| অনুসন্ধান

ভুয়া নিউজসাইট খুলে অপতথ্য ছড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ

৫ জানুয়ারী ২০২৬


ভুয়া নিউজসাইট খুলে অপতথ্য ছড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রোপাগান্ডা, গুজব, ভুয়া-তথ্য ও অপতথ্যের নতুন এক ঢেউ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের ব্যবহার আগ থেকে চলে আসলেও, সম্প্রতি আরও সংগঠিত ও পদ্ধতিগত উপায়ে এর ব্যবহার হচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অনলাইনে গজিয়ে উঠেছে একসারি প্রোপাগান্ডা ওয়েবপোর্টাল ও ফেসবুক পেজ। এসবের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,  এসব ওয়েবপোর্টাল ও পেজের সাথে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা প্রবল এবং তাদের অন্যতম কাজ হচ্ছে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রোপাগান্ডা ও বয়ান ফেরি করে বেড়ানো। 

অনুমান করা যায়, স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর মাঠের রাজনীতি থেকে কার্যত অদৃশ্য হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ অপতথ্যকে তাদের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়। নিয়মিত ভুয়া তথ্য ছড়ানোর পাশাপাশি তাদের প্রচারিত অপতথ্য “বিশ্বাসযোগ্য” হিসেবে দেখানোর জন্য পরিচালনা করা হচ্ছে বিভিন্ন ছদ্মবেশী নিউজ পোর্টাল। কেবল, ভুয়া তথ্য ছড়িয়েই ক্ষান্ত দিচ্ছে না তারা, সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একের পর এক ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। 

বাংলাফ্যাক্ট এরকম অন্তত পনেরোটি  ওয়েবসাইটের খোঁজ পেয়েছে।  সজীব ওয়াজেদ জয়, এ টিম ও আওয়ামিলীগ সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল একাউন্ট থেকে  এসব পোর্টালের সংবাদ, মতামত নিয়মিত শেয়ার দেয়া হয়। । আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ও  সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকরাও এই ধরনের অপতথ্যে বিভ্রান্ত হোন। 


খেয়াল করার মতো বিষয়, প্রত্যেকটি সাইটই খোলা হয়েছে ৫ আগস্টের পর। এই লেখার উদ্দেশ্য হলো, ভুয়া নিউজসাইট খুলে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতাকে শনাক্ত করা, এবং সাইটগুলোর পরিচয় ও কার্যক্রম তুলে ধরে পাঠককে সচেতন করা।



বিডি ডাইজেস্ট


এই পোর্টালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে গড়া হয়েছে বিডি ডাইজেস্ট। সাধারণ একটি নিউজ পোর্টালের মতোই এটি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করে চলছে। এই সাইটটি ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট চালু হয়। যদিও এটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ খোলা হয়েছিল ২০২৩ সালে, যখন পেইজটির নাম ছিল ‘Edit lew Fan’s Bangladesh’। পরে তা Rubel Miah Official, একলা জীবন, ইত্যাদি নানা নামে পরিবর্তিত হয়। ৫ আগস্টের পর প্রথমে পেইজের নাম হয় ‘হিদায়েত’। ১৫ অক্টোবর  ২০২৪ থেকে বর্তমানে ‘BDDIGEST’ নামে চালু আছে। 


বিডি ডাইজেস্টের ফেসবুক পেইজের “পেইজ ট্রান্সপারেন্সি” থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ, জার্মানি, কানাডা ও সুইডেন থেকে পেইজটি পরিচালিত হয়। কানাডাপ্রবাসী আওয়ামী লীগ এক্টিভিস্ট কাজী মামুন এই পেজের একাধিক লাইভ ভিডিওতে হোস্ট হিসেবে ছিলেন। সাইটটির footer-এ লেখা আছে, A Global Justice Network Foundation Program; এই “গ্লোবাল জাস্টিস নেটওয়ার্ক”-এর ওয়েবসাইট পাওয়া গেলে সেখানে একটি প্রেস ব্রিফিং ছাড়া এ নামের সংগঠনটির কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। আওয়ামী এক্টিভিস্ট কাজী মামুন ফেসবুক ভিডিওতে নিজেকে এই ‘গ্লোবাল জাস্টিস নেটওয়ার্ক’-এর ডিরেক্টর পরিচয় দেন। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিডি ডাইজেস্ট উদ্যোগটির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা প্রতীয়মান হয়। কাজী মামুনের এই ‘গ্লোবাল জাস্টিস নেটওয়ার্ক’-এর কোনো স্বতন্ত্র ও যাচাইযোগ্য কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। Global Justice Network নামে আসলেই সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি আইনজীবী সংগঠন রয়েছে, যার ওয়েবসাইট globaljusticenetwork.com ডোমেইনে সক্রিয়। ডট কমের বদলে ডট অর্গ দিয়ে কাজী মামুনের নকল সংস্থাটির ডোমেইন globaljusticenetwork.org রাখা হয়েছে।


