| বিশ্লেষণ
বিতর্কের উৎস যখন মিডিয়ার খবর:
সর্ষের মধ্যেই ভূতের বসবাস!
১১ অক্টোবর ২০২৬
গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাজে বেশ কিছু বড় বিচ্যুতি দেখা গেছে। ভুল তথ্য প্রচার, দায়সারা সোর্স ব্যবহার ও সার্কুলার সাইটেশনের মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে এক সংকট।
সার্কুলার সাইটেশন বিতর্ক
সম্প্রতি সার্কুলার সাইটেশনের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে দৈনিক ডেইলি স্টার। গত ২৪ আগস্ট কলামিস্ট কল্লোল কিবরিয়া মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারে একটি কলাম প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে সেই মতামত বা বক্তব্যকেই রয়টার্সের প্রতিবেদন হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং ডেইলি স্টার তা পুনরায় প্রকাশ করে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নাগরিকত্ব বিতর্ক
সম্প্রতি নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়েও দেশের গণমাধ্যমগুলোতে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিকের দেশের সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই। পরবর্তীতে আইনমন্ত্রী পরিষ্কার করেন যে হুমায়ুন কবির নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করেই শপথ নিয়েছেন। কিন্তু এই প্রচারণা এমন একটা সময়ে আসে, যখন হুমায়ুন কবির ভারতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
সিপিডি ও ঢাকা ট্রিবিউনের ভুল তথ্য বিতর্ক
নথিপত্র যাচাই না করে তড়িঘড়ি সংবাদ প্রকাশের ফলে দীর্ঘমেয়াদী যে ক্ষতি হয়, তার উদাহরণ দেখা যায় দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর একটি ভুলে। ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংলাপে দাবি করা হয়, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য।
কিন্তু পরের দিনই সিপিডি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের এই ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, তথ্যটি মূলত ২২ আগস্ট ঢাকা ট্রিবিউনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা ট্রিবিউন তাদের প্রতিবেদনে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছিল। তারা মূলত প্রথম আলোয় ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত একটি পুরোনো সংবাদের মূল সময়কাল পরিবর্তন করে ‘জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬’ লিখে দিয়েছিল।
ঢাকা ট্রিবিউন পরে তাদের প্রতিবেদনটি সংশোধন করলেও ততক্ষণে বড় ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। দেশের একটি প্রথম সারির নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান যখন গণমাধ্যমের ভুল ও অপ্রমাণিত তথ্যের ফাঁদে পা দেয়, তখন তা পুরো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণকেই দুর্বল করে ফেলে। এটি প্রমাণ করে, গণমাধ্যমের তথ্য প্রকাশের আগে ‘ডবল ভেরিফিকেশন’ বা দ্বিগুণ যাচাই কতটা জরুরি।
সাকিব ও মাশরাফির ‘ইমেজ ক্লিন’ বিতর্ক
এরই পাশাপাশি দেশের মূলধারার বেশ কিছু গণমাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিতর্কিত ভূমিকার কারণে সমালোচিত সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের দুই সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান এবং মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে অতি-আবেগপূর্ণ প্রতিবেদন প্রচার করেছে যা একটি পি-আর ক্যাম্পেইনের দিকে ইঙ্গিত করে।
উভয় ক্রিকেটারের বিরুদ্ধেই গুরুতর ফৌজদারি মামলা এবং তদন্ত চলমান থাকলেও বেশ কিছু গণমাধ্যম তাদের ‘ভিকটিম’ বা বলির পাঁঠা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি তাদের বাড়ি পোড়ানো বা মামলা সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যাতে জুলাই অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পক্ষে তাদের অন্ধ সমর্থন এবং জনগণের ওপর দমনপীড়নে নীরব সম্মতির ইতিহাস মানুষ ভুলে যায়।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এসে সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজেরা বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে গণমাধ্যমগুলোকে কঠোর নীতি ও দ্বিগুণ যাচাই পদ্ধতি অনুসরণ করতেই হবে।
Topics:
‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দের অপব্যাখ্যা করে অনলাইনে প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন আওয়ামীপন্থীরা
৩১ বছরের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের নামে প্রচারিত পরজীবী ও বায়োফিল্মের গল্পটি ভুয়া
মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে কাল্পনিক বয়ান ছড়াচ্ছেন সালাহউদ্দীন শোয়েব চৌধুরী
নিরঞ্জনকে হত্যার কারণ উদঘাটনের আগেই সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করল ভারতীয় গণমাধ্যম
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের কারণে নয়, গ্রেপ্তারে অবহেলার অভিযোগে এসআই ক্লোজড
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!
