়নি
হাসিনার সন্তানদের রাজনীতিতে ফেরা প্রসঙ্গে তারেক রহমানের বক্তব্য বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন
ভারতে ভোটারের পাশে শতাধিক সন্তান যুক্ত হওয়ার ঘটনাকে বাংলাদেশের মনে করে পাঠকের বিভ্রান্তি
'মানহানি'র নিশানায় নারী রাজনীতিক : নির্বাচনী প্রচারণাতেও রেহাই নাই
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ প্রসঙ্গে তারেক রহমানের বক্তব্য বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন
শুধু নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে নয়, বরং অপরাধ করলে পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার কথাও বলেছেন তিনি
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!
0%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
| আরও পড়ুন
From ‘Crime’ to ‘Communal’ Narrative : How Indian Outlets Reframed Violence in Bangladesh
গণভোটে কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে আলাদা বিভাগ করার জন্যও ভোট দেয়া হচ্ছে, আসিফ সালেহের এই দাবি সঠিক নয়
সুনামগঞ্জে জয় মহাপাত্রের মৃত্যু: আর্থিক লেনদেনের কারণকে ভারতীয় মিডিয়ায় সাম্প্রদায়িক বলে প্রচার
ডিভি লটারির তালিকা থেকে বাদ পড়া নতুন নয়, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশের নাম নেই
বিশ্লেষণ
সংশয় নয়, বরং দ্য পোস্ট নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা বিষয়ে উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে
২০ জানুয়ারী ২০২৬
গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে বর্তমান সরকার আরও ৬ মাস থাকবে, এমন অপব্যাখ্যা দিয়ে ভিডিও কনটেন্ট প্রচার করেছে দ্য পোস্ট। বিষয়টি নিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রকাশিত হলে দ্য পোস্ট আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলে, তারা সংশয় তুলে ধরতে চেয়েছে। অথচ ক্যাপশন ও ভিডিওতে “প্রশ্ন” হিসেবে নয়, বরং “সিদ্ধান্ত” হিসেবে তারা বলেছে, হ্যাঁ জয়ী হলে নতুন সরকার গঠন হবে না, বর্তমান সরকার আরও ৬ মাস থাকবেন।
১৮ জানুয়ারি প্রকাশিত ভিডিওটির ক্যাপশনে দ্য পোস্ট লিখেছিল, “গণভোট: ‘হ্যাঁ’ জিতলে আরও ৬ মাস ইউনূস সরকার; ‘না’ জিতলে কী?”। এখানে ‘না’ জিতলে কী হবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন রাখা হলেও, শুরুতেই তারা স্থিরভাবে ঘোষণা করেছে যে ‘হ্যাঁ’ জিতলে বর্তমান সরকার আরও ছয় মাস থাকবে। সমালোচনার মুখে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই পরবর্তীতে ক্যাপশন পরিবর্তন করা হলেও, ভিডিওটি এখনো সরানো হয়নি।
এ লেখা পর্যন্ত প্রায় দুই মিলিয়ন ভিউ হওয়া ভিডিওটিতে বলা হয়েছে, “হ্যাঁ ভোট জেতার একটা সাইড এফেক্টও আছে। হ্যাঁ জিতলে নির্বাচনের পরপরই নতুন সরকার গঠিত হবে না।” এখানেও বক্তব্যটি কোনো প্রশ্ন বা সংশয়ের আকারে নয়, বরং নিশ্চিত পরিণতি হিসেবে উপস্থাপিত। পরের অংশে বলা হয়, “অবাক হচ্ছেন তো? নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচিত এমপিরা তখন একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা গণপরিষদ হিসেবে বসবেন। তাদের হাতে সময় থাকবে ১৮০ দিন বা ছয় মাস। এই ছয় মাস ধরে তারা সংবিধান কাটছাঁট করবেন। নতুন আইন পাস করবেন