| বিশ্লেষণ

জ্বালানি তেলে ভর্তুকি নেই দাবি করা প্রতিবেদনটি বিভ্রান্তিকর

১১ অক্টোবর ২০২৬


জ্বালানি তেলে ভর্তুকি নেই দাবি করা প্রতিবেদনটি বিভ্রান্তিকর

২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এ সময় জ্বালানি খাতে সরকারকে দেওয়া ভর্তুকির প্রসঙ্গ এনেছিলেন। জাতীয় অর্থনীতি পত্রিকা আজ “জ্বালানি তেলে কোনো ভর্তুকি নেই, উচ্চহারে শুল্ক নিচ্ছে সরকার” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, সরকার ভর্তুকি কমানোর কথা বলে দাম বাড়িয়েছে, অথচ বর্তমান সরকার জ্বালানি তেলে কোনো ভর্তুকিই দেয়নি; উল্টো উচ্চহারে শুল্ককর আদায় করে যাচ্ছে। বাংলাফ্যাক্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, প্রতিবেদনের “ভর্তুকি নেই” উপসংহার বিভ্রান্তিকর। অধিকাংশ তথ্য সঠিক উৎস থেকে নেওয়া হলেও কয়েকটি সংখ্যা ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যাজ্বালানি বিভাগ নিজেই নিশ্চিত করেছে। ৮ সেপ্টেম্বর বিপিসির চিঠিও পাঠানো হয়েছে।দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ওই চিঠিতে বিপিসি লোকসানের অর্থ ভর্তুকি হিসেবে ফেরত চেয়েছে এবং মার্চ-জুনের জন্য আগে চাওয়া ভর্তুকিও তখন পর্যন্ত ছাড় হয়নি। ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণসহ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আমদানি ব্যয়ে সরিয়ে নেওয়ার তথ্যও একাধিক গণমাধ্যমে এসেছে। 


কোনো ভর্তুকিই দেয়নি- দাবিটি কেন বিভ্রান্তিকর 

প্রতিবেদনটি "ভর্তুকি" বলতে কেবল অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিপিসিকে নগদ অর্থ হস্তান্তর বুঝিয়েছে। এই সংকীর্ণ অর্থেও দাবিটি পুরোপুরি সঠিক নয়।দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার ২৪ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ভর্তুকি অনুমোদন করেছিল। এর মধ্যে ৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছিল জ্বালানি তেল, মূলত বিপিসির ডিজেল আমদানির জন্য। এই বরাদ্দের কতটা শেষ পর্যন্ত ছাড় হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু "কোনো ভর্তুকিই নেই" বলার আগে এই বরাদ্দের উল্লেখ অপরিহার্য ছিল।

বড় সমস্যাটি অবশ্য ধারণাগত। বিপিসি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, এক দশকে বিপিসির মুনাফার ৩৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে গেছে। অর্থাৎ বিপিসির তহবিল কার্যত জনগণের অর্থ। বিশ্ববাজারের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রি করে বিপিসি যখন নিজস্ব সঞ্চয় ভেঙে লোকসান মেটায়, তখন সেটিও রাষ্ট্রের বহন করা ভর্তুকি। শুধু তা বাজেটের ভর্তুকি খাতে না দেখিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্স শিটে চাপানো হয়েছে। অর্থনীতির পরিভাষায় একে "প্রচ্ছন্ন ভর্তুকি" বা আন্ডার-রিকভারি বলা হয়।জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন, মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্তই এই লোকসান ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

অপরিশোধিত তেল নয়, দেখতে হবে ডিজেলের দাম

প্রতিবেদনে বিপিসির চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি। এটি ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম। কিন্তু বাংলাদেশ মূলত পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করে, যার দাম নির্ধারিত হয় সিঙ্গাপুর ডিজেল (গ্যাসঅয়েল) সূচকের ভিত্তিতে। যুদ্ধের সময় এই দুইয়ের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। 

