| বিশ্লেষণ

'ক্রাইসিসের কারিগর’ 

হাসিনাকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞ বলে মন্তব্য আনিস আলমগীরের

২০ মে ২০২৬


'ক্রাইসিসের কারিগর’ 


হাসিনাকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞ বলে মন্তব্য আনিস আলমগীরের
বিভ্রান্তিকর

ছাত্র-জনতার এক রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের ফলে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনাকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞ বলে মন্তব্য করেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর৷ অনলাইন প্লাটফরম চরচা’র এক টকশোতে এমন মন্তব্য করেন তিনি ৷ টকশোর একটি ক্লিপ গত ১৮ মে চরচা'র ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়৷ সেখানে তিনি বলছেন, ‘আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি সমস্যা কীভাবে রোধ করবেন সেটা শেখ হাসিনা কতগুলো উ ইয়ে ইয়া ইয়ে তৈরি করে দিয়ে গেছিল জ্বালানি সংকট নিরসনের জন্য।...  শেখ হাসিনার ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতা আপনাদের নাই।’

২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে কার্যকর কোন সমাধান না করে আইন শৃংখলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা করলে সেটা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারেনি হাসিনা। 

বাংলাফ্যাক্টের বিশ্লেষণে দেখা যায়, টকশোতে দেওয়া আনিস আলমগীরের বক্তব্যে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনাকে অভিজ্ঞ বলা হলেও বাস্তবে ঋণনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও আমদানি নির্ভর জ্বালানি নির্ভর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেয়৷ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে জবাবদিহিতা না করতে বিচার চাওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দেয় হাসিনা। ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ভাড়ার পরিমাণ এক লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।  ১৫ বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ১৪ বার। 

রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্রের জন্য ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন,  মাতারবাড়ি প্রকল্পের জন্য চার দশমিক চার বিলিয়ন, পায়রার জন্য ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বৈদিশিক ঋণ নেয় হাসিনা সরকার৷ এ ঋণের বোঝা জনগণকে বহন করতে হয়েছে বাংলাদেশের জনগণকে। জ্বা লানিখাতে ভয়াবহ সংকটের কারণে লোডশেডিংসহ শিল্পকারখানার বেশ ক্ষতির ঘটনা গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রতিবেদন এসেছে৷ 


প্রধান বৈদেশিক ঋণে অর্থায়িত জ্বালানি প্রকল্প

প্রকল্প

বৈদেশিক ঋণ (বিলিয়ন ডলার)

অর্থায়নকারী

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

১১.৩৮

রাশিয়া (রোসাটম)

মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র

৪.৪০

জাপান (JICA)

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র

১.৯৮

চীন

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র

১.৬০

ভারত (EXIM Bank)

সূত্র: সরকারি নথি ও গণমাধ্যম অনুসন্ধান



বৈদেশিক ঋণ: ২৪ থেকে ১০০ বিলিয়নের যাত্রা

বণিকবার্তার ২০২৩ সালের নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুসারে, হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪.২১ বিলিয়ন ডলার। দেড় দশকের শাসন শেষে তা ছাড়িয়ে যায় ১০০ বিলিয়ন ডলার । জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের একাধিক মেগাপ্রকল্পে নেওয়া ঋণ এই বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ। এই ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের দায় জনগণ ও সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।


রোহিঙ্গা সংকট

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরুর পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়৷ আশ্রয় দেওয়ার ফলে হাসিনা প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু প্রায় আট বছর ক্ষমতায় থেকেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপরে চলা হামলা-নির্যাতন বন্ধে তেমন কোনো দৃশ্যমান সফলতা নেই তাঁর। 


বিডিআর বিদ্রোহ

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ঢাকার পিলখানায় তৎকালীন বিডিআরদের বিদ্রোহের ফলে বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন অন্যান্য সেনা কর্মকর্তা ও ১৭ জন বেসামরিক লোক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এ নিয়ে যে তদন্ত ও বিচার কাজ চলেছে, তা নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে থেকেছে এবং ভুক্তভোগীদের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। ফলে ২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন করে তদন্ত শুরু করতে হয়েছে। তদন্ত কাজ প্রবলভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিচারকাজ পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে অভিযোগ রয়েছে। তাই বিচার নিয়ে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার ও জনমনে ব্যাপক সন্দেহ ছিল শুরু থেকে। তাছাড়া বিদ্রোহ দমনে কেন দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বা ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ কি, সে প্রশ্ন থেকে গিয়েছে। ঘটনার পেছনে দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা সংস্থার সম্পৃক্ততা কখনো সেভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি বলেও ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষথেকে জোর অভিযোগ ছিল। সুতরাং বিডিআর হত্যাকাণ্ডের কোনো কার্যকর সুরাহা করতে পারেননি শেখ হাসিনা।


