| বিশ্লেষণ
গণমাধ্যমে সাকিব ও মাশরাফির ‘ইমেজ ক্লিন’ করার চেষ্টা
১৭ মে ২০২৬
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে অপসারিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান এবং মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল বয়ান তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাফ্যাক্ট একগুচ্ছ সাক্ষাৎকার ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এগুলো মূলত সুপরিকল্পিত জনসংযোগ (PR) ক্যাম্পেইন হিসেবে কাজ করছে, যার উদ্দেশ্য হলো বিতর্কিত রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সমালোচিত এ দুই ক্রিকেটারের পক্ষে একটি ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা।
সাকিব ও মাশরাফির বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এবং সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে তিনটি প্রধান অভিযোগে বিভিন্ন মামলা ও তদন্ত চলমান রয়েছে। এর মধ্যে একটি হত্যা মামলা, একটি শেয়ারবাজারে কারসাজি, জালিয়াতি এবং মানিলন্ডারিংয়ের (অর্থপাচার) মামলা, এবং অপরটি আইএফআইসি ব্যাংকের (IFIC Bank) চেক ডিজঅনারের মামলা। এছাড়াও, সাকিবের বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালান, কাঁকড়া রপ্তানিতে জালিয়াতি এবং নির্বাচনী হলফনামায় সম্পদ গোপনের মতো বেশ কিছু বিষয়ে দুদক প্রাথমিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এবং নড়াইল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজার বিরুদ্ধে ২টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। দুটো মামলাই জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা সংশ্লিষ্ট, এর মধ্যে একটিতে মাশরাফি প্রধান আসামি । এছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে।যেসব পিআর কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে
পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ছাপিয়ে ‘ক্রিকেটার’ ও ‘ব্যক্তি’ ইমেজকে বড় করে দেখানোর জন্য মূলত নিচের কৌশলগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি সাকিবের মামলার বা মাশরাফির বাড়ি পোড়ানোর বিষয়গুলোকে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যাতে তাদের অপরাধমূলক নীরবতা বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার দায়মুক্তি ঘটে।
চরম মানবিক সংকটের বয়ান ও ‘বন্দি জীবন’ চিত্রায়ন: মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে এক প্রকার ‘জেলখানা বা বন্দি’ অবস্থায় দেখানো হচ্ছে। কালবেলার রিপোর্টে দেখা যায়, তার বাবা জানিয়েছেন যে, তিনি এখন আর আগের মতো হাসিখুশি নন এবং ঘরে বন্দি হয়ে থাকেন। বিডি ক্রিকটাইমের রিপোর্টে বলা হয়, সাবেক ক্রিকেটার মাশরাফির জীবনকে ‘পীড়াদায়ক’ ও ‘বন্দি জীবন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া তার পরিবারকে ‘মানবেতর জীবনযাপন’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে তাঁরা কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বলা হয়েছে, মাশরাফি অন্ধকার ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন।
মাশরাফির বাড়ি পোড়ানো ও ‘ট্রমা’কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার: বিডি ক্রিকটাইমের প্রতিবেদনে মাশরাফির নড়াইলের বাড়ি পোড়ানো এবং তাঁর ব্যক্তিগত জিম ভাঙচুরকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। চ্যানেল ২৪-এর প্রতিবেদনে তার বাড়িকে ‘ভুতুড়ে বাড়ি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে তার ১৯ বছরের ক্রিকেটীয় অর্জন ধ্বংস করা হয়েছে। প্রতিবেদনের শুরুতে তাকে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয়। সেখানে বলা হয়, “নড়াইল এক্সপ্রেস বা ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক এমন নানা নামে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয় যাকে, তিনি আর কেউ নন মাশরাফি বিন মর্তুজা। নড়াইল এক্সপ্রেস নামে পরিচিত মাশরাফি বিন মর্তজাকে চিনেন না ভালোবাসেন না এমন মানুষের সংখ্যা কিন্তু একেবারেই কম নয়। কিন্তু এসব কিছুর পরও তার একটি পরিচয় ছাপিয়ে গেল সবচেয়ে বেশি পরিমাণে সেটি হচ্ছে তার রাজনৈতিক পরিচয়। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আক্রোশের শিকার হয়েছেন সেই মাশরাফি বিন মর্তুজাও।“ স্টার নিউজের এক প্রতিবেদনে খালেদ মাহমুদ সুজন মন্তব্য করেন, “ওর সাধারণ জীবনটা তো ফিরিয়ে দেয়া দরকার। ওর তো একটা ফ্যামিলি আছে, ছেলে আছে, মেয়ে আছে, বউ আছে। একটা ট্রমার মধ্যে দিয়ে তো গেছে তাই না? ঘরবাড়ি সব পুড়িয়ে ফেলছে।“ এই রিপোর্টের শুরুতে আবেগী মিউজিক লাগিয়ে বলা হয়েছে, “সেই কবে নিভে গেছে আগুন। পুড়ে গেছে স্বপ্নটা। কয়লা হয়ে অযত্নে পড়ে আছে ঘরের বিছানা। যে ক্যাবিনেটে জমেছিল ১৯ বছরের সকল সাফল্য সেটাও ধ্বংস করেছে কেবা। এখানে বাতাসে এখন হাহাকারের গান। যেন কিংবদন্তি কাঁদে নীরবে হারিয়ে তার শৈশবের উঠান।“