২ জানুয়ারি সিঙ্গাপুর ডিজেল সূচক ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭৮.৫২ ডলার (লিটারপ্রতি প্রায় ৬১ টাকা), আর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার আগের দিন ৮৯.৯৩ ডলার (প্রায় ৭০ টাকা)। যুদ্ধ শুরুর পর ২ মার্চ তা এক লাফে ১০৭ ডলারে (প্রায় ৮৩ টাকা) ওঠে। ১৬ মার্চ ১৭২ ডলার (প্রায় ১৩৩ টাকা), ১ এপ্রিল ২০২ ডলার (প্রায় ১৫৬ টাকা) এবং ৬ এপ্রিল ২৩২ ডলারে (প্রায় ১৭৯ টাকা) পৌঁছায়। যুদ্ধ শুরুর পর সর্বনিম্ন দাম ছিল ২ জুলাই, ১১৪ ডলার (প্রায় ৮৮ টাকা)। এরপর আবার বেড়ে ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭ ডলারে (প্রায় ১৪৫ টাকা) দাঁড়ায়। দাম বাড়ানোর সপ্তাহে সূচক ছিল ১৭৮ থেকে ১৮৩ ডলারের মধ্যে (প্রায় ১৩৮ থেকে ১৪১ টাকা), আর ২৩ সেপ্টেম্বর ১৭৭.৪৬ ডলার (প্রায় ১৩৭ টাকা)। 

এখানে এক ব্যারেলে ১৫৮.৯৯ লিটার এবং ডলারপ্রতি ১২২.৯০ টাকা বিনিময় হার ধরা হয়েছে। বছরজুড়ে বিনিময় হার সামান্য ওঠানামা করায় আগের মাসগুলোর হিসাবে কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে। এই হিসাবে ৬ এপ্রিল জাহাজভাড়া, বিমা ও কর ছাড়াই শুধু ডিজেলের দাম পড়েছে লিটারপ্রতি প্রায় ১৭৯ টাকা। অথচ তখন দেশে ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল ১০০ টাকায়। ১৯ এপ্রিল দাম বাড়ানো হয় ১১৫ টাকায়। ১৫ সেপ্টেম্বর সূচকমূল্যই ছিল লিটারপ্রতি প্রায় ১৪৫ টাকা, যখন খুচরা দাম ছিল ১১৫ টাকা। এই তথ্যের সামনে "সরকার লোকসান করছে না" বা "ভর্তুকির প্রশ্নই নেই" ধরনের ইঙ্গিত টেকে না। এপ্রিলে বিপিসির ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকার মাসিক লোকসান, যা প্রতিবেদনেই উল্লেখ আছে, সূচকের এই শীর্ষ অবস্থানের সঙ্গেই মিলে যায়।

আরও দুটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করা প্রয়োজন। প্রথমত, সূচকমূল্য মূলত ভবিষ্যতে সরবরাহযোগ্য চালানের দাম। হরমুজ প্রণালির বিপর্যয়ে যে চালান আগে ১৬ দিনে আসত, তা এখন ৫৩ দিন পর্যন্ত লাগছে। দ্বিতীয়ত, বিপিসি দরপত্রের মাধ্যমে কেনে, যেখানে সূচকের ওপর প্রিমিয়াম যোগ হয়। ফলে প্রকৃত ক্রয়মূল্য সূচকের চেয়েও বেশি হতে পারে। 

সরকারের ২০৫ টাকার হিসাব কি টেকে?

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আন্তর্জাতিক দাম অনুযায়ী ডিজেলের লিটারপ্রতি মূল্য হওয়া উচিত ২০৫ টাকা। বাংলাফ্যাক্টের হিসাবে সংখ্যাটি বাস্তবসম্মত। বিপিসির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যের পাশাপাশি পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয়ও বিপুল হারে বেড়েছে। আগে যেখানে জাহাজ ভাড়া ছিল ৩ থেকে ৪ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ জাহাজ ভাড়ার ক্ষেত্রেই ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বরের সূচকমূল্য ১৭৭.৪৬ ডলারের সঙ্গে বিপিসি চেয়ারম্যানের উল্লেখ করা ১৫ থেকে ১৭ ডলারের জাহাজভাড়া (গড় ১৬ ডলার) যোগ করলে আমদানিমূল্য দাঁড়ায় লিটারপ্রতি প্রায় ১৫০.৫ টাকা। এর ওপর ৩১.৮৫ শতাংশ কর প্রায় ৪৮ টাকা। সব মিলিয়ে বিতরণ খরচের আগেই প্রায় ১৯৮ টাকা। পরিবেশক কমিশন, বিতরণ পর্যায়ের ভ্যাট ও পরিচালন ব্যয় যোগ হলে ২০৫ টাকা যুক্তিসংগত। 

সরকার যে অঙ্ককে ভর্তুকি বলছে, তার বড় অংশ রাষ্ট্রের এক পকেট থেকে আরেক পকেটে যাওয়া অর্থ। আবার শুল্ককর বাদ দিলেও প্রকৃত ঘাটতি শূন্য নয়। অর্থাৎ, জাতীয় অর্থনীতির এই রিপোর্টের "সরকার কোনো ভর্তুকিই দেয়নি" উপসংহারে পৌঁছানো বিভ্রান্তিকর।





Topics:



‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দের অপব্যাখ্যা করে অনলাইনে প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন আওয়ামীপন্থীরা
৮ অক্টোবর ২০২৬

‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দের অপব্যাখ্যা করে অনলাইনে প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন আওয়ামীপন্থীরা

৩১ বছরের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের নামে প্রচারিত পরজীবী ও বায়োফিল্মের গল্পটি ভুয়া
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৩১ বছরের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের নামে প্রচারিত পরজীবী ও বায়োফিল্মের গল্পটি ভুয়া

মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে কাল্পনিক বয়ান ছড়াচ্ছেন সালাহউদ্দীন শোয়েব চৌধুরী
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে কাল্পনিক বয়ান ছড়াচ্ছেন সালাহউদ্দীন শোয়েব চৌধুরী

নিরঞ্জনকে হত্যার কারণ উদঘাটনের আগেই সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করল ভারতীয় গণমাধ্যম
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিরঞ্জনকে হত্যার কারণ উদঘাটনের আগেই সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করল ভারতীয় গণমাধ্যম



নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের কারণে নয়, গ্রেপ্তারে অবহেলার অভিযোগে এসআই ক্লোজড
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের কারণে নয়, গ্রেপ্তারে অবহেলার অভিযোগে এসআই ক্লোজড

আপনার মতামত দিন

এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?

এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!

0%

0%

আপনার মতামত শেয়ার করুন:

| মন্তব্য সমূহ:

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!



জ্বালানি তেলে ভর্তুকি নেই দাবি করা প্রতিবেদনটি বিভ্রান্তিকর

বিশ্লেষণ

জ্বালানি তেলে ভর্তুকি নেই দাবি করা প্রতিবেদনটি বিভ্রান্তিকর

১১ অক্টোবর ২০২৬

<p>জ্বালানি তেলে ভর্তুকি নেই দাবি করা প্রতিবেদনটি বিভ্রান্তিকর<br /></p>

২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এ সময় জ্বালানি খাতে সরকারকে দেওয়া ভর্তুকির প্রসঙ্গ এনেছিলেন। জাতীয় অর্থনীতি পত্রিকা আজ “জ্বালানি তেলে কোনো ভর্তুকি নেই, উচ্চহারে শুল্ক নিচ্ছে সরকার” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, সরকার ভর্তুকি কমানোর কথা বলে দাম বাড়িয়েছে, অথচ বর্তমান সরকার জ্বালানি তেলে কোনো ভর্তুকিই দেয়নি; উল্টো উচ্চহারে শুল্ককর আদায় করে যাচ্ছে। বাংলাফ্যাক্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, প্রতিবেদনের “ভর্তুকি নেই” উপসংহার বিভ্রান্তিকর। অধিকাংশ তথ্য সঠিক উৎস থেকে নেওয়া হলেও কয়েকটি সংখ্যা ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যাজ্বালানি বিভাগ নিজেই নিশ্চিত করেছে। ৮ সেপ্টেম্বর বিপিসির চিঠিও পাঠানো হয়েছে।দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ওই চিঠিতে বিপিসি লোকসানের অর্থ ভর্তুকি হিসেবে ফেরত চেয়েছে এবং মার্চ-জুনের জন্য আগে চাওয়া ভর্তুকিও তখন পর্যন্ত ছাড় হয়নি। ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণসহ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আমদানি ব্যয়ে সরিয়ে নেওয়ার তথ্যও একাধিক গণমাধ্যমে এসেছে। 


কোনো ভর্তুকিই দেয়নি- দাবিটি কেন বিভ্রান্তিকর 

প্রতিবেদনটি "ভর্তুকি" বলতে কেবল অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিপিসিকে নগদ অর্থ হস্তান্তর বুঝিয়েছে। এই সংকীর্ণ অর্থেও দাবিটি পুরোপুরি সঠিক নয়।দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার ২৪ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ভর্তুকি অনুমোদন করেছিল। এর মধ্যে ৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছিল জ্বালানি তেল, মূলত বিপিসির ডিজেল আমদানির জন্য। এই বরাদ্দের কতটা শেষ পর্যন্ত ছাড় হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু "কোনো ভর্তুকিই নেই" বলার আগে এই বরাদ্দের উল্লেখ অপরিহার্য ছিল।

বড় সমস্যাটি অবশ্য ধারণাগত। বিপিসি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, এক দশকে বিপিসির মুনাফার ৩৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে গেছে। অর্থাৎ বিপিসির তহবিল কার্যত জনগণের অর্থ। বিশ্ববাজারের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রি করে বিপিসি যখন নিজস্ব সঞ্চয় ভেঙে লোকসান মেটায়, তখন সেটিও রাষ্ট্রের বহন করা ভর্তুকি। শুধু তা বাজেটের ভর্তুকি খাতে না দেখিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্স শিটে চাপানো হয়েছে। অর্থনীতির পরিভাষায় একে "প্রচ্ছন্ন ভর্তুকি" বা আন্ডার-রিকভারি বলা হয়।জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন, মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্তই এই লোকসান ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

অপরিশোধিত তেল নয়, দেখতে হবে ডিজেলের দাম

প্রতিবেদনে বিপিসির চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি। এটি ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম। কিন্তু বাংলাদেশ মূলত পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করে, যার দাম নির্ধারিত হয় সিঙ্গাপুর ডিজেল (গ্যাসঅয়েল) সূচকের ভিত্তিতে। যুদ্ধের সময় এই দুইয়ের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। 

২ জানুয়ারি সিঙ্গাপুর ডিজেল সূচক ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭৮.৫২ ডলার (লিটারপ্রতি প্রায় ৬১ টাকা), আর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার আগের দিন ৮৯.৯৩ ডলার (প্রায় ৭০ টাকা)। যুদ্ধ শুরুর পর ২ মার্চ তা এক লাফে ১০৭ ডলারে (প্রায় ৮৩ টাকা) ওঠে। ১৬ মার্চ ১৭২ ডলার (প্রায় ১৩৩ টাকা), ১ এপ্রিল ২০২ ডলার (প্রায় ১৫৬ টাকা) এবং ৬ এপ্রিল ২৩২ ডলারে (প্রায় ১৭৯ টাকা) পৌঁছায়। যুদ্ধ শুরুর পর সর্বনিম্ন দাম ছিল ২ জুলাই, ১১৪ ডলার (প্রায় ৮৮ টাকা)। এরপর আবার বেড়ে ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭ ডলারে (প্রায় ১৪৫ টাকা) দাঁড়ায়। দাম বাড়ানোর সপ্তাহে সূচক ছিল ১৭৮ থেকে ১৮৩ ডলারের মধ্যে (প্রায় ১৩৮ থেকে ১৪১ টাকা), আর ২৩ সেপ্টেম্বর ১৭৭.৪৬ ডলার (প্রায় ১৩৭ টাকা)। 

