| অনুসন্ধান

ডিজিটাল ময়দানে পতিত ফ্যাসিস্টদের যৌন-আগ্রাসী আচরণ

১০ জুন ২০২৬


ডিজিটাল ময়দানে পতিত ফ্যাসিস্টদের যৌন-আগ্রাসী আচরণ

২০১৩ সালের মে মাসে শাহবাগ আন্দোলনের উত্তাপের মধ্যে ফেসবুকে জন্ম নেয় ‘সিপি গ্যাং’। সিপি-এর পূর্ণ রূপ ছিল ‘ছাগু পুন্দানি’। হেফাজতবিরোধী প্রচারণার আড়ালে গড়ে ওঠা এই সংগঠনটি দ্রুতই পরিণত হয় সংগঠিত অনলাইন সহিংসতার একটি প্ল্যাটফর্মে, যার প্রধান হাতিয়ার ছিল যৌননির্ভর গালাগাল এবং নারীদের ছবি বিকৃত করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া।  

শুরু থেকে গ্রুপটির অ্যাডমিন ছিলেন রাসেল রহমান ওরফে আবদুল হান্নান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সরকার তাপস, বেলের কাঁটা, রতন মজুমদার ও দলকানা বিলির মতো পরিচিত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা। তৎকালীন অনলাইনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মুখ অমি রহমান পিয়াল-এর আশীর্বাদ নিয়েই মূলত প্রাথমিক আধিপত্য বিস্তার করে সিপি গ্যাং। সেসময় যে কেউ গ্রুপের বিরুদ্ধে কথা বললে তার পরিবারের নারী সদস্যদের ছবি খুঁজে বের করে ফটোশপে বিকৃত করা হতো। গ্রুপে যোগ দেওয়া মেয়েদের সঙ্গে সেক্স চ্যাট করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগও উঠেছিল মূল অ্যাডমিনদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অশ্লীল ফটোশপড ছবি বানানোর সংস্কৃতি চালু হয় এই গ্যাংয়ের হাত ধরেই।  


শহীদ মিনারে ‘বুদ্ধিবেশ্যা’ ব্যানার এবং রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নারীবিদ্বেষ

২০১৪ সালের অক্টোবরে অধ্যাপক পিয়াস করিমের মৃত্যুর পর এই গ্যাং আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকারের সমালোচক এমন নয় বুদ্ধিজীবীর ছবিতে লাল ক্রস চিহ্ন এঁকে ব্যানার টানানো হয়। ব্যানারে তাঁদের ‘বুদ্ধিবেশ্যা’ আখ্যায়িত করা হয়। সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ, নূরুল কবীর, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অধ্যাপক আমেনা মহসিনসহ নয়জনের নাম ছিল এই তালিকায়। 

গবেষক রেহনুমা আহমেদ-এর বিশ্লেষণে উঠে আসে, ব্যানারে ব্যবহৃত ‘বেশ্যা’ শব্দটি কেবল ব্যক্তিআক্রমণ নয়। এটি ছিল রাজনৈতিক দ্বিমতকে যৌনতানির্ভর ভাষায় দমনের একটি সচেতন কৌশল। সাংবাদিক সোহরাব হাসান প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক কলামে তখনই সতর্ক করেছিলেন, “বোতলের সিপি আঁটা দৈত্যরা যে কত ভয়ংকর”। 


ক্ষমতায় থাকাকালে বিরোধীদলীয় নারী নেত্রীদের অনলাইনে আক্রমণ 

সিপি গ্যাংয়ের হাতে গড়া এই সংস্কৃতি শুধু বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধীদলীয় নারী নেত্রীরাও একই ধরণের ডিজিটাল আক্রমণের শিকার হয়েছেন; এবং সেই হামলায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও সমর্থকেরা।  