করিডর ও আরাকান ইস্যুতে অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে সাইটটি।  গত ২৫ এপ্রিল এটি “আরাকান আর্মিকে স্টারলিঙ্ক প্রযুক্তি সরবরাহে ইউনূস সরকারের গোপন তৎপরতা, শঙ্কায় জাতীয় নিরাপত্তা” শিরোনামে ভুয়া খবর পরিবেশন করে । ২৭ এপ্রিল “অবশেষে গোপনীয়তা ভেঙে রাখাইন যুদ্ধে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা নিয়ে মুখ খুললেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা” শিরোনামে বিকৃত উদ্বৃতি, উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিত উপস্থাপনের সাথে আরেকটি বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করে।  ৩০ এপ্রিল এক খবরের শিরোনাম ছিল “ঝুঁকিতে জাতীয় নিরাপত্তা: রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অন্ধকারে রেখে আরাকান আর্মির জন্য করিডোর”। ৩ মে প্রকাশিত এক খবরের শিরোনাম ছিল “সীমান্তে বাড়তে থাকা আরকান আর্মির আধিপত্যের মাঝে ‘মানবিক করিডর’ এর আড়ালে কি “প্রাণঘাতী মরণাস্ত্র” সরবরাহ হবে?”। এতে বলা হয় মরণাস্ত্র সরবরহারের আশংকাটি স্থানীয় জনগণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের, যদিও এর সপক্ষে কারো উদ্বৃতি দেয়নি তারা। ১৯ মে “যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সঙ্গে সেনাপ্রধানের বৈঠক: ‘মানবিক করিডর’ ইস্যুতে অটল জেনারেল ওয়াকার” শিরোনামে তারা আরেকটি বানোয়াট খবর প্রকাশ করে। বিভিন্ন সংবাদ ও মতামতে আওয়ামী লীগের বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ করে সাইটটি। যেমন ১০ জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত কয়েকটি সংবাদ ও মতামতে দাবি করা হয় যে, টিউলিপকে ‘ভিত্তিহীন মামলায়’ ফাঁসানো হয়েছে, কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করা হচ্ছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে প্রেস সচিব মিথ্যাচার করেছেন,  ইত্যাদি। 


২০২৪ সালে নূর হোসেন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ঘোষিত কর্মসূচির ইভেন্টসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ইভেন্ট বিডি ডাইজেস্টের পেইজ থেকে খোলা হয়েছিল। ফলে স্পষ্ট যে, নিউজ সাইটের ছদ্মবেশে অপতথ্য ও আওয়মী বয়ান ছড়ানোর উদ্দেশ্যে কাজী মামুনের নেতৃত্বে কাজ করছে বিডি ডাইজেস্ট।



The Voice


নিউজ সাইটের ছদ্মবেশে পরিচালিত ‘বিডি ডাইজেস্ট’ চালুর তিন দিন পরই, ১৮ আগস্ট ২০২৪-এ ‘দ্য ভয়েস’ নামের একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন নিবন্ধিত হয়। সাইটটির বিন্যাস আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মতো, এবং ফুটারে নিজেদের পরিচয়ে তারা লিখেছে: “Its primary focus is the diplomacy, politics, and policy of the USA and Bangladesh.” কিন্তু সাইটটিতে বাংলাদেশ–সম্পর্কিত সংবাদেরই আধিক্য চোখে পড়ে। ইংরেজিভাষী প্ল্যাটফর্ম হলেও এতে বাংলা ভাষায় পড়ার অপশনও রয়েছে।


এটির ২২ হাজার ফলোয়ার সম্বলিত ফেসবুক পেইজের ট্রান্সপারেন্সি থেকে দেখা যায়, এর দুজন এডমিন রয়েছেন, একজন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্যজন বাংলাদেশ থেকে। এছাড়া ১৩ হাজার সাবস্ক্রাইবারের ইউটিউব চ্যানেলেও বাংলা ভাষার ভিডিও আছে। অর্থাৎ, সাইটটি স্পষ্টতই বাংলাদেশ–কেন্দ্রিক এবং এর অডিয়েন্সও মূলত বাংলাদেশি।  