ততদিন ক্ষমতায় কে থাকবে? ডক্টর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার থাকবে ততদিন। মানে নির্বাচনের পরও আরো ছয় মাস ইউনুস সরকার ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে।” অর্থাৎ, ভিডিওটিতে ‘নিয়ম অনুযায়ী’ বর্তমান সরকারের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়বে, এমন ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। অথচ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদই দ্বৈত ভূমিকা পালন করবেন।
পরবর্তীতে বাংলাফ্যাক্ট তাদের এই ভুল শনাক্ত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের অফিশিয়াল পেইজ থেকেও ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়। এরপর আত্মপক্ষ সমর্থন করে দ্য পোস্ট তাদের ফেসবুক পেইজে লেখে “এই কনটেন্ট বা শিরোনাম নিয়ে যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে তার জন্য আমরা পোস্ট-এর পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। এক্ষেত্রে আর্টিকুলেশনের সমস্যার কারণে এমন বিভ্রান্তি ঘটেছে, যা অনিচ্ছাকৃত। আমরা গণভোটের হাঁ ও না বিষয়টি আলাপ করতে গিয়ে জনপরিসরে থাকা এই প্রশ্নটিও তুলতে চেয়েছি যে-' ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতে গেলে ছয় মাস অনিশ্চয়তা থাকবে কিনা?' - যে প্রশ্নটি অন্য গণমাধ্যমেও এসেছে। যেমন রাজনীতি বিশ্লেষক সালেহ উদ্দিন আহমদও প্রথম আলো’র কলামে বলেছেন- " ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতে গেলে ছয় মাস অনিশ্চয়তা থাকবে।....নতুন সরকার কখন গঠিত হবে, তা রোডম্যাপে বলা হয়নি। জামায়াত ও জুলাই আন্দোলনকারীরা দাবি তুলতে পারেন, সনদের ধারাগুলো শাসনতন্ত্রে যত দিন না গৃহীত হবে, তত দিন ড. ইউনূস সরকার ক্ষমতায় থাকবে। এর অর্থ ইউনূস সরকার ফেব্রুয়ারির পর আরও ছয় মাস থেকে যেতে পারে।"
এই ব্যাখ্যাটি বিভ্রান্তিকর। কারণ, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর ৭ অনুচ্ছেদে নির্বাচিত সংসদের দ্বৈত ভূমিকার কথা স্পষ্ট লেখা থাকলেও দ্য পোস্ট তাদের ভিডিওতে সেটি উল্লেখ করেনি, বরং এই আদেশে উল্লিখিত তথ্যের বিপরীত বক্তব্য দিয়েছে। এই বক্তব্য কোনো সংশয় বা প্রশ্নের আকারে নয়, বরং সরাসরি সিদ্ধান্তমূলক হিসেবেই এসেছে।
দ্য পোস্টের ফেসবুক পেইজে গণভোট নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়। গত ছয় দিনে তারা অন্তত পাঁচটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে, যেখানে সরকার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারে কিনা এই বিষয়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে আলোচ্য ভিডিওটিতে প্রশ্ন তুলে ধরা নয়, বরং সরাসরি অপব্যাখ্যা হাজির করা হয়েছে। দ্য পোস্ট এটিকে “প্রশ্ন তুলে ধরা” হিসেবে যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা সঠিক নয়।
উল্লেখ্য, দ্য পোস্টের সিনিয়র ম্যানেজমেন্টে ডিরেক্টর পদে আছেন তিনজন - নূর সাফা জুলহাজ, ফারহানা রহমান এবং ওয়াহিদ তারেক। লাইসেন্সের আবেদন করা হয়েছে ওয়াহিদ তারেকের নামে। নূর সাফা জুলহাজ ইতোপূর্বে একাত্তর টিভিতে শীর্ষ পদে কর্মরত ছিলেন। ফারহানা রহমানও একাত্তর টিভির সাংবাদিক ছিলেন। ওয়াহিদ তারেক চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচিত।