| বিশ্লেষণ
বিতর্কের উৎস যখন মিডিয়ার খবর:
সর্ষের মধ্যেই ভূতের বসবাস!
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাজে বেশ কিছু বড় বিচ্যুতি দেখা গেছে। ভুল তথ্য প্রচার, দায়সারা সোর্স ব্যবহার ও সার্কুলার সাইটেশনের মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে এক সংকট।
সার্কুলার সাইটেশন বিতর্ক
সম্প্রতি সার্কুলার সাইটেশনের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে দৈনিক ডেইলি স্টার। গত ২৪ আগস্ট কলামিস্ট কল্লোল কিবরিয়া মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারে একটি কলাম প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে সেই মতামত বা বক্তব্যকেই রয়টার্সের প্রতিবেদন হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং ডেইলি স্টার তা পুনরায় প্রকাশ করে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নাগরিকত্ব বিতর্ক
সম্প্রতি নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়েও দেশের গণমাধ্যমগুলোতে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিকের দেশের সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই। পরবর্তীতে আইনমন্ত্রী পরিষ্কার করেন যে হুমায়ুন কবির নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করেই শপথ নিয়েছেন। কিন্তু এই প্রচারণা এমন একটা সময়ে আসে, যখন হুমায়ুন কবির ভারতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
সিপিডি ও ঢাকা ট্রিবিউনের ভুল তথ্য বিতর্ক
নথিপত্র যাচাই না করে তড়িঘড়ি সংবাদ প্রকাশের ফলে দীর্ঘমেয়াদী যে ক্ষতি হয়, তার উদাহরণ দেখা যায় দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর একটি ভুলে। ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংলাপে দাবি করা হয়, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য।
কিন্তু পরের দিনই সিপিডি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের এই ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, তথ্যটি মূলত ২২ আগস্ট ঢাকা ট্রিবিউনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা ট্রিবিউন তাদের প্রতিবেদনে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছিল। তারা মূলত প্রথম আলোয় ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত একটি পুরোনো সংবাদের মূল সময়কাল পরিবর্তন করে ‘জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬’ লিখে দিয়েছিল।
ঢাকা ট্রিবিউন পরে তাদের প্রতিবেদনটি সংশোধন করলেও ততক্ষণে বড় ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। দেশের একটি প্রথম সারির নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান যখন গণমাধ্যমের ভুল ও অপ্রমাণিত তথ্যের ফাঁদে পা দেয়, তখন তা পুরো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণকেই দুর্বল করে ফেলে। এটি প্রমাণ করে, গণমাধ্যমের তথ্য প্রকাশের আগে ‘ডবল ভেরিফিকেশন’ বা দ্বিগুণ যাচাই কতটা জরুরি।
সাকিব ও মাশরাফির ‘ইমেজ ক্লিন’ বিতর্ক
এরই পাশাপাশি দেশের মূলধারার বেশ কিছু গণমাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিতর্কিত ভূমিকার কারণে সমালোচিত সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের দুই সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান এবং মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে অতি-আবেগপূর্ণ প্রতিবেদন প্রচার করেছে যা একটি পি-আর ক্যাম্পেইনের দিকে ইঙ্গিত করে।
উভয় ক্রিকেটারের বিরুদ্ধেই গুরুতর ফৌজদারি মামলা এবং তদন্ত চলমান থাকলেও বেশ কিছু গণমাধ্যম তাদের ‘ভিকটিম’ বা বলির পাঁঠা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি তাদের বাড়ি পোড়ানো বা মামলা সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যাতে জুলাই অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পক্ষে তাদের অন্ধ সমর্থন এবং জনগণের ওপর দমনপীড়নে নীরব সম্মতির ইতিহাস মানুষ ভুলে যায়।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এসে সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজেরা বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে গণমাধ্যমগুলোকে কঠোর নীতি ও দ্বিগুণ যাচাই পদ্ধতি অনুসরণ করতেই হবে।
Topics:
এরশাদের দলের কথা নয়, নজরুল ইসলাম খান কাজী জাফরের “জাতীয় পার্টি”-এর কথা বলেছেন
মিরপুর স্টেডিয়ামের শহীদ আবু সাঈদ স্ট্যান্ডের ব্যানার নিয়ে যা জানা গেল
পলাতক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মচ্ছব
হাসিনা প্রকাশ্যে আসবে, এমন বয়ান আগেও ছড়িয়েছে আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় মিডিয়া
হাসিনা আমলে ক্রসফায়ারের শিকার ৬৩%ই বামপন্থী, এই হিসাব সঠিক নয়
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!