সাইটটির পরিচিতিতে লেখা আছে, এর সম্পাদক দস্তগীর জাহাঙ্গীর ও নির্বাহী সম্পাদক এ.জেড.এম সাজ্জাদ হোসেন। দস্তগীর জাহাঙ্গীর সময় টিভির সাবেক সাংবাদিক এবং হোয়াইট হাউজ প্রতিনিধি ছিলেন। নির্বাহী সম্পাদক এ.জেড.এম সাজ্জাদ হোসেন ২০২১ সাল থেকে গণ-অভ্যুত্থানের সময় পর্যন্ত ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার ছিলেন। এ দুজনই মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার রায়ের পর এই রায়ের বিপক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন, যা শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের অবস্থানের সঙ্গে তাঁদের একাত্মতা নির্দেশ করে।


অভ্যুত্থান চলাকালীন, ২৫ জুলাই ২০২৪-এ তিনি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দস্তগীর জাহাঙ্গীর প্রশ্ন করতে গিয়ে  বলেছিলেন, “ছাত্র আন্দোলনের নামে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলের জঙ্গি সদস্যরা ঢাকায় জড়ো হয়েছিল”। তাঁর প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বাংলাদেশ সরকারকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানালেও সময় টিভির প্রতিবেদনে দস্তগীর জাহাঙ্গির সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিলেন।


দস্তগীর জাহাঙ্গীর বর্তমানে Press Xpress নামে একটি গণমাধ্যমের হোয়াইট হাউজ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। প্রেস এক্সপ্রেস কিছুটা পুরোনো হলেও, এটিও The Voice এর মতো বাংলাদেশ সম্পর্কিত ভুয়া সংবাদ ও অপতথ্যে ভরপুর। ২০২০ সাল থেকে এটির ফেসবুক পেইজ এবং ২০২২ সাল থেকে এটির ইউটিউব চ্যানেল ও ওয়েবসাইট আওয়ামী লীগের ইংরেজি প্রোপাগান্ডা মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। প্রেস এক্সপ্রেসের ফেসবুক পেইজের ৭ জন এডমিন আছেন, যার ৫জনই বাংলাদেশ থেকে পেইজ পরিচালনা করেন। প্রেস এক্সপ্রেসের “যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো প্রধান” হিসেবে অভ্যুত্থানের পরেও তিনি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে আওয়ামী লীগের পক্ষ হয়ে অপতথ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রশ্ন অব্যাহত রেখেছেন। যেমন, ১৭ অক্টোবর ২০২৪-এ তিনি প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, আন্দোলন চলাকালীন বাংলাদেশে ৩ হাজারের বেশি পুলিশ নিহত হয়েছে, যা সম্পূর্ণই মিথ্যা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিহত পুলিশের সংখ্যা ছিল ৪৪। বিস্তারিত ফ্যাক্টচেক দেখুন এখানে। এ বছর ১৯ মার্চ প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি পুরনো একটি ছবিকে “গতকাল হিজবুত তাহরিরের মিছিল” দাবি করে প্রশ্ন করেন। দেখুন বাংলাফ্যাক্টের ফ্যাক্টচেক।

দ্যা ভয়েসের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, এতে পতিত আওয়ামী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের নামে অন্তত ৫টি কলাম রয়েছে। সাইটটিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে “ডিপস্টেটের ষড়যন্ত্র” হিসেবে আখ্যা দিয়ে Deepanwita Roy Martin নামে একজনের মতামত পাওয়া যায়। দ্বীপান্তিতা রায় মার্টিন একজন অভিনেত্রী, যিনি গণ-অভ্যুত্থানের সময় আলোচিত “আলো আসবেই” গ্রুপের সদস্য ছিলেন। তাঁর ফেসবুক একাউন্টে লেখা আছে, তিনি দ্যা ভয়েসে কাজ করেন।  তিনি আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ ও অন্যান্য পেইজ থেকে নিয়মিত লাইভ আলোচনায় হোস্ট হিসেবে অংশ নেন। 