২০২১ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান সম্পর্কে প্রকাশ্যে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল) তখন আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এই মন্তব্যকে “শুধু নিন্দনীয় নয়, সর্বদা পরিত্যাজ্য” বলে অভিহিত করেন এবং প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানান। উল্লেখযোগ্য যে, মুরাদ হাসান নিজেই দাবি করেছিলেন, তিনি যা বলেন, তা সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়েই করেন। 

তৎকালীন বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানাকে নিয়েও একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। আমেরিকান মডেল আলেক্সা ব্রুক রিভেরার ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিও ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় বিকৃত করে রুমিন ফারহানার মুখমণ্ডল বসিয়ে দাবি করা হয়, এটি “২০১৩ সালে তিনি যখন ছাত্রী ছিলেন তখনকার ভিডিও।” 

বর্তমানে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরীকে একই ধরনের হয়রানি করা হয়। ভারতীয় অভিনেত্রী সোহিনী সরকারের ওটিটি সিরিজ “শ্রীকান্ত”-র একটি দৃশ্যের ভিডিওতে তাঁর মুখমণ্ডল বসিয়ে “নিপুণ রায়ের রাতের রঙলীলা” শিরোনামে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। 

লক্ষণীয়, তিনটি ঘটনাতেই টার্গেট ছিলেন বিরোধীদলীয় নারী এবং তিনটি ক্ষেত্রেই হাতিয়ার ছিল যৌনতানির্ভর কনটেন্ট। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ট্রোলিং ছিল না, এটি একই কায়দায় তৈরি একটি রাজনৈতিক কৌশল, যার শিকড় সিপি গ্যাংয়ের সেই ২০১৩ সালের সংস্কৃতিতেই প্রোথিত।


২০২৪-২৫ সালে আওয়ামীপন্থি অ্যাকাউন্টের ডিজিটাল হয়রানি

দশ বছর পেরিয়েও এই সংস্কৃতির বিরাম নেই। বাংলাফ্যাক্টের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আওয়ামীপন্থি একাধিক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি-সহ অন্যান্য দলের নারী নেত্রী এবং অভ্যুত্থানের নারী সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে বিকৃত ফটোকার্ড, জাল উদ্ধৃতি ও যৌন হয়রানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের প্রায় ৩০০ অ্যাকাউন্ট ও পেজ বাংলাফ্যাক্ট নিয়মিত ট্র্যাক করছে। 

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সমকালের লোগো ব্যবহার করে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান-কে নিয়ে একটি বিকৃত ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁর প্রতি অশ্লীল মন্তব্য করা হয়। একই ব্যক্তিকে নিয়ে ২০২৫ সালের মার্চে একাত্তর টিভির লোগো ব্যবহার করে আরেকটি ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করা হয়, যেখানে যৌনতানির্ভর ভাষায় তাঁকে অপমান করা হয়।

২০২৫ সালের নভেম্বরে জাইমা রহমান-এর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের ছবি এআই প্রযুক্তি দিয়ে বিকৃত করে পর্নোগ্রাফিক শিরোনামে প্রচার করা হয়। 

একই বছরের জানুয়ারিতে জনকণ্ঠের একটি ফটোকার্ডের শিরোনাম পরিবর্তন করে তাসনিম জারা-কে নিয়ে যৌন হয়রানিমূলক কনটেন্ট তৈরি করা হয়। জাগো নিউজের ফটোকার্ড বিকৃত করে মাহমুদা মিতু-র বিরুদ্ধেও একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। 

২০২৫ সালের শুরুতে বর্তমান সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম-এর নামে একটি আপত্তিকর ভিডিও 'গোপন ভিডিও ফাঁস' দাবিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, একটি অ্যাডাল্ট সাইটের পুরোনো ভিডিওতে তাঁর ছবি সংযুক্ত করে এটি তৈরি করা হয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মোনামি) এর এআই জেনারেটেড অশ্লীল ছবিও ছড়িয়ে দেয়া হয় এসময়ে।  