ব্যাংক খাতে ৬ লাখ কোটির অনাদায়ী ঋণ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকাশিত শ্বেতপত্র (নভেম্বর ২০২৪) অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭৫ হাজার ৩০ কোটি টাকায়। এই অর্থ দিয়ে নির্মাণ করা যেত ১৩টি মেট্রোরেল বা ২২টি পদ্মা সেতু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে নেওয়া ঋণ আর ফেরত না আসায় ব্যাংক খাত এখন কার্যত একটি দেউলিয়া ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।


খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি বনাম FAO-র তথ্য

হাসিনা সরকার বারবার বাংলাদেশকে 'খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ' দাবি করে আসছিল। কিন্তু জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) ২০২২ সালের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা।বাংলাদেশকে বছরে এক কোটি টনেরও বেশি খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন। জ্বালানি থেকে খাদ্য প্রতিটি খাতেই তথ্য লুকিয়ে বানোয়াট পরিসংখ্যান প্রচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


বিশ্লেষণ

সংকট তৈরি করা আর সংকট সামলানো এই দুটি ভিন্ন দক্ষতা। হাসিনা সরকার যদি সত্যিই ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে দক্ষ হতেন, তাহলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে কার্যকর কোন সমাধান  করতে পারতো, ১৫ বছরে বিদ্যুতের দাম ১৪ বার বাড়াতে হতো না, ব্যাংক খাতে ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ জমতো না এবং বৈদেশিক ঋণ চারগুণেরও বেশি বেড়ে ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াত না, বিডিআর বিদ্রোহ হতো না, রোহিঙ্গা সংকর জারি থাকত না। তথ্য-উপাত্তের আলোয় বরং এটাই স্পষ্ট হয় যে হাসিনা সরকার সংকট ব্যবস্থাপনাকারী নয়, বরং সংকটের কারিগর।

 

তথ্যসূত্র

১. বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন (২০১০), ধারা ৯ ও ১০

২. 'বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভাড়া ১ লাখ কোটি টাকা, কারা কত পেল' — প্রথম আলো, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

৩. 'আওয়ামী লীগের দেড় দশকে বিদ্যুতের দাম ১৮৮%' — বণিকবার্তা, ১৮ আগস্ট ২০২৪

৪. 'ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে শিল্প উৎপাদনে ধস' — সমকাল, ৬ জুন ২০২৩

৫. '১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছল বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ' — বণিকবার্তা, ২২ নভেম্বর ২০২৩

৬. White Paper on State of the Bangladesh Economy — White Paper Committee, November 2024

৭. Crop Prospects and Food Situation – Quarterly Global Report No. 3 — FAO, September 2022

৮. Bangladesh to investigate 2009 paramilitary mutiny massacre <https://www.aljazeera.com/news/2024/12/26/bangladesh-to-investigate-2009-paramilitary-mutiny-massacre>





Topics:



‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দের অপব্যাখ্যা করে অনলাইনে প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন আওয়ামীপন্থীরা
৮ অক্টোবর ২০২৬

‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দের অপব্যাখ্যা করে অনলাইনে প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন আওয়ামীপন্থীরা

৩১ বছরের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের নামে প্রচারিত পরজীবী ও বায়োফিল্মের গল্পটি ভুয়া
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৩১ বছরের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের নামে প্রচারিত পরজীবী ও বায়োফিল্মের গল্পটি ভুয়া

মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে কাল্পনিক বয়ান ছড়াচ্ছেন সালাহউদ্দীন শোয়েব চৌধুরী
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে কাল্পনিক বয়ান ছড়াচ্ছেন সালাহউদ্দীন শোয়েব চৌধুরী

নিরঞ্জনকে হত্যার কারণ উদঘাটনের আগেই সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করল ভারতীয় গণমাধ্যম
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিরঞ্জনকে হত্যার কারণ উদঘাটনের আগেই সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করল ভারতীয় গণমাধ্যম



নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের কারণে নয়, গ্রেপ্তারে অবহেলার অভিযোগে এসআই ক্লোজড
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের কারণে নয়, গ্রেপ্তারে অবহেলার অভিযোগে এসআই ক্লোজড

আপনার মতামত দিন

এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?

এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!

0%

0%

আপনার মতামত শেয়ার করুন:

| মন্তব্য সমূহ:

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!



'ক্রাইসিসের কারিগর’&nbsp;


হাসিনাকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞ বলে মন্তব্য আনিস আলমগীরের

বিশ্লেষণ

'ক্রাইসিসের কারিগর’ 

হাসিনাকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞ বলে মন্তব্য আনিস আলমগীরের

২০ মে ২০২৬

<p><span style="color: red;">'ক্রাইসিসের কারিগর’&nbsp;</span></p>


<p><span style="font-family: Arial, sans-serif; font-size: 24px; white-space: pre-wrap; text-align: justify;">হাসিনাকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞ বলে মন্তব্য আনিস আলমগীরের</span></p>

ছাত্র-জনতার এক রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের ফলে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনাকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞ বলে মন্তব্য করেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর৷ অনলাইন প্লাটফরম চরচা’র এক টকশোতে এমন মন্তব্য করেন তিনি ৷ টকশোর একটি ক্লিপ গত ১৮ মে চরচা'র ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়৷ সেখানে তিনি বলছেন, ‘আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি সমস্যা কীভাবে রোধ করবেন সেটা শেখ হাসিনা কতগুলো উ ইয়ে ইয়া ইয়ে তৈরি করে দিয়ে গেছিল জ্বালানি সংকট নিরসনের জন্য।...  শেখ হাসিনার ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতা আপনাদের নাই।’

২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে কার্যকর কোন সমাধান না করে আইন শৃংখলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা করলে সেটা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারেনি হাসিনা। 

বাংলাফ্যাক্টের বিশ্লেষণে দেখা যায়, টকশোতে দেওয়া আনিস আলমগীরের বক্তব্যে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনাকে অভিজ্ঞ বলা হলেও বাস্তবে ঋণনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও আমদানি নির্ভর জ্বালানি নির্ভর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেয়৷ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে জবাবদিহিতা না করতে বিচার চাওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দেয় হাসিনা। ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ভাড়ার পরিমাণ এক লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।  ১৫ বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ১৪ বার। 

রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্রের জন্য ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন,  মাতারবাড়ি প্রকল্পের জন্য চার দশমিক চার বিলিয়ন, পায়রার জন্য ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বৈদিশিক ঋণ নেয় হাসিনা সরকার৷ এ ঋণের বোঝা জনগণকে বহন করতে হয়েছে বাংলাদেশের জনগণকে। জ্বা লানিখাতে ভয়াবহ সংকটের কারণে লোডশেডিংসহ শিল্পকারখানার বেশ ক্ষতির ঘটনা গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রতিবেদন এসেছে৷ 


প্রধান বৈদেশিক ঋণে অর্থায়িত জ্বালানি প্রকল্প

প্রকল্প

বৈদেশিক ঋণ (বিলিয়ন ডলার)

অর্থায়নকারী

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

১১.৩৮

রাশিয়া (রোসাটম)

মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র

৪.৪০

জাপান (JICA)

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র

১.৯৮

চীন

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র

১.৬০

ভারত (EXIM Bank)

সূত্র: সরকারি নথি ও গণমাধ্যম অনুসন্ধান



বৈদেশিক ঋণ: ২৪ থেকে ১০০ বিলিয়নের যাত্রা

বণিকবার্তার ২০২৩ সালের নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুসারে, হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪.২১ বিলিয়ন ডলার। দেড় দশকের শাসন শেষে তা ছাড়িয়ে যায় ১০০ বিলিয়ন ডলার । জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের একাধিক মেগাপ্রকল্পে নেওয়া ঋণ এই বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ। এই ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের দায় জনগণ ও সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।


