| বিশ্লেষণ

পলাতক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মচ্ছব

১৮ আগস্ট ২০২৬


পলাতক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মচ্ছব

গত ১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির ইউটিউব চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেন আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশের বিশেষ শাখার (SB) প্রধান মনিরুল ইসলাম। সেখানে তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ে যা বলেছেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। মনিরুল ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর কর্মস্থল ছেড়ে পালিয়ে যান। বিভাগীয় সিদ্ধান্তে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে চলছে অনুসন্ধান। দুই দশকের বেশি সময় জঙ্গিবাদ দমনের কারিগর হিসেবে পরিচিত এ কর্মকর্তা গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অন্তর্বর্তীকালীন ও প্রাথমিক প্রতিবেদনে আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার গুমের সঙ্গে সাবেক এ পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। 

সাক্ষাৎকারে মনিরুল দাবি করছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ নয়, বরং ২০০৬ সাল থেকে সাজানো এবং ‘ডিপ স্টেট’ ও বিদেশি-পৃষ্ঠপোষকতায় চালানো এক ‘রেজিম চেঞ্জ’ অভিযান। বয়ানটি নতুন নয়। এটি প্রায় হুবহু সেই একই তত্ত্ব, যা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে বসে বারবার প্রচার করছেন এবং দেশি-বিদেশি আওয়ামী বয়ান প্রচারকারীরা হরদম ছড়িয়ে যাচ্ছেন। বাংলাফ্যাক্ট এই বয়ানকে বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছে এর অন্তর্হিত অসঙ্গতিসমূহ। 


জুলাই অভ্যুত্থানকে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বানানোর প্রয়াস 

সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম তাঁর প্রথম অন-ক্যামেরা সাক্ষাৎকারে এ বয়ান নির্মাণের চেষ্টা করছেন যে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ ছিল না, বরং ২০০৬ সাল থেকে চলে আসা একটি ‘ডিপ স্টেট’-চালিত, বিদেশি-পৃষ্ঠপোষিত ‘রেজিম চেঞ্জ’ অপারেশন - যেটির নীলনকশা তিনি ২০২৩ সালের মার্চেই একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে হুবহু এঁকে দিয়েছিলেন। 

মনিরুল দাবি করছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনে সক্রিয় ‘বিদেশি শক্তির’ নাম উল্লেখ করে তিনি একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন দিয়েছিলেন, এবং ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা তিনি ২০২৩ সালের মার্চেই এঁকে দিয়েছিলেন। এই একটি দাবির ওপরেই তাঁর গোটা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দাঁড়িয়ে আছে। 

মনিরুল দাবি করেছেন, তাঁর সাত-আট পৃষ্ঠার ওই গবেষণাপত্রের মতো প্রতিবেদনে যাঁদের নাম ছিল, তাঁরা পরে উপদেষ্টা বা কমিশন-প্রধান হয়েছেন, এবং কমবেশি ৯০ ভাগ মিলে গেছে। কিন্তু এ প্রতিবেদনের কোনো কপি আজ পর্যন্ত কোথাও নেই। প্রমাণ হিসেবে তিনি যা দিচ্ছেন, তা কেবল তাঁর নিজের ভাষ্য। এবং সেটার অস্তিত্ব যাচাই-অযোগ্য। একটি ড্রাফট কপি নাকি তাঁর কোনো ডিভাইসে থেকে গিয়েছিল এবং তিনি সরকার পতনের পর রিট্রিভ করেছেন।  

মনিরুলের দাবিটির ভেতরেই একটি প্রকট স্ববিরোধতা রয়েছে। তিনি বলছেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেদনটি সরাসরি হাতে নিয়ে পড়েছেন এবং ‘বেশিরভাগ পয়েন্ট এনডোর্স’ করেছেন। যদি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এতটা নির্দিষ্ট একটি সতর্কবার্তা সত্যিই গৃহীত হয়ে থাকত, তবে সেই একই সরকার নির্বাচনের পর ‘গা-ছাড়া’ হয়ে গেল কীভাবে? একটি সরকার একই সঙ্গে নীলনকশা সম্পর্কে অবহিত এবং উদাসীন হতে পারে না। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মনিরুল স্বীকার করেছেন অভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তাল দিনগুলোতে, মানে ১৩ থেকে ২০ জুলাই, তিনি দেশে ছিলেন না, ছিলেন নিউইয়র্কে একটি প্রোগ্রামে। ১৪ জুলাইয়ের ঘটনা, রাষ্ট্রদূতের কথিত বৈঠক – এসব তিনি ‘পরে শুনেছি’ বলে বর্ণনা করছেন। 

মনিরুল নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ২০১৮-র কোটা আন্দোলন, ইউক্রেন ২০১৪, শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের গণ অভ্যুত্থান সব একসূত্রে গেঁথে দাবি করেছেন, একটি ‘ডিপ স্টেট’ ২০০৬ (মতান্তরে ২০১৯) থেকে ছাত্র-তরুণদের ‘কাজে লাগিয়ে’ সরকার পতনের ছক আঁটছিল। আওয়ামী বয়ানের এটাই সবচেয়ে বড় অংশ। অথচ এই সময়ের সবচেয়ে প্রামাণিক স্বাধীন নথি জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের (OHCHR) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনের সূচনা হাইকোর্টের কোটা পুনর্বহাল আদেশে, আর এর শিকড় ছিল 'ধ্বংসাত্মক ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থা'-জনিত বৈষম্যে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত: ওই সময়ে যা ঘটেছে তা হলো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যু, যাদের ১২-১৩ শতাংশ শিশু। অর্থাৎ যে ঘটনাকে মনিরুল ‘বিদেশি রেজিম চেঞ্জ’ বলছেন, আন্তর্জাতিক তদন্তে সেটিই একটি রাষ্ট্র-পরিচালিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত। 

মনিরুলের ভাষ্যে, ২৮ অক্টোবর ২০২৩-এর বিএনপি-জামায়াতের সমাবেশ ছিল ‘ডিপ স্টেটের ব্লুপ্রিন্ট’, যা সরকার ‘কন্ট্রোল করে ফেলার’ কারণে ব্যর্থ হয়। বাস্তবে ওই সমাবেশকে কেন্দ্র করেই সরকার বিরোধী দলকে কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একে সরাসরি 'নির্বাচনের আগে সহিংস স্বৈরাচারী দমন-পীড়ন' বলে অভিহিত করেছে; সংস্থাটির তথ্যমতে, ২৮ অক্টোবরের পর প্রায় ১০,০০০ বিরোধী নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ প্রায় গোটা শীর্ষ নেতৃত্বকে কারাগারে পাঠানো হয়। বিরোধী হিসাব বলছে, ২৮ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ২৩,০০০-এর বেশি গ্রেপ্তার হয়েছিল। 

এরপর মনিরুল দাবি করছেন, ‘নির্বাচন তো হয়েই গেল’ যেন ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ভোট একটি বৈধ গণরায় ছিল এবং তারপরই সরকার আত্মতুষ্ট হয়ে পড়ে। কিন্তু ওই নির্বাচন বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দল বর্জন করে; আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেহারা দিতে নিজেদেরই নেতাদের 'স্বতন্ত্র' ও 'ডামি' প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ ২০১৪ ও ২০১৮-র ধারাবাহিকতায় একে আরেকটি'ত্রুটিপূর্ণ ভোট' বলেছে। অর্থাৎ 'ডিপ স্টেটের রেজিম চেঞ্জ ব্যর্থ, সরকার বৈধভাবে ক্ষমতায় ফিরল' — এই বয়ানটি নির্জলা মিথ্যাচার। ক্ষমতা ধরে রাখতে সরকারই বিরোধী দলকে দমন করে একটি একতরফা ভোট আয়োজন করেছিল। 

মার্কিন ভিসা নীতি বিদেশি হস্তক্ষেপ নয়, সরকার নিজেই একে স্বাগত জানিয়েছিল

মনিরুল ও সাক্ষাৎকার গ্রহীতা মার্কিন ভিসা নীতিকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অথচ ২০২৩ সালের ২৪ মে ঘোষিত এই নীতিতে স্পষ্ট বলা হয়, গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ন করা যেকোনো ব্যক্তি, তথা সরকারি কর্মকর্তা, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় দলের সদস্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ এর আওতায় পড়বেন। উল্টো, ঘোষণার সময় খোদ আওয়ামী লীগ সরকার এটিকে স্বাগত জানিয়েছিল। তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছিলেন, এতে সরকারের সমস্যা নেই, কারণ সরকার অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কয়েক বছর পর একে 'রেজিম চেঞ্জ' বলে চালানো সরকারের নিজেরই তৎকালীন অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রসঙ্গত, 'আমেরিকা যেকোনো দেশে সরকার বদলাতে পারে' এই বয়ানটিও ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নিজের ২০২৩ সালের বক্তব্য। মনিরুল কেবল সেটিই প্রতিধ্বনিত করছেন। মনের মাধুরী মিশিয়ে অপ্রমাণযোগ্য বয়ান ফেঁদে গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছেন তিনি। 

‘১৪ জুলাইয়ের বক্তব্য টুইস্ট করে ছড়ানো হয়েছে’  

মনিরুল বলছেন, ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য ‘অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা টুইস্ট করে’ ছড়িয়ে দেয়। বাস্তবে ওই বক্তব্য বিকৃত করার কিছু ছিল না। গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক প্রভাষ আমিনের প্রশ্নের জবাবে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা যা উত্তর দিয়েছিলেন তার প্রমাণ রয়েছে। সেখানে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা প্রশ্ন রাখেন, মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা কোটা না পেলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে? এই একটি শব্দ  ‘রাজাকার’ থেকেই সেই রাতে ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান জন্ম নেয়, যা অভ্যুত্থানেরপ্রকৃত ট্রিগার হিসেবে চিহ্নিত। 

লক্ষণীয়, 'আমার বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে' এই আত্মপক্ষ সমর্থন করে শেখ হাসিনা নিজেও পরে বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ বক্তব্যটি বিকৃত হয়নি; এটি রেকর্ডে আছে। 

মনিরুল বলছেন, হাসিনা তাঁকে বলেছিলেন ড. ইউনূস ‘ক্ষমতালোভী, প্যাথলজিক্যাল লায়ার’, নিজেই সরকারপ্রধান হতে চাইবেন এবং তা মিলে গেছে। এটি প্রমাণ নয়, একটি ad hominem, যা তিনি ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার হাসিনার নামে চালাচ্ছেন। আর 'meticulously designed' প্রসঙ্গে যে যুক্তি এখানে লুকিয়ে আছে, তা-ও বিভ্রান্তিকর।  ইউনূস ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভে কথাটি বলেছিলেন ছাত্র সংগঠকদের প্রশংসা করে।  

এই ধরনের আওয়ামী বয়ানটির কাজ একটাই - একটি প্রমাণিত রাষ্ট্রীয় গণহত্যাকে একটি বিদেশি ষড়যন্ত্রে রূপান্তরিত করা, যাতে দায় ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। অথচ জাতিসংঘের প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নথি, ফরেনসিকভাবে যাচাইকৃত ফাঁস হওয়া অডিও, কিংবা খোদ পুলিশের নিজস্ব তথ্য খণ্ডন করে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। 

সাক্ষাৎকারের পরের অংশে সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম 'কে পরিকল্পনা করল' থেকে সরে গিয়ে 'রক্তপাতের দায় কার' এই প্রশ্নে অস্ত্র ও সহিংসতার দায় আইএসআই থেকে মিয়ানমার, ভারতীয় বিদ্রোহী থেকে মাদ্রাসা সবার ঘাড়ে ছড়িয়ে দেন, ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে 'সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল' নেত্রী হিসেবে উপস্থাপন করেন, সেনাবাহিনীর গণহত্যায় অংশ নিতে অস্বীকৃতিকে 'ডিপ স্টেটের স্যাবোটাজ' বলে চিহ্নিত করেন, রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপির জবানবন্দিকে ‘মিথ্যা’ প্রমাণের চেষ্টা করেন এবং পুলিশের শহীদ-সংখ্যা বারিয়ে দেন।

‘অস্ত্রের দায় সবার ঘাড়ে, শুধু আওয়ামী লীগ ছাড়া’ 

মনিরুল দাবি করেন, অবৈধ অস্ত্র জোগাড় করা বাংলাদেশে কঠিন নয়। ভারতে অস্ত্রের কারখানা, মিয়ানমারে আরসা-আরএসও-আরাকান আর্মি-কুকি-চিন, ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী, আইএসআই, ‘১০ ট্রাক অস্ত্র’, কক্সবাজারের দেশি অস্ত্র — সব একসঙ্গে হাজির করে ইঙ্গিত দেন যে জুলাই অভ্যুত্থান ছিল একটি সশস্ত্র অভিযান, যার অস্ত্র এসেছে বাইরে থেকে। 