এগুলো জনমনে সহানুভূতি জাগানোর জন্য প্রচার করা হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়।
সাকিবের কাছে এক কোটি টাকা দাবির অভিযোগ ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার: সাকিব আল হাসান প্রথম আলোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেকে সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা (Ahead of my time) হিসেবে দাবি করেছেন, যাতে তার অতীতের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোকে বৈধতা দেওয়া যায়। তিনি আরো অভিযোগ করেন, মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার জন্য এক কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে তার কাছে, যা তাকে আইনের শিকার বা ‘ভিকটিম’ হিসেবে দেখানোর একটি চেষ্টা। এছাড়াও প্রশ্ন করা হয়, “আপনার মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে সাত মাসের রাজনীতিটাই বড় হয়ে গেল এবং এর জন্য আপনি ভুগছেন। এটা কতটা অপ্রত্যাশিত?”
অথচ সাকিব মাত্র ৭ মাস রাজনীতি করেছে, এটা একটি অপতথ্য। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সাকিব আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।
এটিএন নিউজে সাকিবের সাম্প্রতিক সময়ের একটা পডকাস্টের বরাত দিয়ে ‘আগে দেখতাম সবাই আওয়ামী লীগ করে, এখন দেখি কেউ করে না’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন করা হয় যেখানে দেখা যায়, সেই পডকাস্টে সাকিব দাবি করছেন রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিয়ে তিনি কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি এবং উল্টো দাবি করেছেন যে মাগুরাবাসী তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে।
‘ক্রিকেটীয় আবেগ’ ও দেশের মাটিতে অবসরের আকাঙ্ক্ষা: উভয় ক্রিকেটারই তাদের বিদায়ী মুহূর্তকে আবেগী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সাকিব দেশের মাটিতে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলে অবসরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যা তার প্রতি জনগণের সহানুভূতি আদায়ের একটি বড় অস্ত্র। আরেকটি পডকাস্টের বরাত দিয়ে বাংলা ট্রিবিউন একটি প্রতিবেদন করে, যেখানে দেখা যায়, সাকিব দাবি করছেন, ‘‘আমি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও ফরম্যাট থেকেই অবসর নেইনি। এটা প্রথমবার সবাইকে জানাচ্ছি। আমার পরিকল্পনা হচ্ছে দেশে ফিরে একটা পূর্ণাঙ্গ সিরিজ—ওয়ানডে, টেস্ট, টি–টোয়েন্টি খেলে তারপর অবসর নেওয়া। মানে একটা সিরিজের মাধ্যমে সব ফরম্যাট থেকে বিদায় বলতে চাই। সেটা টি–টোয়েন্টি দিয়ে শুরু হতে পারে, এরপর ওয়ানডে–টেস্ট; বা উল্টোও হতে পারে। যেটাই হোক, আমার সমস্যা নেই। শুধু একটা পুরো সিরিজ খেলেই অবসর নিতে চাই।”
অর্থাৎ, বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত এই প্রতিবেদনগুলোতে মাশরাফি ও সাকিবের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাকে আড়াল করে তাদের কেবল ‘জাতীয় সম্পদ’ এবং ‘অসহায় ভিকটিম’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। বাড়ি ভাঙচুর বা মামলার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে সামনে এনে জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের বিতর্কিত অবস্থান ও স্বৈরাচারী শাসনের প্রতি সমর্থনকে জনসাধারণের স্মৃতি থেকে লঘু করে জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও দায় নিয়ে আলোচনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
Topics:
‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দের অপব্যাখ্যা করে অনলাইনে প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন আওয়ামীপন্থীরা
৩১ বছরের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের নামে প্রচারিত পরজীবী ও বায়োফিল্মের গল্পটি ভুয়া
মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে কাল্পনিক বয়ান ছড়াচ্ছেন সালাহউদ্দীন শোয়েব চৌধুরী
নিরঞ্জনকে হত্যার কারণ উদঘাটনের আগেই সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করল ভারতীয় গণমাধ্যম
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের কারণে নয়, গ্রেপ্তারে অবহেলার অভিযোগে এসআই ক্লোজড
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!