গত ১৩ নভেম্বর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছবি দিয়ে আওয়ামী লীগের কথিত লকডাউন প্রচার করে একটি সংবাদ প্রকাশ করে সাইটটি। এ সময় ফেসবুক পেইজে এই কর্মসূচির পক্ষে প্রচারণা চালিয়েও পোস্ট দেয়। অর্থাৎ দ্যা ভয়েস কেবল আওয়ামী লীগের হয়ে অপপ্রচার নয়, বরং দলীয় প্রচারের কাজও করে।




এসব তথ্য ও সংশ্লিষ্টতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ছদ্মবেশ নেওয়া “দ্য ভয়েস” মূলত আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকদের দ্বারা পরিচালিত একটি অপতথ্যভিত্তিক ভুয়া নিউজসাইট।


নাউ বাংলাদেশ


‘নাউ বাংলাদেশ’ নামের একটি ওয়েবসাইট ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর নিবন্ধিত হয়। নিউজ সাইটের আদলে তৈরি সাইটটিতে “ইসলামী শাসনের নামে ভোটের রাজনীতি, গণতন্ত্র না কি উগ্র মতাদর্শের পথে বাংলাদেশ!” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের আরেকটি ভুয়া নিউজসাইট Untold BD তে ইংরেজিতে একই শিরোনাম ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা একাধিক প্রোপাগান্ডামাধ্যমের পারস্পরিক সংযোগের ইঙ্গিত দেয়।


তারেক রহমানকে প্রটোকল দেওয়ার জন্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে—এমন একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব কোনো ধরনের তথ্যসূত্র ছাড়াই সংবাদের আদলে সাইটটিতে প্রকাশ করা হয়। একই হত্যাকাণ্ডের দায় আরেকটি প্রতিবেদনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের ওপর চাপানো হয়।


ফেসবুকে সাইটটির কোনো পেইজ পাওয়া যায়নি। তবে এক্সে একটি অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে, যা ভারত থেকে পরিচালিত হচ্ছে।



The Asia Post


২৫ অক্টোবর ২০২৪-এ ওয়ার্ডপ্রেসের ফ্রি থিম ব্যবহার করে “দ্য এশিয়া পোস্ট” নামের একটি ওয়েবসাইট খোলা হয়। সাইটটির নামকরণ এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে এটি একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলে মনে হয়। সাইটটির ‘About’ অংশে লেখা আছে, “unfiltered news from South Asia and the rest of the world”; তবে ইংরেজি ভাষার এই সাইটে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত প্রায় সব সংবাদই বাংলাদেশ–সম্পর্কিত। সেনা অভ্যুত্থান, জঙ্গিবাদ, সীমান্ত ইস্যু এবং দুর্নীতিতে বাইনান্স অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের মতো বিভিন্ন বিষয়ে সাইটটি ভিত্তিহীন ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছে।উদাহরণস্বরূপ, Bangladesh Interim Government Officials Accused of Corruption: Bribes and Illicit Funds Stashed in Bitcoin শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, উপদেষ্টা ও ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে বাইনান্স অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ভুয়া খবর প্রকাশ করা হয়। এসব অ্যাকাউন্টের ভুয়া স্ক্রিনশটও সাইটটিতে ব্যবহার করা হয়। সজীব ওয়াজেদ জয় এটি ফেসবুকে পোস্ট করে পরে ডিলিট করে দেন। এ বছর ২৯ মে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে লস্কর ই তাইয়েবা যুক্ত ছিল মর্মে একটি বানোয়াট খবর প্রকাশ করে দ্য এশিয়া পোস্ট। এটিও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ফেসবুক ও টুইটারে ব্যাপকভাবে শেয়ার করেন।


সাইটটির কোনো ফেসবুক বা সোশাল মিডিয়া পেজ নেই। সজীব ওয়াজেদ জয়সহ আওয়ামী লীগের লোকজন প্রায়ই এটির বিভিন্ন লিংক শেয়ার করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেন। “ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া” হিসেবে আখ্যা দিয়েও সোর্স হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মহিত উর রহমান শান্ত বিনান্স একাউন্ট সম্পর্কিত ভুয়া সংবাদটিকে “বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতি কেলেঙ্কারিগুলি” প্রমাণ আখ্যা দিয়ে ফেসবুক পোস্ট দিয়েছিলেন। গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে সাইটটিকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া, ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্ট ইত্যাদি আখ্যা দিয়েও সোর্স হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ৪ জুন ২০২৫-এর পর থেকে সাইটটিতে আর কোনো নতুন কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়নি।