আওয়ামী বিরোধী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের অনেকের পরিবার নিয়ে অত্যন্ত নিন্দনীয় প্রচারণা চালানো হয়। অভ্যুত্থানে সক্রিয় নারীদের অনেকেই যৌন হয়রানির শিকার হন, যাদের অনেকেই জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় নন। যেমন অভিনেত্রী আজমেরি হক বাঁধন, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব দীপ্তি চৌধুরী, তাহরিমা জান্নাত সুরভী, নাফসিন মেহনাজ, উজমা তাজরিয়ান। 

২০১৩ সালে সিপি গ্যাং যা করত ম্যানুয়াল ফটোশপে, আজ সেটা হচ্ছে এআই দিয়ে। তখন গালি দেওয়া হতো ফেসবুক গ্রুপে, এখন বিকৃত ফটোকার্ড ছড়ানো হয় বিশ্বস্ত গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে। কিন্তু এই সহিংসতার মূল চরিত্র একটাই - রাজনৈতিক ভিন্নমতের জেরে নারীর শরীরকে অস্ত্র বানিয়ে আক্রমণ করা। 





Topics:



ভিত্তিহীন ইস/রায়ে/লি অভিযোগ প্রচারে ব্যস্ত আ. লীগপন্থিরা
২৩ জুন ২০২৬

ভিত্তিহীন ইস/রায়ে/লি অভিযোগ প্রচারে ব্যস্ত আ. লীগপন্থিরা

বেনজীরের কাঁধে ২৭০টি গুম ও ১৬৫০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়
১৪ জুন ২০২৬

বেনজীরের কাঁধে ২৭০টি গুম ও ১৬৫০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়

লীগের ছড়ানো ফেইক স্ক্রিনশট থেকে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে সংঘাত
২৪ এপ্রিল ২০২৬

লীগের ছড়ানো ফেইক স্ক্রিনশট থেকে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে সংঘাত

অনির্ভরযোগ্য নিউজসাইটের ভুয়া প্রতিবেদনের বরাতে আজকের কণ্ঠের প্রোপাগাণ্ডা
মিথ্যা
১২ এপ্রিল ২০২৬

অনির্ভরযোগ্য নিউজসাইটের ভুয়া প্রতিবেদনের বরাতে আজকের কণ্ঠের প্রোপাগাণ্ডা

দেশকে অরাজক দেখাতে সক্রিয় আওয়ামীপন্থী পেইজ, টার্গেট বিএনপি ও নতুন সরকার
২ এপ্রিল ২০২৬

দেশকে অরাজক দেখাতে সক্রিয় আওয়ামীপন্থী পেইজ, টার্গেট বিএনপি ও নতুন সরকার

আপনার মতামত দিন

এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?

100%

0%

আপনার মতামত শেয়ার করুন:

| মন্তব্য সমূহ:

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!



ডিজিটাল ময়দানে পতিত ফ্যাসিস্টদের যৌন-আগ্রাসী আচরণ

অনুসন্ধান

ডিজিটাল ময়দানে পতিত ফ্যাসিস্টদের যৌন-আগ্রাসী আচরণ

১০ জুন ২০২৬

<p><span style="font-size: 24px;">ডিজিটাল ময়দানে পতিত ফ্যাসিস্টদের যৌন-আগ্রাসী আচরণ</span> <br /></p>

২০১৩ সালের মে মাসে শাহবাগ আন্দোলনের উত্তাপের মধ্যে ফেসবুকে জন্ম নেয় ‘সিপি গ্যাং’। সিপি-এর পূর্ণ রূপ ছিল ‘ছাগু পুন্দানি’। হেফাজতবিরোধী প্রচারণার আড়ালে গড়ে ওঠা এই সংগঠনটি দ্রুতই পরিণত হয় সংগঠিত অনলাইন সহিংসতার একটি প্ল্যাটফর্মে, যার প্রধান হাতিয়ার ছিল যৌননির্ভর গালাগাল এবং নারীদের ছবি বিকৃত করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া।  