মনিরুল হিজবুত তাহরীর, আনসার আল ইসলাম, হেফাজতের উগ্র অংশ, জামায়াতের ক্যাডার, এমনকি বিএনপির 'অস্ত্রধারীদের' দায়ী করলেও, জাতিসংঘের তদন্তে অস্ত্রধারীদের প্রকৃত পরিচয় ঠিক বিপরীত। ওএইচসিএইচআর-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খোদ বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘকে ৯৫ জনের একটি তালিকা দিয়েছিল, যারা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় অস্ত্র সরবরাহ করেছিল, যাদের মধ্যে ১০ জন এমপি, ১৪ জন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, ১৬ জন যুবলীগ নেতা, ১৬ জন ছাত্রলীগ নেতা এবং ৭ জন পুলিশ সদস্য। অর্থাৎ নথিভুক্ত অস্ত্রধারীরা মূলত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের লোক, যারা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে গুলি চালিয়েছিল। আর নিহতদের অধিকাংশের শরীরে পাওয়া গেছে ৭.৬২ মিলিমিটার সামরিক গুলি যা বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির তৈরি, বিজিবি-র‍্যাব-সেনা-পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্রের গুলি। বিদেশ থেকে চোরাই অস্ত্র নয়, রাষ্ট্রীয় অস্ত্রই ছিল মৃত্যুর প্রধান কারণ। এ সম্পর্কে দীর্ঘ গবেষণা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে। 

আবু সাঈদ ও ১৬ জুলাইয়ের নিহতদের 'আওয়ামী লীগ' বানানোর চেষ্টা

মনিরুল দাবি করেন, ১৬ জুলাই নিহত ছয়জনের মধ্যে ঢাকার দুইজন (শাহজাহান, সবুজ আলী) ছিলেন আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ, এবং চট্টগ্রামে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া তিনজনও আওয়ামী লীগের। অথচ, ১৬ জুলাই নিহত হন আবু সাঈদ (রংপুর, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়), ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুক (চট্টগ্রাম), এবং শাহজাহান ও সবুজ আলী (ঢাকা)। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটসের নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ সদস্যরাই আন্দোলনকারীদের জমায়েতে গুলি চালিয়ে ওয়াসিম, শান্ত ও কাঠমিস্ত্রি ফারুককে হত্যা করে। আর আবু সাঈদ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের রায় স্পষ্ট। তিনি ছিলেন পুলিশের হাতে ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার। দুই হাত মেলে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় শটগানের ছররায় নিহত এই আবু সাঈদকে মনিরুল ‘ট্রিগারিং ইভেন্ট’ বলে পাশ কাটিয়ে যান, অথচ সেই হত্যাই ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নৃশংসতার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ।

‘হাসিনা সংবেদনশীল ছিলেন, বল প্রয়োগের নির্দেশ দেননি’ 

মনিরুল দাবি করেন, হাসিনা বিচার বিভাগীয় কমিশন করেন, হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান, বিনামূল্যে চিকিৎসার ঘোষণা দেন, ২৭টি পরিবারকে গণভবনে এনে সান্ত্বনা দেন, জনপ্রতি ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেন এবং তিনি নাকি 'বল প্রয়োগে খুবই সংবেদনশীল' ছিলেন, বারবার বলতেন 'ওদের করতে দাও।' ওথচ ১৮ জুলাই ২০২৪-এ জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) রেকর্ড করা এবং আল জাজিরার অনুসন্ধানী ইউনিটের হাতে আসা একটি ফোনালাপে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা বলেন, তিনি সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন 'লিথাল উইপন' ব্যবহারের, 'যেখানে পাবে সেখানে গুলি করবে'। বিবিসি আই-এর ফরেনসিক বিশ্লেষকরা অডিওটিকে সম্পাদিত বা কৃত্রিমভাবে তৈরি নয় বলে নিশ্চিত করেন, এবং বাংলাদেশ পুলিশ তা হাসিনার যাচাইকৃত কণ্ঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনও শপথ নিয়ে বলেন, ১৮ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে হাসিনার সরাসরি 'লিথাল উইপন' ব্যবহারের নির্দেশ তিনি পান, এবং সেদিন থেকেই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঠিক এই অভিযোগেই হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আর নিহতদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাদের চাপ দিয়ে হাসিনার কাছে নেয়া হয়েছিল। 

‘রাজসাক্ষীর জবানবন্দি মিথ্যা’ 

মনিরুল দাবি করেন, রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি মামুনের জবানবন্দিতে 'মিথ্যা' আছে। বিশেষ করে ৪ আগস্টের বৈঠকে শেখ রেহানা বা রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন না; মামুন হয়তো 'চাপে পড়ে লিখে দেওয়া বক্তব্য' দিয়েছেন। এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়।

প্রথমত, মনিরুল নিজেই স্বীকার করেছেন যে ‘আমি সেই মিটিংটাতে ইনভাইটেড ছিলাম না’, তিনি ও ডিজিএফআই প্রধান গণভবনের লবিতে বাইরে বসা ছিলেন। অর্থাৎ ভেতরে কে ছিলেন, তা নিয়ে তাঁর দাবিও প্রত্যক্ষ নয়। দ্বিতীয়ত, মামুন সাক্ষ্য দিয়েছেন যে হত্যাকাণ্ড হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে ঘটেছে, এবং ১৯ জুলাই থেকে প্রায় প্রতি রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমন্ডির বাসায় 'কোর কমিটি'র বৈঠকে দমন-কৌশল নির্ধারিত হতো। তিনি আরও নাম উল্লেখ করেছেন যারা হাসিনাকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে উৎসাহ দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে আছেন ওবায়দুল কাদের, আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, নানক, মির্জা আজম, তাপস ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের। 

‘সেনাবাহিনীর ভেতরে ডিপ স্টেট / স্যাবোটাজ’

মনিরুল দাবি করছেন, ৫ আগস্ট রাষ্ট্র দ্রুত ভেঙে পড়ল কারণ সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি ‘ডিপ স্টেট’ সরকারের বিপক্ষে স্যাবোটাজ করেছে। তারা সকালে এলাকা ছেড়ে দিল। অথচ, সেনাবাহিনী এখানে গণহত্যায় অংস নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অথচ আওয়ামী বয়ানে এটাই স্যাবোটাজ। 

রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী (দুই কর্মরত সেনা কর্মকর্তার বরাতে), ৪ আগস্ট রাতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর জেনারেলদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেন —কারফিউ বলবৎ করতে সেনাবাহিনী বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি চালাবে না। এরপর তিনি হাসিনার দপ্তরে জানান, তাঁর সৈন্যরা এই লকডাউন কার্যকর করতে পারবে না। হাসিনা সেনাবাহিনীর সমর্থন হারিয়েছেন। ৫ আগস্ট সেনাপ্রধান নিজেই ঘোষণা করেন, তিনি পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে গুলি না চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কার্নেগি এনডাউমেন্টের বিশ্লেষণেও এটি হাসিনার সরাসরি নির্দেশ অমান্য করে গুলি চালাতে অস্বীকৃতি হিসেবে বর্ণিত। কেন এই সিদ্ধান্ত? কারণ আন্দোলন এত ব্যাপক ও সর্বস্তরের হয়ে উঠেছিল যে হাসিনার 'উগ্রবাদী/সন্ত্রাসী' বয়ান অর্থাৎ মনিরুল এখানে যে হিজবুত-আনসার-মাদ্রাসা-আইএসআই বয়ানই দিচ্ছেন আর গ্রহণযোগ্য ছিল না, এবং ৪ আগস্টের রক্তপাত (একদিনেই প্রায় ৯০-৯৮ জন নিহত) সৈন্যদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। 

অর্থাৎ মনিরুল যাকে 'স্যাবোটাজ' বলছেন, তা আসলে আরও একটি গণহত্যায় অংশ নিতে সেনাবাহিনীর নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অস্বীকৃতি। গণহত্যা সম্পূর্ণ না করাকে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহ বলছেন। তাঁর নিজের বিবরণটিও স্ববিরোধী। তিনি বলছেন ৪ আগস্ট রাতে সেনাপ্রধান নিজ হাতে লিখে দিয়েছিলেন কোন এলাকা কে পাহারা দেবে (অর্থাৎ সেনাবাহিনী সমন্বয় করছিল), অথচ পরদিন সকালে তারা ছেড়ে দিল। এই তথাকথিত ছেড়ে দেওয়া কোনো রহস্যময় স্যাবোটাজ নয়, বরং ঘোষিত সিদ্ধান্তেরই বাস্তবায়ন যে জনগণের ওপর আর গুলি নয়। আর ‘হারুন ইজহারকে একজন মেজর/কর্নেল ফোন করেছিল’ এই দাবিটি নিছক শোনা কথা, কোনো প্রমাণ নেই।

পুলিশের প্রাণহানি বাড়িয়ে দেখানো

মনিরুল সরকারের ৪৪ জন পুলিশ নিহত পরিসংখ্যান প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেন, প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। তিনি দাবি করেন, নিখোঁজ জুনিয়র কর্মকর্তাদের হয়তো মেরে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এীই দাবিটি খোদ পুলিশের নিজস্ব নথি নাকচ করে। 

পুলিশ সদর দপ্তর ২৫ অক্টোবর ২০২৪-এ নিহত ৪৪ জনের বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করে যেখানে নাম, পদমর্যাদা, মৃত্যুর তারিখ, ইউনিট ও ঘটনাস্থলসহ (৩ ইন্সপেক্টর, ১১ এসআই, ৭ এএসআই, ১ এটিএসআই, ১ নায়েক, ২১ কনস্টেবল; ১৫ জন এনায়েতপুরে, ১৪ জন ডিএমপিতে)। এর মধ্যে ২৫ জন নিহত হন ৫ আগস্ট একদিনেই। সদর দপ্তর স্পষ্ট জানায়, এর চেয়ে বেশি পুলিশ নিহত হওয়ার দাবি করলে প্রমাণ দিতে হবে। মনিরুল কোনো প্রমাণ দেন না বরং বলেন, 'আমার কাছে এক্স্যাক্ট পরিসংখ্যান নাই, অনুমানও করতে পারছি না।' 

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের প্রাণহানি প্রধানত ঘটেছে ৪-৫ আগস্ট  অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন ইতিমধ্যে শত শত আন্দোলনকারীকে হত্যা করে ফেলেছে (প্রথম আলোর হিসাবে ১৬ জুলাই-৪ আগস্টেই অন্তত ৩৫৪ জন নিহত)। পুলিশের ওপর হামলা ছিল ব্যাপক প্রাণহানির পরের প্রতিক্রিয়া, পূর্বপরিকল্পিত সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রমাণ নয়। ৫,৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লক্ষাধিক গুলি লুট হয়েছিল মূলত ৫ আগস্টের পতনের পর, এগুলোও অভ্যুত্থানের 'অস্ত্রের উৎস' নয়, পতনপরবর্তী বিশৃঙ্খলার ফল। প্রায় ১,৪০০ বেসামরিক মৃত্যুর বিপরীতে ৪৪ পুলিশ এই প্রায় ৩০:১ অনুপাতকে 'দুই পক্ষের সংঘর্ষে' রূপান্তরিত করাই মনিরুলের লক্ষ্য। 

অবশেষে তিনি বিচারপ্রক্রিয়াকে 'ফার্স' বলেন যে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছে, তদন্ত হয়নি, রায় আগে থেকে লেখা। বাস্তবে বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য আন্দোলনকারীদের কোনো ইনডেমনিটি দেওয়া হয়নি; এবং ট্রাইব্যুনালের রায় দাঁড়িয়ে আছে ফরেনসিক অডিও, রাজসাক্ষীর জবানবন্দি, জাতিসংঘের তদন্ত ও ব্যালিস্টিক প্রমাণের ওপর। ‘রায় আগে থেকে লেখা’ এটি অভিযুক্ত পক্ষের একটি নিয়মিত বয়ান, প্রমাণ নয়। 





Topics:



এরশাদের দলের কথা নয়, নজরুল ইসলাম খান  কাজী জাফরের “জাতীয় পার্টি”-এর কথা বলেছেন
২৮ আগস্ট ২০২৬

এরশাদের দলের কথা নয়, নজরুল ইসলাম খান কাজী জাফরের “জাতীয় পার্টি”-এর কথা বলেছেন

মিরপুর স্টেডিয়ামের শহীদ আবু সাঈদ স্ট্যান্ডের ব্যানার নিয়ে যা জানা গেল
২৭ আগস্ট ২০২৬

মিরপুর স্টেডিয়ামের শহীদ আবু সাঈদ স্ট্যান্ডের ব্যানার নিয়ে যা জানা গেল

হাসিনা প্রকাশ্যে আসবে, এমন বয়ান আগেও ছড়িয়েছে আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় মিডিয়া
৩ আগস্ট ২০২৬

হাসিনা প্রকাশ্যে আসবে, এমন বয়ান আগেও ছড়িয়েছে আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় মিডিয়া

হাসিনা আমলে ক্রসফায়ারের শিকার ৬৩%ই বামপন্থী, এই হিসাব সঠিক নয়
২ আগস্ট ২০২৬

হাসিনা আমলে ক্রসফায়ারের শিকার ৬৩%ই বামপন্থী, এই হিসাব সঠিক নয়

পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার অপরাধ আড়াল করে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে ভারতীয় মিডিয়ার বন্দনা
১৫ জুলাই ২০২৬

পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার অপরাধ আড়াল করে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে ভারতীয় মিডিয়ার বন্দনা

আপনার মতামত দিন

এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?

এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!

0%

0%

আপনার মতামত শেয়ার করুন:

| মন্তব্য সমূহ:

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!



পলাতক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মচ্ছব

বিশ্লেষণ

পলাতক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মচ্ছব

১৮ আগস্ট ২০২৬

<p><span style="font-weight: bold; font-size: 18px;">পলাতক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মচ্ছব</span><br /></p>

গত ১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির ইউটিউব চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেন আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশের বিশেষ শাখার (SB) প্রধান মনিরুল ইসলাম। সেখানে তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ে যা বলেছেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। মনিরুল ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর কর্মস্থল ছেড়ে পালিয়ে যান। বিভাগীয় সিদ্ধান্তে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে চলছে অনুসন্ধান। দুই দশকের বেশি সময় জঙ্গিবাদ দমনের কারিগর হিসেবে পরিচিত এ কর্মকর্তা গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অন্তর্বর্তীকালীন ও প্রাথমিক প্রতিবেদনে আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার গুমের সঙ্গে সাবেক এ পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। 

সাক্ষাৎকারে মনিরুল দাবি করছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ নয়, বরং ২০০৬ সাল থেকে সাজানো এবং ‘ডিপ স্টেট’ ও বিদেশি-পৃষ্ঠপোষকতায় চালানো এক ‘রেজিম চেঞ্জ’ অভিযান। বয়ানটি নতুন নয়। এটি প্রায় হুবহু সেই একই তত্ত্ব, যা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে বসে বারবার প্রচার করছেন এবং দেশি-বিদেশি আওয়ামী বয়ান প্রচারকারীরা হরদম ছড়িয়ে যাচ্ছেন। বাংলাফ্যাক্ট এই বয়ানকে বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছে এর অন্তর্হিত অসঙ্গতিসমূহ। 


জুলাই অভ্যুত্থানকে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বানানোর প্রয়াস 

সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম তাঁর প্রথম অন-ক্যামেরা সাক্ষাৎকারে এ বয়ান নির্মাণের চেষ্টা করছেন যে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ ছিল না, বরং ২০০৬ সাল থেকে চলে আসা একটি ‘ডিপ স্টেট’-চালিত, বিদেশি-পৃষ্ঠপোষিত ‘রেজিম চেঞ্জ’ অপারেশন - যেটির নীলনকশা তিনি ২০২৩ সালের মার্চেই একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে হুবহু এঁকে দিয়েছিলেন। 

মনিরুল দাবি করছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনে সক্রিয় ‘বিদেশি শক্তির’ নাম উল্লেখ করে তিনি একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন দিয়েছিলেন, এবং ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা তিনি ২০২৩ সালের মার্চেই এঁকে দিয়েছিলেন। এই একটি দাবির ওপরেই তাঁর গোটা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দাঁড়িয়ে আছে। 

মনিরুল দাবি করেছেন, তাঁর সাত-আট পৃষ্ঠার ওই গবেষণাপত্রের মতো প্রতিবেদনে যাঁদের নাম ছিল, তাঁরা পরে উপদেষ্টা বা কমিশন-প্রধান হয়েছেন, এবং কমবেশি ৯০ ভাগ মিলে গেছে। কিন্তু এ প্রতিবেদনের কোনো কপি আজ পর্যন্ত কোথাও নেই। প্রমাণ হিসেবে তিনি যা দিচ্ছেন, তা কেবল তাঁর নিজের ভাষ্য। এবং সেটার অস্তিত্ব যাচাই-অযোগ্য। একটি ড্রাফট কপি নাকি তাঁর কোনো ডিভাইসে থেকে গিয়েছিল এবং তিনি সরকার পতনের পর রিট্রিভ করেছেন।  

মনিরুলের দাবিটির ভেতরেই একটি প্রকট স্ববিরোধতা রয়েছে। তিনি বলছেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেদনটি সরাসরি হাতে নিয়ে পড়েছেন এবং ‘বেশিরভাগ পয়েন্ট এনডোর্স’ করেছেন। যদি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এতটা নির্দিষ্ট একটি সতর্কবার্তা সত্যিই গৃহীত হয়ে থাকত, তবে সেই একই সরকার নির্বাচনের পর ‘গা-ছাড়া’ হয়ে গেল কীভাবে? একটি সরকার একই সঙ্গে নীলনকশা সম্পর্কে অবহিত এবং উদাসীন হতে পারে না। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মনিরুল স্বীকার করেছেন অভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তাল দিনগুলোতে, মানে ১৩ থেকে ২০ জুলাই, তিনি দেশে ছিলেন না, ছিলেন নিউইয়র্কে একটি প্রোগ্রামে। ১৪ জুলাইয়ের ঘটনা, রাষ্ট্রদূতের কথিত বৈঠক – এসব তিনি ‘পরে শুনেছি’ বলে বর্ণনা করছেন। 

মনিরুল নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ২০১৮-র কোটা আন্দোলন, ইউক্রেন ২০১৪, শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের গণ অভ্যুত্থান সব একসূত্রে গেঁথে দাবি করেছেন, একটি ‘ডিপ স্টেট’ ২০০৬ (মতান্তরে ২০১৯) থেকে ছাত্র-তরুণদের ‘কাজে লাগিয়ে’ সরকার পতনের ছক আঁটছিল। আওয়ামী বয়ানের এটাই সবচেয়ে বড় অংশ। অথচ এই সময়ের সবচেয়ে প্রামাণিক স্বাধীন নথি জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের (OHCHR) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনের সূচনা হাইকোর্টের কোটা পুনর্বহাল আদেশে, আর এর শিকড় ছিল 'ধ্বংসাত্মক ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থা'-জনিত বৈষম্যে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত: ওই সময়ে যা ঘটেছে তা হলো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যু, যাদের ১২-১৩ শতাংশ শিশু। অর্থাৎ যে ঘটনাকে মনিরুল ‘বিদেশি রেজিম চেঞ্জ’ বলছেন, আন্তর্জাতিক তদন্তে সেটিই একটি রাষ্ট্র-পরিচালিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত। 

