| বিশ্লেষণ
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা কমেছে ১০ শতাংশ, বেড়েছে ব্যাংকিং আমানত
২০ জুন ২০২৬
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের ৯৮.৬ শতাংশই বাংলাদেশি বিভিন্ন ব্যাংকের। ব্যক্তিপর্যায়ের গ্রাহকদের আমানত বরং ১০ শতাংশ কমেছে। অথচ ২০ জুন অদিতি করিম নামের একজন লেখকের স্বাক্ষরে একটি অভিন্ন মতামত কলাম একযোগে বসুন্ধরা গ্রুপের চারটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। ডেইলি সানে ইংরেজি কলাম, আর কালের কণ্ঠ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনে বাংলা কলাম। কলামটির শিরোনাম হলো ‘অর্থ পাচারেও চ্যাম্পিয়ন ইউনূস সরকার!’
বাংলাফ্যাক্ট এই কলামের দাবিগুলো যাচাই করে দেখেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে কলামটিতে একাধিক তথ্যগত ভুল, পরিসংখ্যানের বিভ্রান্তিকর ব্যবহার এবং লজিক্যাল ফ্যালাসি রয়েছে। পাশাপাশি, একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ বক্তব্যকে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
দাবি ১: ‘সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৪১ শতাংশ বাড়াটা ইউনূস সরকারের আমলে লুটপাটের প্রমাণ’
এসএনবির নিজস্ব তথ্যেই এই দাবির খণ্ডন রয়েছে। কলামটি যে পরিসংখ্যান উল্লেখ করেছে, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি — যা কলামে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট আমানতের ৯৮.৬ শতাংশই বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত।
২০২৪ সালের ১ কোটি ২৬ লাখ থেকে ২০২৫ সালে ১ কোটি ১৪ লাখ সুইস ফ্রাঁতে নেমে এসেছে। এই সংবাদ পরিবেশনের সময় অন্যান্য মিডিয়া হাউজ এই তথ্যটি উল্লেখ করেছে। যেমন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের বরাতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সংবাদে উল্লেখ করেছে, এই তহবিল সম্পূর্ণ নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ। ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষ্পত্তি এবং ভালো রিটার্নের সন্ধানে বিভিন্ন দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তহবিল রাখে।
অথচ অদিতি করিমের কলামটি এই ৯৮.৬ শতাংশের তথ্যটি সচেতনভাবে উল্লেখ করেনি।
দাবি ২: ‘গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে’
কলামটিতে দাবি করা হয়েছে, "অতীতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে যে পরিমাণ অর্থ বৃদ্ধি পায়, তার অন্তত ১০ গুণ অর্থ" মূল পাচারের গন্তব্যগুলোতে যায়। এই "১০ গুণ" হিসাব প্রয়োগ করে লেখক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে গত এক বছরে ২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
এটি একটি মৌলিক পরিসংখ্যানগত ভুল।
প্রথমত, ১০ গুণ গুণকটি কোনো সুনির্দিষ্ট গবেষণাপত্রের রেফারেন্স ছাড়া উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কোথা থেকে এলো, কোন বছরের তথ্যের ভিত্তিতে, কে হিসাব করেছে কলামে কিছুই বলা নেই।
দ্বিতীয়ত, এসএনবির সুইস ব্যাংক ডেটা এবং গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) বা অনুরূপ সংস্থার ইলিসিট ফ্লো অনুমানের মধ্যে সম্পর্কটি কখনো এতটা সরল নয়। জিএফআই-এর পদ্ধতি ট্রেড মিসইনভয়েসিং এবং ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বিশ্লেষণের উপর নির্ভরশীল। সুইস ডিপোজিট বৃদ্ধির সঙ্গে এটির কোনো নির্ধারিত গাণিতিক অনুপাত নেই।
তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ২০২৪-২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের আমানত বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি যদি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং হয়, তাহলে সেই বৃদ্ধি থেকে ব্যক্তিগত অর্থ পাচার অনুমান করাটা পদ্ধতিগতভাবে অসম্ভব।
অর্থাৎ একটি ভুল ভিত্তির উপর একটি অজানা গুণক প্রয়োগ করে কল্পিত সংখ্যায় পৌঁছানো হয়েছে।
দাবি ৩: ‘ইউনূস আমলে আওয়ামী লীগের গড় বার্ষিক পাচারের চেয়ে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি পাচার হয়েছে’
কলামটি শ্বেতপত্র কমিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ২০০৯-২০২৩ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা বার্ষিক গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এরপর দাবি করা হয়েছে, ইউনূস আমলে এর চেয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি পাচার হয়েছে।
এই তুলনায় দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতির সংখ্যাকে একই স্তরে রাখা হয়েছে।
শ্বেতপত্র কমিটির ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের হিসাব একটি ফরেনসিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার ফল যেখানে ট্রেড ডেটা, ব্যালেন্স অব পেমেন্ট, হুন্ডি চ্যানেল, এফডিআই মিথ্যা ঘোষণাসহ বহুমুখী তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে "ইউনূস আমলে ২ লাখ কোটি টাকা পাচার" একটি সম্পূর্ণ অনুমানভিত্তিক সংখ্যা, যা একটি ভুল পদ্ধতিতে বের করা হয়েছে।
দাবি ৪: ‘আহসান এইচ মনসুর দুবাইতে মেয়ের নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন, এটি অর্থ পাচারের মাধ্যমে কেনা হয়েছে’
কলামটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দুবাইতে মেয়ের নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট যে অর্থ পাচারের মাধ্যমে কেনা হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু "অনুমেয়" এবং "প্রমাণিত" এক কথা নয়। যে ফ্ল্যাটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা নিয়ে অভিযোগ থাকলেও কোনো বিচারিক বা তদন্তমূলক প্রক্রিয়ায় এটি প্রমাণিত হয়নি। কলামে এই অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
দাবি ৫: ‘আসিফ নজরুল এবং আসিফ মাহমুদ কেন সুইজারল্যান্ড সফর করেছিলেন সে প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে’
সুইজারল্যান্ড সফর এবং সুইস ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। জেনেভায় জাতিসংঘের অফিস রয়েছে, দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম হয়, বাসেলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থাগুলোর বৈঠক হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা সেখানে গিয়েছিলেন মানেই অর্থ পাচার করেছেন এই যুক্তি কোনো সম্পাদকীয় মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়।
সংঘবদ্ধ প্রকাশনাটি কাকতাল নাকি পরিকল্পনা?
বাংলাফ্যাক্ট লক্ষ করেছে, ২০ জুন একই দিনে চারটি পত্রিকায় অভিন্ন কলাম প্রকাশিত হয়েছে। কালের কণ্ঠের অনলাইন সংস্করণে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে: "সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।" অর্থাৎ মূল লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত হয়েছে, এবং সেখান থেকে অন্তত দুটি বসুন্ধরা গ্রুপের অন্য মাধ্যমে সিন্ডিকেট করা হয়েছে। কালের কন্ঠ এমনকি একটি ফটোকার্ডও প্রকাশ করেছে যার শিরনাম ‘অর্থপাচারেও চ্যাম্পিয়ন ইউনূস সরকার।’
একই দিনে একই অপতথ্যপূর্ণ কলাম একযোগে গ্রুপের মালিকানাধীন একাধিক মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়াটি সাংবাদিকতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি সমন্বিত ন্যারেটিভ ক্যাম্পেইনের বৈশিষ্ট্য বহন করে।
এসএনবির ডেটা আসলে কী বলে এবং কী বলে না
এসএনবির বার্ষিক পরিসংখ্যান সুইজারল্যান্ডের স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট করা তথ্যের সংকলন। এই ডেটা থেকে যা বোঝা যায় বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ২০২৪-২৫ সালে সুইজারল্যান্ডে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আমানত বাড়িয়েছে। এই ডেটা থেকে বোঝা যায় না কেন বেড়েছে, এতে অবৈধ অর্থ আছে কিনা, এটি কোনো সরকারের কারণে হয়েছে কিনা।
এসএনবির ডেটায় শেল কোম্পানি, ট্রাস্ট বা অপ্রকাশিত কাঠামোর মাধ্যমে রাখা অর্থের কোনো হিসাব থাকে না। যা এলসি জালিয়াতি, ওভার বা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিং (টিবিএমএল) এর মত প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলেও ঘটতে পারে। কিন্তু সেটি প্রমাণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নস্ট্রো অ্যাকাউন্টের অডিট ট্রেইল এবং এলসি ডকুমেন্টেশন প্রয়োজন। শুধু এসএনবির মোট সংখ্যা দিয়ে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির তথ্যটি সত্য। কিন্তু অদিতি করিমের লেখা এবং বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়াগুলোয় একযোগে প্রকাশিত কলামটি এই সত্য তথ্যকে একটি রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ডেটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ যে ৯৮.৬ শতাংশই ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক আমানত, এই তথ্যটিই সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। একটি অপ্রমাণিত গুণক ব্যবহার করে কাল্পনিক পাচারের সংখ্যা তৈরি করা হয়েছে। এবং সেই সংখ্যাকে একটি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।
এই কলামের লেখক অদিতি করিম সম্পর্কে একটি প্রাসঙ্গিক তথ্য উল্লেখ না করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থাকে। গত ডিসেম্বর ২০২৪-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে অদিতি করিমের ব্র্যাক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়। অ্যাকাউন্টে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৯ কোটি টাকা, পেশায় লেখা ছিল গৃহিণী। পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ দায়ের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ওই জব্দাদেশ অবৈধ ঘোষণা করে, তবে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের আপিলের কারণে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ হাইকোর্টের রায় স্থগিত রাখেন। ফলে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত অ্যাকাউন্টটি কার্যত জব্দ অবস্থায় রয়েছে।
Topics:
কালের কণ্ঠ গণমাধ্যম বাংলাদেশ প্রতিদিন
‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দের অপব্যাখ্যা করে অনলাইনে প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন আওয়ামীপন্থীরা
৩১ বছরের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের নামে প্রচারিত পরজীবী ও বায়োফিল্মের গল্পটি ভুয়া
মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে কাল্পনিক বয়ান ছড়াচ্ছেন সালাহউদ্দীন শোয়েব চৌধুরী
নিরঞ্জনকে হত্যার কারণ উদঘাটনের আগেই সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করল ভারতীয় গণমাধ্যম
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের কারণে নয়, গ্রেপ্তারে অবহেলার অভিযোগে এসআই ক্লোজড
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
100%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
বিশ্লেষণ
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা কমেছে ১০ শতাংশ, বেড়েছে ব্যাংকিং আমানত
২০ জুন ২০২৬
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের ৯৮.৬ শতাংশই বাংলাদেশি বিভিন্ন ব্যাংকের। ব্যক্তিপর্যায়ের গ্রাহকদের আমানত বরং ১০ শতাংশ কমেছে। অথচ ২০ জুন অদিতি করিম নামের একজন লেখকের স্বাক্ষরে একটি অভিন্ন মতামত কলাম একযোগে বসুন্ধরা গ্রুপের চারটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় বাংলা ও ইংরেজিতে। ডেইলি সানে ইংরেজি কলাম, আর কালের কণ্ঠ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনে বাংলা কলাম। কলামটির শিরোনাম হলো ‘অর্থ পাচারেও চ্যাম্পিয়ন ইউনূস সরকার!’
