| বিশ্লেষণ
পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার অপরাধ আড়াল করে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে ভারতীয় মিডিয়ার বন্দনা
১৫ জুলাই ২০২৬
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ক্ষমতাচ্যুত সাবেক বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আদালতের রায়ে তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছে। তিনি সম্প্রতি রয়টার্সের একটি সাক্ষাতকারে দাবি করেছেন, তিনি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকায় ফিরতে চান। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যম এই খবরটিকে কীভাবে প্রচার করছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের আওয়ামীপন্থী বয়ান প্রচারের একটি ক্যাম্পেইনের চিত্র ফুটে ওঠে। ভারতের জাতীয় ইংরেজি সম্প্রচারমাধ্যম থেকে শুরু করে আঞ্চলিক বাংলা পোর্টালগুলো একজন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী ও দণ্ডিত পলাতক আসামিকে একজন দেশপ্রেমিক ও ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে নতুন করে তুলে ধরার জন্য রীতিমতো একটি সমন্বিত জনসংযোগ বা পিআর (PR) ক্যাম্পেইনে নেমেছে। তাঁর কথিত ভুক্তভোগী দশাকে সামনে আনা হচ্ছে। দেশের মাটির জন্য তাঁর জীবন দেওয়ার ইচ্ছাকে মহিমান্বিত করে প্রচার করা হচ্ছে। তাঁর প্রত্যাবর্তনের জল্পনা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত হাইপ তৈরি করে বয়ান নির্মাণ করা হচ্ছে। তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশে সংঘটিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে সচেতনভাবে আড়াল করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এমন এক ভুয়া বয়ান নির্মাণ করছে যা মূলত বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগ এবং তাঁদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি এক চরম অবমাননা।
ভারতীয় গণমাধ্যমের বর্তমান রিপোর্টিং স্ট্র্যাটেজির অন্যতম মূল ভিত্তি হলো শেখ হাসিনার যেকোনো বয়ানকে বিনা প্রশ্নে এবং কোনো সমালোচনা ছাড়াই প্রচার করা। সংবাদমাধ্যমগুলো সর্বজনীনভাবে এমন আবেগঘন এবং চাঞ্চল্যকরভাবে এই প্রচারণা শুরু করেছে যাতে মনে হবে হাসিনা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো এক দেশপ্রেমিক বীর। কিন্তু কেন তিনি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী, সেই মূল প্রেক্ষাপটটি তারা অত্যন্ত সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে। তারা হাসিনার অত্যন্ত সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী ছবি সহকারে ফটোকার্ড তৈরি করে ফেসবুকে প্রচার করছে হাসিনার বক্তব্য।
উদাহরণস্বরূপ, Zee News (জি নিউজ) তাদের সমস্ত প্ল্যাটফর্মজুড়ে অত্যন্ত নাটকীয় শিরোনাম করেছে: "'If death comes...': Former Bangladesh PM Sheikh Hasina says will return to Dhaka in December"। একজন পলাতক আসামির মুখরক্ষার রাজনৈতিক বক্তব্যকে তারা সাহসিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তারা শেখ হাসিনার সরাসরি ইংরেজি উদ্ধৃতিটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ছেপেছে: "If death comes, I want it to come on my own soil, where my parents are buried and where their blood was shed"। এবং ফেসবুকে একাধিক ফটোকার্ড প্রচার করেছে এই সংবাদের ওপর ভিত্তি করে।
WION ঠিক একই পথ অনুসরণ করে শিরোনাম করেছে: “‘Want death to come on my own soil’: Sheikh Hasina says will return, surrender in December”। তারা কোনো সমালোচনা ছাড়াই তাঁর এই মেলোড্রামাটিক উক্তিটি সম্প্রচার করেছে: "They may arrest me on my return, they may even kill me. Still, I have to go"। একইভাবে, The Times of India (দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া) তাদের বয়ানটি সাজিয়েছে বিপদের মুখে তাঁর কথিত সাহসিকতাকে ঘিরে। এই সংবাদের শিরোনাম ছিল:
"Sheikh Hasina: May get arrested or killed but will go back to Bangladesh by December"। সংবাদ এক ধাপ এগিয়ে চরম অবমাননাকর ভাষায় লেখা হয়েছে "This was the second time that Hasina has declared her intent to return from India, where she fled to escape angry mobs that had threatened to kill her amid violent protests against her govt in 2024." অর্থাৎ তাদের মতে, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে একটি মব তাকে হত্যা করতে গিয়েছিল, তাই তিনি পালিয়ে এসেছেন ভারতে।
এই ধরনের ফ্রে্মিং তৈরি করা চূড়ান্তভাবে ম্যানিপুলেটিভ। বারবার তাঁর সম্ভাব্য মৃত্যুর ইংরেজি উদ্ধৃতি "They may even kill me" এবং "If death comes..."সামনে আনার মাধ্যমে ভারতীয় মিডিয়া অত্যন্ত সুকৌশলে সেই শত শত নিরস্ত্র বাংলাদেশি ছাত্র এবং সাধারণ মানুষের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে, যারা তাঁরই সরাসরি নির্দেশে নিজেদের মাটিতেই প্রাণ হারিয়েছিলেন। মাত্র দুই বছর আগে যে স্বৈরাচারী শাসক গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাকেই এখন দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত এক বীর হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে আর অভ্যুউথানকারীদের বলা হচ্ছে মব, যা ইতিহাসের এক নির্লজ্জ বিকৃতি।
স্বৈরতন্ত্রের জঘন্য অপরাধ আড়াল করে দায়মুক্তি দেয়া
ভারতীয় গণমাধ্যমের কভারেজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো শেখ হাসিনার জঘন্য অপরাধগুলোকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ বা তুলে ধরতে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা। যদিও কিছু গণমাধ্যম বাধ্য হয়ে একটি ছোট ফুটনোট হিসেবে উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, কিন্তু তারা কেউই তাঁর সংঘটিত অপরাধের ভয়াবহ বিবরণ একবারের জন্যও প্রকাশ করেনি। রাষ্ট্র-পরিচালিত একটি নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞকে তারা নিছক একটি "crackdown" বা দমন-পীড়ন হিসেবে লঘুকরণ করেছে।
তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনার বদলে, ভারতীয় গণমাধ্যম তাঁকে একটি গোটা জাতিকে গ্যাসলাইট (Gaslight) করার জন্য অবারিত প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে। সম্প্রতি WION-এর একটি সাক্ষাৎকারে হাসিনাকে তাঁর ১৭ বছরের নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী শাসন এবং আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে হত্যার বিষয়টিকে কেবল একটি ছোট প্রশাসনিক ভুল হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। WION তাঁকে সরাসরি উদ্ধৃত করেছে: "When a government works for a long time, mistakes can happen, no government is above error"।
শত শত ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে হত্যা করাকে "mistake" (ভুল) বলাটা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা। অথচ, WION এই উদ্ধৃতিটি কোনো ধরনের সাংবাদিকসুলভ পাল্টা প্রশ্ন, আগ্রাসী জেরা বা সম্পাদকীয় কাউন্টার-ন্যারেটিভ ছাড়াই ছেপে দিয়েছে। একজন দণ্ডিত গণহত্যাকারীকে একটি হত্যাযজ্ঞকে ক্যাজুয়ালি "mistake" হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং একইসঙ্গে তাঁর এই অভিযোগকে হাইলাইট করা যে, "My party leaders and workers are being subjected to tremendous repression" প্রমাণ করে ভারতীয় মিডিয়া একটি মুক্ত গণমাধ্যমের চেয়ে বরং নির্বাসিত আওয়ামী লীগের জনসংযোগ শাখা হিসেবেই বেশি কাজ করছে। পুরো ন্যারেটিভটিকে উল্টে দেওয়া হয়েছে। যে নিপীড়ক ছিল, তাকে চরমভাবে মানবিকীকরণ করে চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আর তার গণতান্ত্রিক ভিন্নমত দমন এবং বিরোধীদের গুম-খুন করার অকাট্য ইতিহাস কার্পেটের নিচে লুকিয়ে ফেলা হচ্ছে।
"প্রত্যাবর্তন ২.০": একজন পলাতক আসামির প্রত্যাবর্তন ঘিরে অহেতুক হাইপ
ভারতের জাতীয় ইংরেজি গণমাধ্যমগুলো যখন হাসিনার সাহসী ইমেজ তৈরিতে ব্যস্ত, তখন ভারতের আঞ্চলিক বাংলা গণমাধ্যমগুলো আরেক ধাপ এগিয়ে তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে রীতিমতো হাইপ (Hype) তৈরি করছে। তারা এটিকে বিচারের মুখোমুখি হতে একজন দণ্ডিত অপরাধীর আত্মসমর্পণ হিসেবে না দেখিয়ে, একটি বিজয়ী রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে ফ্রেম করছে।