শুরু থেকে গ্রুপটির অ্যাডমিন ছিলেন রাসেল রহমান ওরফে আবদুল হান্নান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সরকার তাপস, বেলের কাঁটা, রতন মজুমদার ও দলকানা বিলির মতো পরিচিত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা। তৎকালীন অনলাইনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মুখ অমি রহমান পিয়াল-এর আশীর্বাদ নিয়েই মূলত প্রাথমিক আধিপত্য বিস্তার করে সিপি গ্যাং। সেসময় যে কেউ গ্রুপের বিরুদ্ধে কথা বললে তার পরিবারের নারী সদস্যদের ছবি খুঁজে বের করে ফটোশপে বিকৃত করা হতো। গ্রুপে যোগ দেওয়া মেয়েদের সঙ্গে সেক্স চ্যাট করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগও উঠেছিল মূল অ্যাডমিনদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অশ্লীল ফটোশপড ছবি বানানোর সংস্কৃতি চালু হয় এই গ্যাংয়ের হাত ধরেই।  


শহীদ মিনারে ‘বুদ্ধিবেশ্যা’ ব্যানার এবং রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নারীবিদ্বেষ

২০১৪ সালের অক্টোবরে অধ্যাপক পিয়াস করিমের মৃত্যুর পর এই গ্যাং আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকারের সমালোচক এমন নয় বুদ্ধিজীবীর ছবিতে লাল ক্রস চিহ্ন এঁকে ব্যানার টানানো হয়। ব্যানারে তাঁদের ‘বুদ্ধিবেশ্যা’ আখ্যায়িত করা হয়। সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ, নূরুল কবীর, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অধ্যাপক আমেনা মহসিনসহ নয়জনের নাম ছিল এই তালিকায়। 

গবেষক রেহনুমা আহমেদ-এর বিশ্লেষণে উঠে আসে, ব্যানারে ব্যবহৃত ‘বেশ্যা’ শব্দটি কেবল ব্যক্তিআক্রমণ নয়। এটি ছিল রাজনৈতিক দ্বিমতকে যৌনতানির্ভর ভাষায় দমনের একটি সচেতন কৌশল। সাংবাদিক সোহরাব হাসান প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক কলামে তখনই সতর্ক করেছিলেন, “বোতলের সিপি আঁটা দৈত্যরা যে কত ভয়ংকর”। 


ক্ষমতায় থাকাকালে বিরোধীদলীয় নারী নেত্রীদের অনলাইনে আক্রমণ 

সিপি গ্যাংয়ের হাতে গড়া এই সংস্কৃতি শুধু বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধীদলীয় নারী নেত্রীরাও একই ধরণের ডিজিটাল আক্রমণের শিকার হয়েছেন; এবং সেই হামলায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও সমর্থকেরা।  

২০২১ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান সম্পর্কে প্রকাশ্যে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল) তখন আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এই মন্তব্যকে “শুধু নিন্দনীয় নয়, সর্বদা পরিত্যাজ্য” বলে অভিহিত করেন এবং প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানান। উল্লেখযোগ্য যে, মুরাদ হাসান নিজেই দাবি করেছিলেন, তিনি যা বলেন, তা সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়েই করেন। 

তৎকালীন বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানাকে নিয়েও একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। আমেরিকান মডেল আলেক্সা ব্রুক রিভেরার ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিও ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় বিকৃত করে রুমিন ফারহানার মুখমণ্ডল বসিয়ে দাবি করা হয়, এটি “২০১৩ সালে তিনি যখন ছাত্রী ছিলেন তখনকার ভিডিও।” 

বর্তমানে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরীকে একই ধরনের হয়রানি করা হয়। ভারতীয় অভিনেত্রী সোহিনী সরকারের ওটিটি সিরিজ “শ্রীকান্ত”-র একটি দৃশ্যের ভিডিওতে তাঁর মুখমণ্ডল বসিয়ে “নিপুণ রায়ের রাতের রঙলীলা” শিরোনামে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। 