0%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
| আরও পড়ুন
গণশিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যের খণ্ডাংশ নিয়ে কালের কণ্ঠের বিভ্রান্তিকর শিরোনাম
আওয়ামী লীগের তুরাগ নদে 'গণহত্যা'র সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রচারণা
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে
ডিভি লটারির তালিকা থেকে বাদ পড়া নতুন নয়, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশের নাম নেই
বিশ্লেষণ
বিতর্কের উৎস যখন মিডিয়ার খবর:
সর্ষের মধ্যেই ভূতের বসবাস!
১১ অক্টোবর ২০২৬
গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাজে বেশ কিছু বড় বিচ্যুতি দেখা গেছে। ভুল তথ্য প্রচার, দায়সারা সোর্স ব্যবহার ও সার্কুলার সাইটেশনের মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে এক সংকট।
সার্কুলার সাইটেশন বিতর্ক
সম্প্রতি সার্কুলার সাইটেশনের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে দৈনিক ডেইলি স্টার। গত ২৪ আগস্ট কলামিস্ট কল্লোল কিবরিয়া মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারে একটি কলাম প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে সেই মতামত বা বক্তব্যকেই রয়টার্সের প্রতিবেদন হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং ডেইলি স্টার তা পুনরায় প্রকাশ করে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নাগরিকত্ব বিতর্ক
সম্প্রতি নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়েও দেশের গণমাধ্যমগুলোতে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিকের দেশের সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই। পরবর্তীতে আইনমন্ত্রী পরিষ্কার করেন যে হুমায়ুন কবির নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করেই শপথ নিয়েছেন। কিন্তু এই প্রচারণা এমন একটা সময়ে আসে, যখন হুমায়ুন কবির ভারতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
সিপিডি ও ঢাকা ট্রিবিউনের ভুল তথ্য বিতর্ক
নথিপত্র যাচাই না করে তড়িঘড়ি সংবাদ প্রকাশের ফলে দীর্ঘমেয়াদী যে ক্ষতি হয়, তার উদাহরণ দেখা যায় দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর একটি ভুলে। ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংলাপে দাবি করা হয়, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য।
কিন্তু পরের দিনই সিপিডি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের এই ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, তথ্যটি মূলত ২২ আগস্ট ঢাকা ট্রিবিউনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা ট্রিবিউন তাদের প্রতিবেদনে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছিল। তারা মূলত প্রথম আলোয় ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত একটি পুরোনো সংবাদের মূল সময়কাল পরিবর্তন করে ‘জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬’ লিখে দিয়েছিল।
ঢাকা ট্রিবিউন পরে তাদের প্রতিবেদনটি সংশোধন করলেও ততক্ষণে বড় ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। দেশের একটি প্রথম সারির নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান যখন গণমাধ্যমের ভুল ও অপ্রমাণিত তথ্যের ফাঁদে পা দেয়, তখন তা পুরো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণকেই দুর্বল করে ফেলে। এটি প্রমাণ করে, গণমাধ্যমের তথ্য প্রকাশের আগে ‘ডবল ভেরিফিকেশন’ বা দ্বিগুণ যাচাই কতটা জরুরি।
সাকিব ও মাশরাফির ‘ইমেজ ক্লিন’ বিতর্ক
এরই পাশাপাশি দেশের মূলধারার বেশ কিছু গণমাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিতর্কিত ভূমিকার কারণে সমালোচিত সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের দুই সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান এবং মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নিয়ে অতি-আবেগপূর্ণ প্রতিবেদন প্রচার করেছে যা একটি পি-আর ক্যাম্পেইনের দিকে ইঙ্গিত করে।
উভয় ক্রিকেটারের বিরুদ্ধেই গুরুতর ফৌজদারি মামলা এবং তদন্ত চলমান থাকলেও বেশ কিছু গণমাধ্যম তাদের ‘ভিকটিম’ বা বলির পাঁঠা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি তাদের বাড়ি পোড়ানো বা মামলা সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যাতে জুলাই অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পক্ষে তাদের অন্ধ সমর্থন এবং জনগণের ওপর দমনপীড়নে নীরব সম্মতির ইতিহাস মানুষ ভুলে যায়।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এসে সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজেরা বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে গণমাধ্যমগুলোকে কঠোর নীতি ও দ্বিগুণ যাচাই পদ্ধতি অনুসরণ করতেই হবে।