0%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
| আরও পড়ুন
পলাতক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকারে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মচ্ছব
চন্দন নন্দীর পুরনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি: পরেশ বড়ুয়াকে ঘিরে তথ্যপ্রমাণহীন ‘সংবাদ’ আনন্দবাজার ও এই সময় অনলাইনে
হাসিনার সন্তানদের রাজনীতিতে ফেরা প্রসঙ্গে তারেক রহমানের বক্তব্য বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ:
ফেসবুকে আওয়ামীপন্থীদের হুমকি, দায় চাপানোর রাজনীতি ও উদযাপন
বিশ্লেষণ
বিতর্কের উৎস যখন মিডিয়ার খবর:
সর্ষের মধ্যেই ভূতের বসবাস!
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাজে বেশ কিছু বড় বিচ্যুতি দেখা গেছে। ভুল তথ্য প্রচার, দায়সারা সোর্স ব্যবহার ও সার্কুলার সাইটেশনের মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে এক সংকট।
সার্কুলার সাইটেশন বিতর্ক
সম্প্রতি সার্কুলার সাইটেশনের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে দৈনিক ডেইলি স্টার। গত ২৪ আগস্ট কলামিস্ট কল্লোল কিবরিয়া মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারে একটি কলাম প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে সেই মতামত বা বক্তব্যকেই রয়টার্সের প্রতিবেদন হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং ডেইলি স্টার তা পুনরায় প্রকাশ করে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নাগরিকত্ব বিতর্ক
সম্প্রতি নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়েও দেশের গণমাধ্যমগুলোতে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিকের দেশের সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই। পরবর্তীতে আইনমন্ত্রী পরিষ্কার করেন যে হুমায়ুন কবির নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করেই শপথ নিয়েছেন। কিন্তু এই প্রচারণা এমন একটা সময়ে আসে, যখন হুমায়ুন কবির ভারতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
সিপিডি ও ঢাকা ট্রিবিউনের ভুল তথ্য বিতর্ক
নথিপত্র যাচাই না করে তড়িঘড়ি সংবাদ প্রকাশের ফলে দীর্ঘমেয়াদী যে ক্ষতি হয়, তার উদাহরণ দেখা যায় দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর একটি ভুলে। ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংলাপে দাবি করা হয়, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য।
কিন্তু পরের দিনই সিপিডি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের এই ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, তথ্যটি মূলত ২২ আগস্ট ঢাকা ট্রিবিউনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা ট্রিবিউন তাদের প্রতিবেদনে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছিল। তারা মূলত প্রথম আলোয় ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত একটি পুরোনো সংবাদের মূল সময়কাল পরিবর্তন করে ‘জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬’ লিখে দিয়েছিল।
ঢাকা ট্রিবিউন পরে তাদের প্রতিবেদনটি সংশোধন করলেও ততক্ষণে বড় ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। দেশের একটি প্রথম সারির নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান যখন গণমাধ্যমের ভুল ও অপ্রমাণিত তথ্যের ফাঁদে পা দেয়, তখন তা পুরো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণকেই দুর্বল করে ফেলে। এটি প্রমাণ করে, গণমাধ্যমের তথ্য প্রকাশের আগে ‘ডবল ভেরিফিকেশন’ বা দ্বিগুণ যাচাই কতটা জরুরি।
সাকিব ও মাশরাফির ‘ইমেজ ক্লিন’ বিতর্ক
এরই পাশাপাশি দেশের মূলধারার বেশ কিছু গণমাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিতর্কিত ভূমিকার কারণে সমালোচিত সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের দুই সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান এবং মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে অতি-আবেগপূর্ণ প্রতিবেদন প্রচার করেছে যা একটি পি-আর ক্যাম্পেইনের দিকে ইঙ্গিত করে।
উভয় ক্রিকেটারের বিরুদ্ধেই গুরুতর ফৌজদারি মামলা এবং তদন্ত চলমান থাকলেও বেশ কিছু গণমাধ্যম তাদের ‘ভিকটিম’ বা বলির পাঁঠা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি তাদের বাড়ি পোড়ানো বা মামলা সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যাতে জুলাই অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পক্ষে তাদের অন্ধ সমর্থন এবং জনগণের ওপর দমনপীড়নে নীরব সম্মতির ইতিহাস মানুষ ভুলে যায়।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এসে সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজেরা বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে গণমাধ্যমগুলোকে কঠোর নীতি ও দ্বিগুণ যাচাই পদ্ধতি অনুসরণ করতেই হবে।