এখানে এক ব্যারেলে ১৫৮.৯৯ লিটার এবং ডলারপ্রতি ১২২.৯০ টাকা বিনিময় হার ধরা হয়েছে। বছরজুড়ে বিনিময় হার সামান্য ওঠানামা করায় আগের মাসগুলোর হিসাবে কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে। এই হিসাবে ৬ এপ্রিল জাহাজভাড়া, বিমা ও কর ছাড়াই শুধু ডিজেলের দাম পড়েছে লিটারপ্রতি প্রায় ১৭৯ টাকা। অথচ তখন দেশে ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল ১০০ টাকায়। ১৯ এপ্রিল দাম বাড়ানো হয় ১১৫ টাকায়। ১৫ সেপ্টেম্বর সূচকমূল্যই ছিল লিটারপ্রতি প্রায় ১৪৫ টাকা, যখন খুচরা দাম ছিল ১১৫ টাকা। এই তথ্যের সামনে "সরকার লোকসান করছে না" বা "ভর্তুকির প্রশ্নই নেই" ধরনের ইঙ্গিত টেকে না। এপ্রিলে বিপিসির ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকার মাসিক লোকসান, যা প্রতিবেদনেই উল্লেখ আছে, সূচকের এই শীর্ষ অবস্থানের সঙ্গেই মিলে যায়।

আরও দুটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করা প্রয়োজন। প্রথমত, সূচকমূল্য মূলত ভবিষ্যতে সরবরাহযোগ্য চালানের দাম। হরমুজ প্রণালির বিপর্যয়ে যে চালান আগে ১৬ দিনে আসত, তা এখন ৫৩ দিন পর্যন্ত লাগছে। দ্বিতীয়ত, বিপিসি দরপত্রের মাধ্যমে কেনে, যেখানে সূচকের ওপর প্রিমিয়াম যোগ হয়। ফলে প্রকৃত ক্রয়মূল্য সূচকের চেয়েও বেশি হতে পারে। 

সরকারের ২০৫ টাকার হিসাব কি টেকে?

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আন্তর্জাতিক দাম অনুযায়ী ডিজেলের লিটারপ্রতি মূল্য হওয়া উচিত ২০৫ টাকা। বাংলাফ্যাক্টের হিসাবে সংখ্যাটি বাস্তবসম্মত। বিপিসির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যের পাশাপাশি পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয়ও বিপুল হারে বেড়েছে। আগে যেখানে জাহাজ ভাড়া ছিল ৩ থেকে ৪ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ জাহাজ ভাড়ার ক্ষেত্রেই ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বরের সূচকমূল্য ১৭৭.৪৬ ডলারের সঙ্গে বিপিসি চেয়ারম্যানের উল্লেখ করা ১৫ থেকে ১৭ ডলারের জাহাজভাড়া (গড় ১৬ ডলার) যোগ করলে আমদানিমূল্য দাঁড়ায় লিটারপ্রতি প্রায় ১৫০.৫ টাকা। এর ওপর ৩১.৮৫ শতাংশ কর প্রায় ৪৮ টাকা। সব মিলিয়ে বিতরণ খরচের আগেই প্রায় ১৯৮ টাকা। পরিবেশক কমিশন, বিতরণ পর্যায়ের ভ্যাট ও পরিচালন ব্যয় যোগ হলে ২০৫ টাকা যুক্তিসংগত। 

সরকার যে অঙ্ককে ভর্তুকি বলছে, তার বড় অংশ রাষ্ট্রের এক পকেট থেকে আরেক পকেটে যাওয়া অর্থ। আবার শুল্ককর বাদ দিলেও প্রকৃত ঘাটতি শূন্য নয়। অর্থাৎ, জাতীয় অর্থনীতির এই রিপোর্টের "সরকার কোনো ভর্তুকিই দেয়নি" উপসংহারে পৌঁছানো বিভ্রান্তিকর।