বাংলা পোর্টাল Aajkaal নির্লজ্জভাবে একটি প্রতিবেদন ছেপেছে যার শিরোনাম: "'প্রত্যাবর্তন ২.০ লোডিং', ফের বাংলাদেশ ফিরছেন শেখ হাসিনা? আওয়ামী লীগের পোস্ট ঘিরে তীব্র জল্পনা!"। এই প্রতিবেদনে তাঁর রাজনৈতিক পুনরুত্থান নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা করা হয়েছে এবং এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যা তাঁর ফিরে আসাকে একটি রাজনৈতিক মহোৎসবে পরিণত করে।
Zee News Bengali এই সুরে গলা মিলিয়ে শিরোনাম করেছে: "শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ২. ০ এর প্রস্তুতি তুঙ্গে, বাংলাদেশে ফের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত!"। তারা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে বর্ণনা করেছে কীভাবে লন্ডন, আমেরিকা এবং ভারত থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দিল্লিতে ছুটছেন এবং দেশে তথাকথিত "নিপীড়ন" মোকাবিলায় তিনি কীভাবে দল পুনর্গঠন করছেন।
ABP Live ধারাবাহিকভাবে সহানুভূতিশীল এবং নাটকীয় ফ্রেম ব্যবহার করছে। তাদের শিরোনাম হলো "‘আমাকে মেরেও ফেলতে পারে’, আত্মসমর্পণ করবেন শেখ হাসিনা?..."। তারা তাঁর আসন্ন আগমনের সাসপেন্স এবং ইমোশনাল ড্রামাকে উসকে দেয়। আবার, Kolkata24x7 শিরোনাম করেছে "‘আত্মসমর্পণের জন্য তৈরি’, ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরছেন হাসিনা: জল্পনা তুঙ্গে", যেখানে তাঁর সেই মেলোড্রামাটিক উক্তিটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে উদ্ধৃত করা হয়েছে: "নিজের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস চাই"।
এমনকি Deccan Herald-এর মতো মূলধারার ইংরেজি সংবাদপত্র তাঁর আসন্ন আত্মসমর্পণকে বিচারের মুখোমুখি হওয়া হিসেবে না দেখিয়ে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে ফ্রেম করেছে। তাদের শিরোনাম: "Sheikh Hasina eyes December return to Bangladesh to revive Awami League"।
এই ধরনের ভাষা ব্যবহার অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট এবং বিপজ্জনক। তাঁর ফিরে আসাকে "Return 2.0" হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে এবং তাঁর দলকে "revive" করার রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে অহেতুক উন্মাদনা তৈরি করার মাধ্যমে, ভারতীয় মিডিয়া এই অকাট্য সত্যটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছে যে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন পলাতক আসামি। বাংলাদেশের আপামর জনতা যাকে সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই স্বৈরাচারের জন্য তারা একটি ভুয়া প্রত্যাশা ও বৈধতা তৈরি করছে।
একটি সুপরিকল্পিত অনলাইন ইকো চেম্বার
শেখ হাসিনার পরিকল্পিত ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে ভারতীয় মিডিয়ার এই আচরণ একটি সুপরিকল্পিত ও সাজানো 'ইকো চেম্বার'। এই ক্যাম্পেইনের মূল উদ্দেশ্য হলো একজন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারের কলঙ্কিত উত্তরাধিকারকে ধুয়ে মুছে সাফ করা। শুধুমাত্র তাঁর কথিত সাহসিকতা প্রমাণ করে এমন ইংরেজি উদ্ধৃতিগুলোর ওপর ফোকাস করার মাধ্যমে যে ভয়াবহ অপরাধের কারণে তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ এড়িয়ে গিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সক্রিয়ভাবে ইতিহাস বিকৃত করার কাজে অংশ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের মানুষ ২০২৪ সালে এক অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের মাধ্যমে একজন স্বৈরাচারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল তাঁর বিচারহীনতার যুগের অবসান ঘটাতে। ভারতীয় মিডিয়াকে সীমান্তের ওপার থেকে তাঁর হারানো সিংহাসন পুনরায় গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
Topics:
হাসিনা প্রকাশ্যে আসবে, এমন বয়ান আগেও ছড়িয়েছে আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় মিডিয়া
হাসিনা আমলে ক্রসফায়ারের শিকার ৬৩%ই বামপন্থী, এই হিসাব সঠিক নয়
এক অপহরণের ঘটনা যেভাবে ভারতীয় মিডিয়া ফার্স্ট পোস্টে হয়ে গেল হিন্দু পুরোহিতের ওপর সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন
এক অপহরণের ঘটনা যেভাবে ভারতীয় মিডিয়া ফার্স্ট পোস্টে হয়ে গেল হিন্দু পুরোহিতের ওপর সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন
আওয়ামী লীগের তুরাগ নদে 'গণহত্যা'র সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রচারণা
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
100%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
বিশ্লেষণ
পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার অপরাধ আড়াল করে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে ভারতীয় মিডিয়ার বন্দনা
১৫ জুলাই ২০২৬
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ক্ষমতাচ্যুত সাবেক বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আদালতের রায়ে তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছে। তিনি সম্প্রতি রয়টার্সের একটি সাক্ষাতকারে দাবি করেছেন, তিনি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকায় ফিরতে চান। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যম এই খবরটিকে কীভাবে প্রচার করছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের আওয়ামীপন্থী বয়ান প্রচারের একটি ক্যাম্পেইনের চিত্র ফুটে ওঠে। ভারতের জাতীয় ইংরেজি সম্প্রচারমাধ্যম থেকে শুরু করে আঞ্চলিক বাংলা পোর্টালগুলো একজন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী ও দণ্ডিত পলাতক আসামিকে একজন দেশপ্রেমিক ও ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে নতুন করে তুলে ধরার জন্য রীতিমতো একটি সমন্বিত জনসংযোগ বা পিআর (PR) ক্যাম্পেইনে নেমেছে। তাঁর কথিত ভুক্তভোগী দশাকে সামনে আনা হচ্ছে। দেশের মাটির জন্য তাঁর জীবন দেওয়ার ইচ্ছাকে মহিমান্বিত করে প্রচার করা হচ্ছে। তাঁর প্রত্যাবর্তনের জল্পনা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত হাইপ তৈরি করে বয়ান নির্মাণ করা হচ্ছে। তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশে সংঘটিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে সচেতনভাবে আড়াল করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এমন এক ভুয়া বয়ান নির্মাণ করছে যা মূলত বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগ এবং তাঁদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি এক চরম অবমাননা।
ভারতীয় গণমাধ্যমের বর্তমান রিপোর্টিং স্ট্র্যাটেজির অন্যতম মূল ভিত্তি হলো শেখ হাসিনার যেকোনো বয়ানকে বিনা প্রশ্নে এবং কোনো সমালোচনা ছাড়াই প্রচার করা। সংবাদমাধ্যমগুলো সর্বজনীনভাবে এমন আবেগঘন এবং চাঞ্চল্যকরভাবে এই প্রচারণা শুরু করেছে যাতে মনে হবে হাসিনা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো এক দেশপ্রেমিক বীর। কিন্তু কেন তিনি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী, সেই মূল প্রেক্ষাপটটি তারা অত্যন্ত সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে। তারা হাসিনার অত্যন্ত সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী ছবি সহকারে ফটোকার্ড তৈরি করে ফেসবুকে প্রচার করছে হাসিনার বক্তব্য।
উদাহরণস্বরূপ, Zee News (জি নিউজ) তাদের সমস্ত প্ল্যাটফর্মজুড়ে অত্যন্ত নাটকীয় শিরোনাম করেছে: "'If death comes...': Former Bangladesh PM Sheikh Hasina says will return to Dhaka in December"। একজন পলাতক আসামির মুখরক্ষার রাজনৈতিক বক্তব্যকে তারা সাহসিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তারা শেখ হাসিনার সরাসরি ইংরেজি উদ্ধৃতিটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ছেপেছে: "If death comes, I want it to come on my own soil, where my parents are buried and where their blood was shed"। এবং ফেসবুকে একাধিক ফটোকার্ড প্রচার করেছে এই সংবাদের ওপর ভিত্তি করে।
WION ঠিক একই পথ অনুসরণ করে শিরোনাম করেছে: “‘Want death to come on my own soil’: Sheikh Hasina says will return, surrender in December”। তারা কোনো সমালোচনা ছাড়াই তাঁর এই মেলোড্রামাটিক উক্তিটি সম্প্রচার করেছে: "They may arrest me on my return, they may even kill me. Still, I have to go"। একইভাবে, The Times of India (দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া) তাদের বয়ানটি সাজিয়েছে বিপদের মুখে তাঁর কথিত সাহসিকতাকে ঘিরে। এই সংবাদের শিরোনাম ছিল:
"Sheikh Hasina: May get arrested or killed but will go back to Bangladesh by December"। সংবাদ এক ধাপ এগিয়ে চরম অবমাননাকর ভাষায় লেখা হয়েছে "This was the second time that Hasina has declared her intent to return from India, where she fled to escape angry mobs that had threatened to kill her amid violent protests against her govt in 2024." অর্থাৎ তাদের মতে, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে একটি মব তাকে হত্যা করতে গিয়েছিল, তাই তিনি পালিয়ে এসেছেন ভারতে।
এই ধরনের ফ্রে্মিং তৈরি করা চূড়ান্তভাবে ম্যানিপুলেটিভ। বারবার তাঁর সম্ভাব্য মৃত্যুর ইংরেজি উদ্ধৃতি "They may even kill me" এবং "If death comes..."সামনে আনার মাধ্যমে ভারতীয় মিডিয়া অত্যন্ত সুকৌশলে সেই শত শত নিরস্ত্র বাংলাদেশি ছাত্র এবং সাধারণ মানুষের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে, যারা তাঁরই সরাসরি নির্দেশে নিজেদের মাটিতেই প্রাণ হারিয়েছিলেন। মাত্র দুই বছর আগে যে স্বৈরাচারী শাসক গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাকেই এখন দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত এক বীর হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে আর অভ্যুউথানকারীদের বলা হচ্ছে মব, যা ইতিহাসের এক নির্লজ্জ বিকৃতি।
স্বৈরতন্ত্রের জঘন্য অপরাধ আড়াল করে দায়মুক্তি দেয়া
ভারতীয় গণমাধ্যমের কভারেজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো শেখ হাসিনার জঘন্য অপরাধগুলোকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ বা তুলে ধরতে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা। যদিও কিছু গণমাধ্যম বাধ্য হয়ে একটি ছোট ফুটনোট হিসেবে উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, কিন্তু তারা কেউই তাঁর সংঘটিত অপরাধের ভয়াবহ বিবরণ একবারের জন্যও প্রকাশ করেনি। রাষ্ট্র-পরিচালিত একটি নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞকে তারা নিছক একটি "crackdown" বা দমন-পীড়ন হিসেবে লঘুকরণ করেছে।
তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনার বদলে, ভারতীয় গণমাধ্যম তাঁকে একটি গোটা জাতিকে গ্যাসলাইট (Gaslight) করার জন্য অবারিত প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে। সম্প্রতি WION-এর একটি সাক্ষাৎকারে হাসিনাকে তাঁর ১৭ বছরের নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী শাসন এবং আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে হত্যার বিষয়টিকে কেবল একটি ছোট প্রশাসনিক ভুল হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। WION তাঁকে সরাসরি উদ্ধৃত করেছে: "When a government works for a long time, mistakes can happen, no government is above error"।
শত শত ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে হত্যা করাকে "mistake" (ভুল) বলাটা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা। অথচ, WION এই উদ্ধৃতিটি কোনো ধরনের সাংবাদিকসুলভ পাল্টা প্রশ্ন, আগ্রাসী জেরা বা সম্পাদকীয় কাউন্টার-ন্যারেটিভ ছাড়াই ছেপে দিয়েছে। একজন দণ্ডিত গণহত্যাকারীকে একটি হত্যাযজ্ঞকে ক্যাজুয়ালি "mistake" হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং একইসঙ্গে তাঁর এই অভিযোগকে হাইলাইট করা যে, "My party leaders and workers are being subjected to tremendous repression" প্রমাণ করে ভারতীয় মিডিয়া একটি মুক্ত গণমাধ্যমের চেয়ে বরং নির্বাসিত আওয়ামী লীগের জনসংযোগ শাখা হিসেবেই বেশি কাজ করছে। পুরো ন্যারেটিভটিকে উল্টে দেওয়া হয়েছে। যে নিপীড়ক ছিল, তাকে চরমভাবে মানবিকীকরণ করে চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আর তার গণতান্ত্রিক ভিন্নমত দমন এবং বিরোধীদের গুম-খুন করার অকাট্য ইতিহাস কার্পেটের নিচে লুকিয়ে ফেলা হচ্ছে।
"প্রত্যাবর্তন ২.০": একজন পলাতক আসামির প্রত্যাবর্তন ঘিরে অহেতুক হাইপ