0%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
| আরও পড়ুন
‘দরিদ্র বাড়িয়ে বিদায় দারিদ্র্যের জাদুকরের’ শিরোনামে একযোগে ভুল সংবাদ প্রকাশ
সীমান্তের কাল্পনিক চিত্র আর ভুল তথ্য দিয়ে বানানো গেরুয়া-সবুজ ম্যাপ
সীমান্তের কোনোদিকেই কোনও দল একচেটিয়া আসন পায়নি
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ প্রসঙ্গে তারেক রহমানের বক্তব্য বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন
শুধু নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে নয়, বরং অপরাধ করলে পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার কথাও বলেছেন তিনি
From ‘Crime’ to ‘Communal’ Narrative : How Indian Outlets Reframed Violence in Bangladesh
বিশ্লেষণ
গণমাধ্যমে সাকিব ও মাশরাফির ‘ইমেজ ক্লিন’ করার চেষ্টা
১৭ মে ২০২৬
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে অপসারিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান এবং মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল বয়ান তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাফ্যাক্ট একগুচ্ছ সাক্ষাৎকার ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এগুলো মূলত সুপরিকল্পিত জনসংযোগ (PR) ক্যাম্পেইন হিসেবে কাজ করছে, যার উদ্দেশ্য হলো বিতর্কিত রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সমালোচিত এ দুই ক্রিকেটারের পক্ষে একটি ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা।
সাকিব ও মাশরাফির বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এবং সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে তিনটি প্রধান অভিযোগে বিভিন্ন মামলা ও তদন্ত চলমান রয়েছে। এর মধ্যে একটি হত্যা মামলা, একটি শেয়ারবাজারে কারসাজি, জালিয়াতি এবং মানিলন্ডারিংয়ের (অর্থপাচার) মামলা, এবং অপরটি আইএফআইসি ব্যাংকের (IFIC Bank) চেক ডিজঅনারের মামলা। এছাড়াও, সাকিবের বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালান, কাঁকড়া রপ্তানিতে জালিয়াতি এবং নির্বাচনী হলফনামায় সম্পদ গোপনের মতো বেশ কিছু বিষয়ে দুদক প্রাথমিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এবং নড়াইল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজার বিরুদ্ধে ২টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। দুটো মামলাই জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা সংশ্লিষ্ট, এর মধ্যে একটিতে মাশরাফি প্রধান আসামি । এছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে।যেসব পিআর কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে
পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ছাপিয়ে ‘ক্রিকেটার’ ও ‘ব্যক্তি’ ইমেজকে বড় করে দেখানোর জন্য মূলত নিচের কৌশলগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি সাকিবের মামলার বা মাশরাফির বাড়ি পোড়ানোর বিষয়গুলোকে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যাতে তাদের অপরাধমূলক নীরবতা বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার দায়মুক্তি ঘটে।
চরম মানবিক সংকটের বয়ান ও ‘বন্দি জীবন’ চিত্রায়ন: মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে এক প্রকার ‘জেলখানা বা বন্দি’ অবস্থায় দেখানো হচ্ছে। কালবেলার রিপোর্টে দেখা যায়, তার বাবা জানিয়েছেন যে, তিনি এখন আর আগের মতো হাসিখুশি নন এবং ঘরে বন্দি হয়ে থাকেন। বিডি ক্রিকটাইমের রিপোর্টে বলা হয়, সাবেক ক্রিকেটার মাশরাফির জীবনকে ‘পীড়াদায়ক’ ও ‘বন্দি জীবন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া তার পরিবারকে ‘মানবেতর জীবনযাপন’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে তাঁরা কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বলা হয়েছে, মাশরাফি অন্ধকার ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন।
মাশরাফির বাড়ি পোড়ানো ও ‘ট্রমা’কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার: বিডি ক্রিকটাইমের প্রতিবেদনে মাশরাফির নড়াইলের বাড়ি পোড়ানো এবং তাঁর ব্যক্তিগত জিম ভাঙচুরকে অত্যন্ত আবেগপ্রবণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। চ্যানেল ২৪-এর প্রতিবেদনে তার বাড়িকে ‘ভুতুড়ে বাড়ি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে তার ১৯ বছরের ক্রিকেটীয় অর্জন ধ্বংস করা হয়েছে। প্রতিবেদনের শুরুতে তাকে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয়। সেখানে বলা হয়, “নড়াইল এক্সপ্রেস বা ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক এমন নানা নামে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয় যাকে, তিনি আর কেউ নন মাশরাফি বিন মর্তুজা। নড়াইল এক্সপ্রেস নামে পরিচিত মাশরাফি বিন মর্তজাকে চিনেন না ভালোবাসেন না এমন মানুষের সংখ্যা কিন্তু একেবারেই কম নয়। কিন্তু এসব কিছুর পরও তার একটি পরিচয় ছাপিয়ে গেল সবচেয়ে বেশি পরিমাণে সেটি হচ্ছে তার রাজনৈতিক পরিচয়। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আক্রোশের শিকার হয়েছেন সেই মাশরাফি বিন মর্তুজাও।“ স্টার নিউজের এক প্রতিবেদনে খালেদ মাহমুদ সুজন মন্তব্য করেন, “ওর সাধারণ জীবনটা তো ফিরিয়ে দেয়া দরকার। ওর তো একটা ফ্যামিলি আছে, ছেলে আছে, মেয়ে আছে, বউ আছে। একটা ট্রমার মধ্যে দিয়ে তো গেছে তাই না? ঘরবাড়ি সব পুড়িয়ে ফেলছে।“ এই রিপোর্টের শুরুতে আবেগী মিউজিক লাগিয়ে বলা হয়েছে, “সেই কবে নিভে গেছে আগুন। পুড়ে গেছে স্বপ্নটা। কয়লা হয়ে অযত্নে পড়ে আছে ঘরের বিছানা। যে ক্যাবিনেটে জমেছিল ১৯ বছরের সকল সাফল্য সেটাও ধ্বংস করেছে কেবা। এখানে বাতাসে এখন হাহাকারের গান। যেন কিংবদন্তি কাঁদে নীরবে হারিয়ে তার শৈশবের উঠান।“
এগুলো জনমনে সহানুভূতি জাগানোর জন্য প্রচার করা হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়।
সাকিবের কাছে এক কোটি টাকা দাবির অভিযোগ ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার: সাকিব আল হাসান প্রথম আলোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেকে সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা (Ahead of my time) হিসেবে দাবি করেছেন, যাতে তার অতীতের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোকে বৈধতা দেওয়া যায়। তিনি আরো অভিযোগ করেন, মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার জন্য এক কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে তার কাছে, যা তাকে আইনের শিকার বা ‘ভিকটিম’ হিসেবে দেখানোর একটি চেষ্টা। এছাড়াও প্রশ্ন করা হয়, “আপনার মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে সাত মাসের রাজনীতিটাই বড় হয়ে গেল এবং এর জন্য আপনি ভুগছেন। এটা কতটা অপ্রত্যাশিত?”
অথচ সাকিব মাত্র ৭ মাস রাজনীতি করেছে, এটা একটি অপতথ্য। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সাকিব আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।
এটিএন নিউজে সাকিবের সাম্প্রতিক সময়ের একটা পডকাস্টের বরাত দিয়ে ‘আগে দেখতাম সবাই আওয়ামী লীগ করে, এখন দেখি কেউ করে না’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন করা হয় যেখানে দেখা যায়, সেই পডকাস্টে সাকিব দাবি করছেন রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিয়ে তিনি কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি এবং উল্টো দাবি করেছেন যে মাগুরাবাসী তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে।
‘ক্রিকেটীয় আবেগ’ ও দেশের মাটিতে অবসরের আকাঙ্ক্ষা: উভয় ক্রিকেটারই তাদের বিদায়ী মুহূর্তকে আবেগী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সাকিব দেশের মাটিতে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলে অবসরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যা তার প্রতি জনগণের সহানুভূতি আদায়ের একটি বড় অস্ত্র। আরেকটি পডকাস্টের বরাত দিয়ে বাংলা ট্রিবিউন একটি প্রতিবেদন করে, যেখানে দেখা যায়, সাকিব দাবি করছেন, ‘‘আমি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও ফরম্যাট থেকেই অবসর নেইনি। এটা প্রথমবার সবাইকে জানাচ্ছি। আমার পরিকল্পনা হচ্ছে দেশে ফিরে একটা পূর্ণাঙ্গ সিরিজ—ওয়ানডে, টেস্ট, টি–টোয়েন্টি খেলে তারপর অবসর নেওয়া। মানে একটা সিরিজের মাধ্যমে সব ফরম্যাট থেকে বিদায় বলতে চাই। সেটা টি–টোয়েন্টি দিয়ে শুরু হতে পারে, এরপর ওয়ানডে–টেস্ট; বা উল্টোও হতে পারে। যেটাই হোক, আমার সমস্যা নেই। শুধু একটা পুরো সিরিজ খেলেই অবসর নিতে চাই।”
অর্থাৎ, বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত এই প্রতিবেদনগুলোতে মাশরাফি ও সাকিবের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাকে আড়াল করে তাদের কেবল ‘জাতীয় সম্পদ’ এবং ‘অসহায় ভিকটিম’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। বাড়ি ভাঙচুর বা মামলার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে সামনে এনে জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের বিতর্কিত অবস্থান ও স্বৈরাচারী শাসনের প্রতি সমর্থনকে জনসাধারণের স্মৃতি থেকে লঘু করে জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও দায় নিয়ে আলোচনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।