মনিরুলের ভাষ্যে, ২৮ অক্টোবর ২০২৩-এর বিএনপি-জামায়াতের সমাবেশ ছিল ‘ডিপ স্টেটের ব্লুপ্রিন্ট’, যা সরকার ‘কন্ট্রোল করে ফেলার’ কারণে ব্যর্থ হয়। বাস্তবে ওই সমাবেশকে কেন্দ্র করেই সরকার বিরোধী দলকে কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একে সরাসরি 'নির্বাচনের আগে সহিংস স্বৈরাচারী দমন-পীড়ন' বলে অভিহিত করেছে; সংস্থাটির তথ্যমতে, ২৮ অক্টোবরের পর প্রায় ১০,০০০ বিরোধী নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ প্রায় গোটা শীর্ষ নেতৃত্বকে কারাগারে পাঠানো হয়। বিরোধী হিসাব বলছে, ২৮ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ২৩,০০০-এর বেশি গ্রেপ্তার হয়েছিল। 

এরপর মনিরুল দাবি করছেন, ‘নির্বাচন তো হয়েই গেল’ যেন ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ভোট একটি বৈধ গণরায় ছিল এবং তারপরই সরকার আত্মতুষ্ট হয়ে পড়ে। কিন্তু ওই নির্বাচন বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দল বর্জন করে; আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেহারা দিতে নিজেদেরই নেতাদের 'স্বতন্ত্র' ও 'ডামি' প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ ২০১৪ ও ২০১৮-র ধারাবাহিকতায় একে আরেকটি'ত্রুটিপূর্ণ ভোট' বলেছে। অর্থাৎ 'ডিপ স্টেটের রেজিম চেঞ্জ ব্যর্থ, সরকার বৈধভাবে ক্ষমতায় ফিরল' — এই বয়ানটি নির্জলা মিথ্যাচার। ক্ষমতা ধরে রাখতে সরকারই বিরোধী দলকে দমন করে একটি একতরফা ভোট আয়োজন করেছিল। 

মার্কিন ভিসা নীতি বিদেশি হস্তক্ষেপ নয়, সরকার নিজেই একে স্বাগত জানিয়েছিল

মনিরুল ও সাক্ষাৎকার গ্রহীতা মার্কিন ভিসা নীতিকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অথচ ২০২৩ সালের ২৪ মে ঘোষিত এই নীতিতে স্পষ্ট বলা হয়, গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ন করা যেকোনো ব্যক্তি, তথা সরকারি কর্মকর্তা, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় দলের সদস্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ এর আওতায় পড়বেন। উল্টো, ঘোষণার সময় খোদ আওয়ামী লীগ সরকার এটিকে স্বাগত জানিয়েছিল। তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছিলেন, এতে সরকারের সমস্যা নেই, কারণ সরকার অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কয়েক বছর পর একে 'রেজিম চেঞ্জ' বলে চালানো সরকারের নিজেরই তৎকালীন অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রসঙ্গত, 'আমেরিকা যেকোনো দেশে সরকার বদলাতে পারে' এই বয়ানটিও ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নিজের ২০২৩ সালের বক্তব্য। মনিরুল কেবল সেটিই প্রতিধ্বনিত করছেন। মনের মাধুরী মিশিয়ে অপ্রমাণযোগ্য বয়ান ফেঁদে গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছেন তিনি। 

‘১৪ জুলাইয়ের বক্তব্য টুইস্ট করে ছড়ানো হয়েছে’  

মনিরুল বলছেন, ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য ‘অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা টুইস্ট করে’ ছড়িয়ে দেয়। বাস্তবে ওই বক্তব্য বিকৃত করার কিছু ছিল না। গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক প্রভাষ আমিনের প্রশ্নের জবাবে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা যা উত্তর দিয়েছিলেন তার প্রমাণ রয়েছে। সেখানে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা প্রশ্ন রাখেন, মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা কোটা না পেলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে? এই একটি শব্দ  ‘রাজাকার’ থেকেই সেই রাতে ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান জন্ম নেয়, যা অভ্যুত্থানেরপ্রকৃত ট্রিগার হিসেবে চিহ্নিত। 

লক্ষণীয়, 'আমার বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে' এই আত্মপক্ষ সমর্থন করে শেখ হাসিনা নিজেও পরে বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ বক্তব্যটি বিকৃত হয়নি; এটি রেকর্ডে আছে। 

মনিরুল বলছেন, হাসিনা তাঁকে বলেছিলেন ড. ইউনূস ‘ক্ষমতালোভী, প্যাথলজিক্যাল লায়ার’, নিজেই সরকারপ্রধান হতে চাইবেন এবং তা মিলে গেছে। এটি প্রমাণ নয়, একটি ad hominem, যা তিনি ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার হাসিনার নামে চালাচ্ছেন। আর 'meticulously designed' প্রসঙ্গে যে যুক্তি এখানে লুকিয়ে আছে, তা-ও বিভ্রান্তিকর।  ইউনূস ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভে কথাটি বলেছিলেন ছাত্র সংগঠকদের প্রশংসা করে।  

এই ধরনের আওয়ামী বয়ানটির কাজ একটাই - একটি প্রমাণিত রাষ্ট্রীয় গণহত্যাকে একটি বিদেশি ষড়যন্ত্রে রূপান্তরিত করা, যাতে দায় ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। অথচ জাতিসংঘের প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নথি, ফরেনসিকভাবে যাচাইকৃত ফাঁস হওয়া অডিও, কিংবা খোদ পুলিশের নিজস্ব তথ্য খণ্ডন করে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। 

সাক্ষাৎকারের পরের অংশে সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম 'কে পরিকল্পনা করল' থেকে সরে গিয়ে 'রক্তপাতের দায় কার' এই প্রশ্নে অস্ত্র ও সহিংসতার দায় আইএসআই থেকে মিয়ানমার, ভারতীয় বিদ্রোহী থেকে মাদ্রাসা সবার ঘাড়ে ছড়িয়ে দেন, ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে 'সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল' নেত্রী হিসেবে উপস্থাপন করেন, সেনাবাহিনীর গণহত্যায় অংশ নিতে অস্বীকৃতিকে 'ডিপ স্টেটের স্যাবোটাজ' বলে চিহ্নিত করেন, রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপির জবানবন্দিকে ‘মিথ্যা’ প্রমাণের চেষ্টা করেন এবং পুলিশের শহীদ-সংখ্যা বারিয়ে দেন।