লক্ষণীয়, তিনটি ঘটনাতেই টার্গেট ছিলেন বিরোধীদলীয় নারী এবং তিনটি ক্ষেত্রেই হাতিয়ার ছিল যৌনতানির্ভর কনটেন্ট। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ট্রোলিং ছিল না, এটি একই কায়দায় তৈরি একটি রাজনৈতিক কৌশল, যার শিকড় সিপি গ্যাংয়ের সেই ২০১৩ সালের সংস্কৃতিতেই প্রোথিত।


২০২৪-২৫ সালে আওয়ামীপন্থি অ্যাকাউন্টের ডিজিটাল হয়রানি

দশ বছর পেরিয়েও এই সংস্কৃতির বিরাম নেই। বাংলাফ্যাক্টের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আওয়ামীপন্থি একাধিক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি-সহ অন্যান্য দলের নারী নেত্রী এবং অভ্যুত্থানের নারী সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে বিকৃত ফটোকার্ড, জাল উদ্ধৃতি ও যৌন হয়রানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের প্রায় ৩০০ অ্যাকাউন্ট ও পেজ বাংলাফ্যাক্ট নিয়মিত ট্র্যাক করছে। 

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সমকালের লোগো ব্যবহার করে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান-কে নিয়ে একটি বিকৃত ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁর প্রতি অশ্লীল মন্তব্য করা হয়। একই ব্যক্তিকে নিয়ে ২০২৫ সালের মার্চে একাত্তর টিভির লোগো ব্যবহার করে আরেকটি ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করা হয়, যেখানে যৌনতানির্ভর ভাষায় তাঁকে অপমান করা হয়।

২০২৫ সালের নভেম্বরে জাইমা রহমান-এর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের ছবি এআই প্রযুক্তি দিয়ে বিকৃত করে পর্নোগ্রাফিক শিরোনামে প্রচার করা হয়। 

একই বছরের জানুয়ারিতে জনকণ্ঠের একটি ফটোকার্ডের শিরোনাম পরিবর্তন করে তাসনিম জারা-কে নিয়ে যৌন হয়রানিমূলক কনটেন্ট তৈরি করা হয়। জাগো নিউজের ফটোকার্ড বিকৃত করে মাহমুদা মিতু-র বিরুদ্ধেও একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। 

২০২৫ সালের শুরুতে বর্তমান সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম-এর নামে একটি আপত্তিকর ভিডিও 'গোপন ভিডিও ফাঁস' দাবিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, একটি অ্যাডাল্ট সাইটের পুরোনো ভিডিওতে তাঁর ছবি সংযুক্ত করে এটি তৈরি করা হয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মোনামি) এর এআই জেনারেটেড অশ্লীল ছবিও ছড়িয়ে দেয়া হয় এসময়ে।  

আওয়ামী বিরোধী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের অনেকের পরিবার নিয়ে অত্যন্ত নিন্দনীয় প্রচারণা চালানো হয়। অভ্যুত্থানে সক্রিয় নারীদের অনেকেই যৌন হয়রানির শিকার হন, যাদের অনেকেই জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় নন। যেমন অভিনেত্রী আজমেরি হক বাঁধন, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব দীপ্তি চৌধুরী, তাহরিমা জান্নাত সুরভী, নাফসিন মেহনাজ, উজমা তাজরিয়ান। 

২০১৩ সালে সিপি গ্যাং যা করত ম্যানুয়াল ফটোশপে, আজ সেটা হচ্ছে এআই দিয়ে। তখন গালি দেওয়া হতো ফেসবুক গ্রুপে, এখন বিকৃত ফটোকার্ড ছড়ানো হয় বিশ্বস্ত গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে। কিন্তু এই সহিংসতার মূল চরিত্র একটাই - রাজনৈতিক ভিন্নমতের জেরে নারীর শরীরকে অস্ত্র বানিয়ে আক্রমণ করা।