ভারতের জাতীয় ইংরেজি গণমাধ্যমগুলো যখন হাসিনার সাহসী ইমেজ তৈরিতে ব্যস্ত, তখন ভারতের আঞ্চলিক বাংলা গণমাধ্যমগুলো আরেক ধাপ এগিয়ে তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে রীতিমতো হাইপ (Hype) তৈরি করছে। তারা এটিকে বিচারের মুখোমুখি হতে একজন দণ্ডিত অপরাধীর আত্মসমর্পণ হিসেবে না দেখিয়ে, একটি বিজয়ী রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে ফ্রেম করছে।
বাংলা পোর্টাল Aajkaal নির্লজ্জভাবে একটি প্রতিবেদন ছেপেছে যার শিরোনাম: "'প্রত্যাবর্তন ২.০ লোডিং', ফের বাংলাদেশ ফিরছেন শেখ হাসিনা? আওয়ামী লীগের পোস্ট ঘিরে তীব্র জল্পনা!"। এই প্রতিবেদনে তাঁর রাজনৈতিক পুনরুত্থান নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা করা হয়েছে এবং এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যা তাঁর ফিরে আসাকে একটি রাজনৈতিক মহোৎসবে পরিণত করে।
Zee News Bengali এই সুরে গলা মিলিয়ে শিরোনাম করেছে: "শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ২. ০ এর প্রস্তুতি তুঙ্গে, বাংলাদেশে ফের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত!"। তারা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে বর্ণনা করেছে কীভাবে লন্ডন, আমেরিকা এবং ভারত থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দিল্লিতে ছুটছেন এবং দেশে তথাকথিত "নিপীড়ন" মোকাবিলায় তিনি কীভাবে দল পুনর্গঠন করছেন।
ABP Live ধারাবাহিকভাবে সহানুভূতিশীল এবং নাটকীয় ফ্রেম ব্যবহার করছে। তাদের শিরোনাম হলো "‘আমাকে মেরেও ফেলতে পারে’, আত্মসমর্পণ করবেন শেখ হাসিনা?..."। তারা তাঁর আসন্ন আগমনের সাসপেন্স এবং ইমোশনাল ড্রামাকে উসকে দেয়। আবার, Kolkata24x7 শিরোনাম করেছে "‘আত্মসমর্পণের জন্য তৈরি’, ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরছেন হাসিনা: জল্পনা তুঙ্গে", যেখানে তাঁর সেই মেলোড্রামাটিক উক্তিটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে উদ্ধৃত করা হয়েছে: "নিজের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস চাই"।
এমনকি Deccan Herald-এর মতো মূলধারার ইংরেজি সংবাদপত্র তাঁর আসন্ন আত্মসমর্পণকে বিচারের মুখোমুখি হওয়া হিসেবে না দেখিয়ে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে ফ্রেম করেছে। তাদের শিরোনাম: "Sheikh Hasina eyes December return to Bangladesh to revive Awami League"।
এই ধরনের ভাষা ব্যবহার অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট এবং বিপজ্জনক। তাঁর ফিরে আসাকে "Return 2.0" হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে এবং তাঁর দলকে "revive" করার রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে অহেতুক উন্মাদনা তৈরি করার মাধ্যমে, ভারতীয় মিডিয়া এই অকাট্য সত্যটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছে যে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন পলাতক আসামি। বাংলাদেশের আপামর জনতা যাকে সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই স্বৈরাচারের জন্য তারা একটি ভুয়া প্রত্যাশা ও বৈধতা তৈরি করছে।
একটি সুপরিকল্পিত অনলাইন ইকো চেম্বার
শেখ হাসিনার পরিকল্পিত ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে ভারতীয় মিডিয়ার এই আচরণ একটি সুপরিকল্পিত ও সাজানো 'ইকো চেম্বার'। এই ক্যাম্পেইনের মূল উদ্দেশ্য হলো একজন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারের কলঙ্কিত উত্তরাধিকারকে ধুয়ে মুছে সাফ করা। শুধুমাত্র তাঁর কথিত সাহসিকতা প্রমাণ করে এমন ইংরেজি উদ্ধৃতিগুলোর ওপর ফোকাস করার মাধ্যমে যে ভয়াবহ অপরাধের কারণে তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ এড়িয়ে গিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সক্রিয়ভাবে ইতিহাস বিকৃত করার কাজে অংশ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের মানুষ ২০২৪ সালে এক অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের মাধ্যমে একজন স্বৈরাচারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল তাঁর বিচারহীনতার যুগের অবসান ঘটাতে। ভারতীয় মিডিয়াকে সীমান্তের ওপার থেকে তাঁর হারানো সিংহাসন পুনরায় গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়।