‘অস্ত্রের দায় সবার ঘাড়ে, শুধু আওয়ামী লীগ ছাড়া’ 

মনিরুল দাবি করেন, অবৈধ অস্ত্র জোগাড় করা বাংলাদেশে কঠিন নয়। ভারতে অস্ত্রের কারখানা, মিয়ানমারে আরসা-আরএসও-আরাকান আর্মি-কুকি-চিন, ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী, আইএসআই, ‘১০ ট্রাক অস্ত্র’, কক্সবাজারের দেশি অস্ত্র — সব একসঙ্গে হাজির করে ইঙ্গিত দেন যে জুলাই অভ্যুত্থান ছিল একটি সশস্ত্র অভিযান, যার অস্ত্র এসেছে বাইরে থেকে। 

মনিরুল হিজবুত তাহরীর, আনসার আল ইসলাম, হেফাজতের উগ্র অংশ, জামায়াতের ক্যাডার, এমনকি বিএনপির 'অস্ত্রধারীদের' দায়ী করলেও, জাতিসংঘের তদন্তে অস্ত্রধারীদের প্রকৃত পরিচয় ঠিক বিপরীত। ওএইচসিএইচআর-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খোদ বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘকে ৯৫ জনের একটি তালিকা দিয়েছিল, যারা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় অস্ত্র সরবরাহ করেছিল, যাদের মধ্যে ১০ জন এমপি, ১৪ জন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, ১৬ জন যুবলীগ নেতা, ১৬ জন ছাত্রলীগ নেতা এবং ৭ জন পুলিশ সদস্য। অর্থাৎ নথিভুক্ত অস্ত্রধারীরা মূলত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের লোক, যারা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে গুলি চালিয়েছিল। আর নিহতদের অধিকাংশের শরীরে পাওয়া গেছে ৭.৬২ মিলিমিটার সামরিক গুলি যা বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির তৈরি, বিজিবি-র‍্যাব-সেনা-পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্রের গুলি। বিদেশ থেকে চোরাই অস্ত্র নয়, রাষ্ট্রীয় অস্ত্রই ছিল মৃত্যুর প্রধান কারণ। এ সম্পর্কে দীর্ঘ গবেষণা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে। 

আবু সাঈদ ও ১৬ জুলাইয়ের নিহতদের 'আওয়ামী লীগ' বানানোর চেষ্টা

মনিরুল দাবি করেন, ১৬ জুলাই নিহত ছয়জনের মধ্যে ঢাকার দুইজন (শাহজাহান, সবুজ আলী) ছিলেন আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ, এবং চট্টগ্রামে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া তিনজনও আওয়ামী লীগের। অথচ, ১৬ জুলাই নিহত হন আবু সাঈদ (রংপুর, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়), ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুক (চট্টগ্রাম), এবং শাহজাহান ও সবুজ আলী (ঢাকা)। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটসের নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ সদস্যরাই আন্দোলনকারীদের জমায়েতে গুলি চালিয়ে ওয়াসিম, শান্ত ও কাঠমিস্ত্রি ফারুককে হত্যা করে। আর আবু সাঈদ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের রায় স্পষ্ট। তিনি ছিলেন পুলিশের হাতে ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার। দুই হাত মেলে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় শটগানের ছররায় নিহত এই আবু সাঈদকে মনিরুল ‘ট্রিগারিং ইভেন্ট’ বলে পাশ কাটিয়ে যান, অথচ সেই হত্যাই ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নৃশংসতার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ।

‘হাসিনা সংবেদনশীল ছিলেন, বল প্রয়োগের নির্দেশ দেননি’ 

মনিরুল দাবি করেন, হাসিনা বিচার বিভাগীয় কমিশন করেন, হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান, বিনামূল্যে চিকিৎসার ঘোষণা দেন, ২৭টি পরিবারকে গণভবনে এনে সান্ত্বনা দেন, জনপ্রতি ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেন এবং তিনি নাকি 'বল প্রয়োগে খুবই সংবেদনশীল' ছিলেন, বারবার বলতেন 'ওদের করতে দাও।' ওথচ ১৮ জুলাই ২০২৪-এ জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) রেকর্ড করা এবং আল জাজিরার অনুসন্ধানী ইউনিটের হাতে আসা একটি ফোনালাপে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা বলেন, তিনি সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন 'লিথাল উইপন' ব্যবহারের, 'যেখানে পাবে সেখানে গুলি করবে'। বিবিসি আই-এর ফরেনসিক বিশ্লেষকরা অডিওটিকে সম্পাদিত বা কৃত্রিমভাবে তৈরি নয় বলে নিশ্চিত করেন, এবং বাংলাদেশ পুলিশ তা হাসিনার যাচাইকৃত কণ্ঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনও শপথ নিয়ে বলেন, ১৮ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে হাসিনার সরাসরি 'লিথাল উইপন' ব্যবহারের নির্দেশ তিনি পান, এবং সেদিন থেকেই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঠিক এই অভিযোগেই হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আর নিহতদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাদের চাপ দিয়ে হাসিনার কাছে নেয়া হয়েছিল। 

‘রাজসাক্ষীর জবানবন্দি মিথ্যা’ 

মনিরুল দাবি করেন, রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি মামুনের জবানবন্দিতে 'মিথ্যা' আছে। বিশেষ করে ৪ আগস্টের বৈঠকে শেখ রেহানা বা রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন না; মামুন হয়তো 'চাপে পড়ে লিখে দেওয়া বক্তব্য' দিয়েছেন। এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়।

প্রথমত, মনিরুল নিজেই স্বীকার করেছেন যে ‘আমি সেই মিটিংটাতে ইনভাইটেড ছিলাম না’, তিনি ও ডিজিএফআই প্রধান গণভবনের লবিতে বাইরে বসা ছিলেন। অর্থাৎ ভেতরে কে ছিলেন, তা নিয়ে তাঁর দাবিও প্রত্যক্ষ নয়। দ্বিতীয়ত, মামুন সাক্ষ্য দিয়েছেন যে হত্যাকাণ্ড হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে ঘটেছে, এবং ১৯ জুলাই থেকে প্রায় প্রতি রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমন্ডির বাসায় 'কোর কমিটি'র বৈঠকে দমন-কৌশল নির্ধারিত হতো। তিনি আরও নাম উল্লেখ করেছেন যারা হাসিনাকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে উৎসাহ দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে আছেন ওবায়দুল কাদের, আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, নানক, মির্জা আজম, তাপস ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের। 