রোহিঙ্গা সংকট

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরুর পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়৷ আশ্রয় দেওয়ার ফলে হাসিনা প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু প্রায় আট বছর ক্ষমতায় থেকেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপরে চলা হামলা-নির্যাতন বন্ধে তেমন কোনো দৃশ্যমান সফলতা নেই তাঁর। 


বিডিআর বিদ্রোহ

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ঢাকার পিলখানায় তৎকালীন বিডিআরদের বিদ্রোহের ফলে বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন অন্যান্য সেনা কর্মকর্তা ও ১৭ জন বেসামরিক লোক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এ নিয়ে যে তদন্ত ও বিচার কাজ চলেছে, তা নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে থেকেছে এবং ভুক্তভোগীদের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। ফলে ২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন করে তদন্ত শুরু করতে হয়েছে। তদন্ত কাজ প্রবলভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিচারকাজ পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে অভিযোগ রয়েছে। তাই বিচার নিয়ে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার ও জনমনে ব্যাপক সন্দেহ ছিল শুরু থেকে। তাছাড়া বিদ্রোহ দমনে কেন দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বা ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ কি, সে প্রশ্ন থেকে গিয়েছে। ঘটনার পেছনে দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা সংস্থার সম্পৃক্ততা কখনো সেভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি বলেও ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষথেকে জোর অভিযোগ ছিল। সুতরাং বিডিআর হত্যাকাণ্ডের কোনো কার্যকর সুরাহা করতে পারেননি শেখ হাসিনা।


ব্যাংক খাতে ৬ লাখ কোটির অনাদায়ী ঋণ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকাশিত শ্বেতপত্র (নভেম্বর ২০২৪) অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭৫ হাজার ৩০ কোটি টাকায়। এই অর্থ দিয়ে নির্মাণ করা যেত ১৩টি মেট্রোরেল বা ২২টি পদ্মা সেতু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে নেওয়া ঋণ আর ফেরত না আসায় ব্যাংক খাত এখন কার্যত একটি দেউলিয়া ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।


খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি বনাম FAO-র তথ্য

হাসিনা সরকার বারবার বাংলাদেশকে 'খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ' দাবি করে আসছিল। কিন্তু জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) ২০২২ সালের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা।বাংলাদেশকে বছরে এক কোটি টনেরও বেশি খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন। জ্বালানি থেকে খাদ্য প্রতিটি খাতেই তথ্য লুকিয়ে বানোয়াট পরিসংখ্যান প্রচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


বিশ্লেষণ

সংকট তৈরি করা আর সংকট সামলানো এই দুটি ভিন্ন দক্ষতা। হাসিনা সরকার যদি সত্যিই ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে দক্ষ হতেন, তাহলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে কার্যকর কোন সমাধান  করতে পারতো, ১৫ বছরে বিদ্যুতের দাম ১৪ বার বাড়াতে হতো না, ব্যাংক খাতে ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ জমতো না এবং বৈদেশিক ঋণ চারগুণেরও বেশি বেড়ে ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াত না, বিডিআর বিদ্রোহ হতো না, রোহিঙ্গা সংকর জারি থাকত না। তথ্য-উপাত্তের আলোয় বরং এটাই স্পষ্ট হয় যে হাসিনা সরকার সংকট ব্যবস্থাপনাকারী নয়, বরং সংকটের কারিগর।

 

তথ্যসূত্র

১. বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন (২০১০), ধারা ৯ ও ১০

২. 'বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভাড়া ১ লাখ কোটি টাকা, কারা কত পেল' — প্রথম আলো, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

৩. 'আওয়ামী লীগের দেড় দশকে বিদ্যুতের দাম ১৮৮%' — বণিকবার্তা, ১৮ আগস্ট ২০২৪

৪. 'ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে শিল্প উৎপাদনে ধস' — সমকাল, ৬ জুন ২০২৩

৫. '১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছল বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ' — বণিকবার্তা, ২২ নভেম্বর ২০২৩

৬. White Paper on State of the Bangladesh Economy — White Paper Committee, November 2024

৭. Crop Prospects and Food Situation – Quarterly Global Report No. 3 — FAO, September 2022

৮. Bangladesh to investigate 2009 paramilitary mutiny massacre <https://www.aljazeera.com/news/2024/12/26/bangladesh-to-investigate-2009-paramilitary-mutiny-massacre>