বাংলাফ্যাক্ট এই কলামের দাবিগুলো যাচাই করে দেখেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে কলামটিতে একাধিক তথ্যগত ভুল, পরিসংখ্যানের বিভ্রান্তিকর ব্যবহার এবং লজিক্যাল ফ্যালাসি রয়েছে। পাশাপাশি, একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ বক্তব্যকে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
দাবি ১: ‘সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৪১ শতাংশ বাড়াটা ইউনূস সরকারের আমলে লুটপাটের প্রমাণ’
এসএনবির নিজস্ব তথ্যেই এই দাবির খণ্ডন রয়েছে। কলামটি যে পরিসংখ্যান উল্লেখ করেছে, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি — যা কলামে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট আমানতের ৯৮.৬ শতাংশই বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত।
২০২৪ সালের ১ কোটি ২৬ লাখ থেকে ২০২৫ সালে ১ কোটি ১৪ লাখ সুইস ফ্রাঁতে নেমে এসেছে। এই সংবাদ পরিবেশনের সময় অন্যান্য মিডিয়া হাউজ এই তথ্যটি উল্লেখ করেছে। যেমন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের বরাতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সংবাদে উল্লেখ করেছে, এই তহবিল সম্পূর্ণ নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ। ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষ্পত্তি এবং ভালো রিটার্নের সন্ধানে বিভিন্ন দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তহবিল রাখে।
অথচ অদিতি করিমের কলামটি এই ৯৮.৬ শতাংশের তথ্যটি সচেতনভাবে উল্লেখ করেনি।
দাবি ২: ‘গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে’
কলামটিতে দাবি করা হয়েছে, "অতীতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে যে পরিমাণ অর্থ বৃদ্ধি পায়, তার অন্তত ১০ গুণ অর্থ" মূল পাচারের গন্তব্যগুলোতে যায়। এই "১০ গুণ" হিসাব প্রয়োগ করে লেখক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে গত এক বছরে ২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
এটি একটি মৌলিক পরিসংখ্যানগত ভুল।
প্রথমত, ১০ গুণ গুণকটি কোনো সুনির্দিষ্ট গবেষণাপত্রের রেফারেন্স ছাড়া উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কোথা থেকে এলো, কোন বছরের তথ্যের ভিত্তিতে, কে হিসাব করেছে কলামে কিছুই বলা নেই।
দ্বিতীয়ত, এসএনবির সুইস ব্যাংক ডেটা এবং গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) বা অনুরূপ সংস্থার ইলিসিট ফ্লো অনুমানের মধ্যে সম্পর্কটি কখনো এতটা সরল নয়। জিএফআই-এর পদ্ধতি ট্রেড মিসইনভয়েসিং এবং ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বিশ্লেষণের উপর নির্ভরশীল। সুইস ডিপোজিট বৃদ্ধির সঙ্গে এটির কোনো নির্ধারিত গাণিতিক অনুপাত নেই।
তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ২০২৪-২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের আমানত বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি যদি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং হয়, তাহলে সেই বৃদ্ধি থেকে ব্যক্তিগত অর্থ পাচার অনুমান করাটা পদ্ধতিগতভাবে অসম্ভব।
অর্থাৎ একটি ভুল ভিত্তির উপর একটি অজানা গুণক প্রয়োগ করে কল্পিত সংখ্যায় পৌঁছানো হয়েছে।
দাবি ৩: ‘ইউনূস আমলে আওয়ামী লীগের গড় বার্ষিক পাচারের চেয়ে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি পাচার হয়েছে’
কলামটি শ্বেতপত্র কমিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ২০০৯-২০২৩ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা বার্ষিক গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এরপর দাবি করা হয়েছে, ইউনূস আমলে এর চেয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি পাচার হয়েছে।
এই তুলনায় দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতির সংখ্যাকে একই স্তরে রাখা হয়েছে।
শ্বেতপত্র কমিটির ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের হিসাব একটি ফরেনসিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার ফল যেখানে ট্রেড ডেটা, ব্যালেন্স অব পেমেন্ট, হুন্ডি চ্যানেল, এফডিআই মিথ্যা ঘোষণাসহ বহুমুখী তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে "ইউনূস আমলে ২ লাখ কোটি টাকা পাচার" একটি সম্পূর্ণ অনুমানভিত্তিক সংখ্যা, যা একটি ভুল পদ্ধতিতে বের করা হয়েছে।
দাবি ৪: ‘আহসান এইচ মনসুর দুবাইতে মেয়ের নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন, এটি অর্থ পাচারের মাধ্যমে কেনা হয়েছে’
কলামটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দুবাইতে মেয়ের নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট যে অর্থ পাচারের মাধ্যমে কেনা হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু "অনুমেয়" এবং "প্রমাণিত" এক কথা নয়। যে ফ্ল্যাটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা নিয়ে অভিযোগ থাকলেও কোনো বিচারিক বা তদন্তমূলক প্রক্রিয়ায় এটি প্রমাণিত হয়নি। কলামে এই অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
দাবি ৫: ‘আসিফ নজরুল এবং আসিফ মাহমুদ কেন সুইজারল্যান্ড সফর করেছিলেন সে প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে’
সুইজারল্যান্ড সফর এবং সুইস ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। জেনেভায় জাতিসংঘের অফিস রয়েছে, দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম হয়, বাসেলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থাগুলোর বৈঠক হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা সেখানে গিয়েছিলেন মানেই অর্থ পাচার করেছেন এই যুক্তি কোনো সম্পাদকীয় মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়।
সংঘবদ্ধ প্রকাশনাটি কাকতাল নাকি পরিকল্পনা?