‘সেনাবাহিনীর ভেতরে ডিপ স্টেট / স্যাবোটাজ’

মনিরুল দাবি করছেন, ৫ আগস্ট রাষ্ট্র দ্রুত ভেঙে পড়ল কারণ সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি ‘ডিপ স্টেট’ সরকারের বিপক্ষে স্যাবোটাজ করেছে। তারা সকালে এলাকা ছেড়ে দিল। অথচ, সেনাবাহিনী এখানে গণহত্যায় অংস নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অথচ আওয়ামী বয়ানে এটাই স্যাবোটাজ। 

রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী (দুই কর্মরত সেনা কর্মকর্তার বরাতে), ৪ আগস্ট রাতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর জেনারেলদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেন —কারফিউ বলবৎ করতে সেনাবাহিনী বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি চালাবে না। এরপর তিনি হাসিনার দপ্তরে জানান, তাঁর সৈন্যরা এই লকডাউন কার্যকর করতে পারবে না। হাসিনা সেনাবাহিনীর সমর্থন হারিয়েছেন। ৫ আগস্ট সেনাপ্রধান নিজেই ঘোষণা করেন, তিনি পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে গুলি না চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কার্নেগি এনডাউমেন্টের বিশ্লেষণেও এটি হাসিনার সরাসরি নির্দেশ অমান্য করে গুলি চালাতে অস্বীকৃতি হিসেবে বর্ণিত। কেন এই সিদ্ধান্ত? কারণ আন্দোলন এত ব্যাপক ও সর্বস্তরের হয়ে উঠেছিল যে হাসিনার 'উগ্রবাদী/সন্ত্রাসী' বয়ান অর্থাৎ মনিরুল এখানে যে হিজবুত-আনসার-মাদ্রাসা-আইএসআই বয়ানই দিচ্ছেন আর গ্রহণযোগ্য ছিল না, এবং ৪ আগস্টের রক্তপাত (একদিনেই প্রায় ৯০-৯৮ জন নিহত) সৈন্যদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। 

অর্থাৎ মনিরুল যাকে 'স্যাবোটাজ' বলছেন, তা আসলে আরও একটি গণহত্যায় অংশ নিতে সেনাবাহিনীর নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অস্বীকৃতি। গণহত্যা সম্পূর্ণ না করাকে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহ বলছেন। তাঁর নিজের বিবরণটিও স্ববিরোধী। তিনি বলছেন ৪ আগস্ট রাতে সেনাপ্রধান নিজ হাতে লিখে দিয়েছিলেন কোন এলাকা কে পাহারা দেবে (অর্থাৎ সেনাবাহিনী সমন্বয় করছিল), অথচ পরদিন সকালে তারা ছেড়ে দিল। এই তথাকথিত ছেড়ে দেওয়া কোনো রহস্যময় স্যাবোটাজ নয়, বরং ঘোষিত সিদ্ধান্তেরই বাস্তবায়ন যে জনগণের ওপর আর গুলি নয়। আর ‘হারুন ইজহারকে একজন মেজর/কর্নেল ফোন করেছিল’ এই দাবিটি নিছক শোনা কথা, কোনো প্রমাণ নেই।

পুলিশের প্রাণহানি বাড়িয়ে দেখানো

মনিরুল সরকারের ৪৪ জন পুলিশ নিহত পরিসংখ্যান প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেন, প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। তিনি দাবি করেন, নিখোঁজ জুনিয়র কর্মকর্তাদের হয়তো মেরে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এীই দাবিটি খোদ পুলিশের নিজস্ব নথি নাকচ করে। 

পুলিশ সদর দপ্তর ২৫ অক্টোবর ২০২৪-এ নিহত ৪৪ জনের বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করে যেখানে নাম, পদমর্যাদা, মৃত্যুর তারিখ, ইউনিট ও ঘটনাস্থলসহ (৩ ইন্সপেক্টর, ১১ এসআই, ৭ এএসআই, ১ এটিএসআই, ১ নায়েক, ২১ কনস্টেবল; ১৫ জন এনায়েতপুরে, ১৪ জন ডিএমপিতে)। এর মধ্যে ২৫ জন নিহত হন ৫ আগস্ট একদিনেই। সদর দপ্তর স্পষ্ট জানায়, এর চেয়ে বেশি পুলিশ নিহত হওয়ার দাবি করলে প্রমাণ দিতে হবে। মনিরুল কোনো প্রমাণ দেন না বরং বলেন, 'আমার কাছে এক্স্যাক্ট পরিসংখ্যান নাই, অনুমানও করতে পারছি না।' 

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের প্রাণহানি প্রধানত ঘটেছে ৪-৫ আগস্ট  অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন ইতিমধ্যে শত শত আন্দোলনকারীকে হত্যা করে ফেলেছে (প্রথম আলোর হিসাবে ১৬ জুলাই-৪ আগস্টেই অন্তত ৩৫৪ জন নিহত)। পুলিশের ওপর হামলা ছিল ব্যাপক প্রাণহানির পরের প্রতিক্রিয়া, পূর্বপরিকল্পিত সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রমাণ নয়। ৫,৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লক্ষাধিক গুলি লুট হয়েছিল মূলত ৫ আগস্টের পতনের পর, এগুলোও অভ্যুত্থানের 'অস্ত্রের উৎস' নয়, পতনপরবর্তী বিশৃঙ্খলার ফল। প্রায় ১,৪০০ বেসামরিক মৃত্যুর বিপরীতে ৪৪ পুলিশ এই প্রায় ৩০:১ অনুপাতকে 'দুই পক্ষের সংঘর্ষে' রূপান্তরিত করাই মনিরুলের লক্ষ্য। 

অবশেষে তিনি বিচারপ্রক্রিয়াকে 'ফার্স' বলেন যে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছে, তদন্ত হয়নি, রায় আগে থেকে লেখা। বাস্তবে বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য আন্দোলনকারীদের কোনো ইনডেমনিটি দেওয়া হয়নি; এবং ট্রাইব্যুনালের রায় দাঁড়িয়ে আছে ফরেনসিক অডিও, রাজসাক্ষীর জবানবন্দি, জাতিসংঘের তদন্ত ও ব্যালিস্টিক প্রমাণের ওপর। ‘রায় আগে থেকে লেখা’ এটি অভিযুক্ত পক্ষের একটি নিয়মিত বয়ান, প্রমাণ নয়।