বাংলাফ্যাক্ট লক্ষ করেছে, ২০ জুন একই দিনে চারটি পত্রিকায় অভিন্ন কলাম প্রকাশিত হয়েছে। কালের কণ্ঠের অনলাইন সংস্করণে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে: "সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।" অর্থাৎ মূল লেখাটি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত হয়েছে, এবং সেখান থেকে অন্তত দুটি বসুন্ধরা গ্রুপের অন্য মাধ্যমে সিন্ডিকেট করা হয়েছে। কালের কন্ঠ এমনকি একটি ফটোকার্ডও প্রকাশ করেছে যার শিরনাম ‘অর্থপাচারেও চ্যাম্পিয়ন ইউনূস সরকার।’
একই দিনে একই অপতথ্যপূর্ণ কলাম একযোগে গ্রুপের মালিকানাধীন একাধিক মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়াটি সাংবাদিকতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি সমন্বিত ন্যারেটিভ ক্যাম্পেইনের বৈশিষ্ট্য বহন করে।
এসএনবির ডেটা আসলে কী বলে এবং কী বলে না
এসএনবির বার্ষিক পরিসংখ্যান সুইজারল্যান্ডের স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট করা তথ্যের সংকলন। এই ডেটা থেকে যা বোঝা যায় বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ২০২৪-২৫ সালে সুইজারল্যান্ডে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আমানত বাড়িয়েছে। এই ডেটা থেকে বোঝা যায় না কেন বেড়েছে, এতে অবৈধ অর্থ আছে কিনা, এটি কোনো সরকারের কারণে হয়েছে কিনা।
এসএনবির ডেটায় শেল কোম্পানি, ট্রাস্ট বা অপ্রকাশিত কাঠামোর মাধ্যমে রাখা অর্থের কোনো হিসাব থাকে না। যা এলসি জালিয়াতি, ওভার বা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিং (টিবিএমএল) এর মত প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলেও ঘটতে পারে। কিন্তু সেটি প্রমাণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নস্ট্রো অ্যাকাউন্টের অডিট ট্রেইল এবং এলসি ডকুমেন্টেশন প্রয়োজন। শুধু এসএনবির মোট সংখ্যা দিয়ে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির তথ্যটি সত্য। কিন্তু অদিতি করিমের লেখা এবং বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়াগুলোয় একযোগে প্রকাশিত কলামটি এই সত্য তথ্যকে একটি রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ডেটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ যে ৯৮.৬ শতাংশই ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক আমানত, এই তথ্যটিই সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। একটি অপ্রমাণিত গুণক ব্যবহার করে কাল্পনিক পাচারের সংখ্যা তৈরি করা হয়েছে। এবং সেই সংখ্যাকে একটি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।
এই কলামের লেখক অদিতি করিম সম্পর্কে একটি প্রাসঙ্গিক তথ্য উল্লেখ না করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থাকে। গত ডিসেম্বর ২০২৪-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে অদিতি করিমের ব্র্যাক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়। অ্যাকাউন্টে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৯ কোটি টাকা, পেশায় লেখা ছিল গৃহিণী। পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ দায়ের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ওই জব্দাদেশ অবৈধ ঘোষণা করে, তবে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের আপিলের কারণে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ হাইকোর্টের রায় স্থগিত রাখেন। ফলে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত অ্যাকাউন্টটি কার্যত জব্দ অবস্থায় রয়েছে।