মুক্তিবার্তা৭১


মুক্তিবার্তা৭১ নামে এ বছর জানুয়ারিতে একটি ফেসবুক পেইজ ও ওয়েবসাইট চালু করা হয়, যার মোটো “প্রতিদিনের সত্য খবরের প্রত্যয়ে”। এটির ফেইসবুক পেইজের কনটেন্ট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এখানে নিয়মিতভাবে শেখ হাসিনার বাণী, বক্তব্য ও দলীয় বয়ানভিত্তিক কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ফটোকার্ডে লেখা হয়েছে, “নীতি আদর্শ নিয়ে পথ চলবে, নীতি আদর্শ যদি ঠিক থাকে, লক্ষ্য যদি স্থির থাকে—যেকোনো দুর্যোগ অতিক্রম করে অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। শেখ হাসিনা।” আরেকটি ফটোকার্ডে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে লেখা হয়েছে, “জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে কারাগারে বাকপ্রতিবন্দী সাইদ, পাশে আছে স্বয়ং জননেত্রী শেখ হাসিনা।” এসব ক্ষেত্রে ফটোকার্ড প্রকাশ করা হলেও সংশ্লিষ্ট খবরের লিংক বা বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।


১৩ই জানুয়ারি ২০২৫-এ এটির ফেসবুক পেইজ খোলা হয়। এটির ওয়েবসাইটের ডোমেইন muktibarta71.com যা ১ আগস্ট ২০২৫-এ চালু করা হয়। তবে সাইটে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের সংবাদও প্রকাশিত রয়েছে, যা নির্দেশ করে যে কিছু সংবাদ ব্যাকডেটে পোস্ট করা হয়েছে।


১ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সাইটটিতে “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের গুলিতে শিশু ইফতি নিহত” নামে একটি ভুয়া খবর প্রকাশিত হয়। ২৭ আগস্ট দেখা যায় “জুলাই আন্দোলনে স্নাইপার—শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিবিয়া মডেল” শিরোনামে এক সংবাদ, যাতে সংবাদ হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো উপাদানই নেই। সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব শেয়ার করে থাকে পোর্টালটির ফেসবুক পেইজ। যেমন, ৭ অক্টোবর ২০২৫-এ একটি পোস্টে বলা হয়, “ইউনুস সরকারের ৫ জন উপদেষ্ঠা এখন পর্যন্ত জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে যোগাযোগ করে ক্ষমা চেয়েছেন এবং সেইফ এক্সিট দেওয়ার অনুরোধ করেছেন!”


পোর্টালটির প্রকাশিত সংবাদ ও মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর কনটেন্ট ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগের দলীয় বয়ানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ৪ অক্টোবর প্রকাশিত একটি লেখার শিরোনাম ছিল, “ষড়যন্ত্রকারীদের পরাজয় অনিবার্য, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন অবধারিত।” এসব তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, মুক্তিবার্তা৭১ মূলত আওয়ামী লীগপন্থী প্রচারণামূলক কনটেন্ট ছড়ানোর একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যা নিয়মিতভাবে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে দলীয় বয়ান প্রচার করে।



VORTEX


গত ৩ মার্চ ২০২৫-এ খোলা হয়েছে ভরটেক্স নামক একটি সাইট। এটিকেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মতো রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যদিও এর ডোমেইনে bdvortex রয়েছে। সাইটের মেনুতে ‘South East Asia’ নামে একটি সেকশন থাকলেও, সেখানে প্রকাশিত সংবাদসমূহের প্রায় সবই বাংলাদেশ–কেন্দ্রিক। যদিও বাংলাদেশ সাউথ ইস্ট এশিয়ার অন্তর্ভূক্ত নয়। এটিতেও সেনাবাহিনী, মিয়ানমার, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে শতাধিক বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া তথ্য সম্বলিত পোস্ট পাওয়া গেছে। 


করিডর ইস্যুর জের ধরে মিয়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে “অবাঞ্ছিত” ঘোষণা করা হয়েছে মর্মে ভুয়া খবরটি এই সাইট থেকে প্রচারিত হয়েছিল। বাংলাদেশ ছায়াযুদ্ধে আছে, এমন বিভ্রান্তিকর বয়ানও ছড়িয়েছে সাইটটি।


১৬ জুন  ২০২৫-এ এটির প্রকাশিত এক খবরে  “Sources close to the British government”-এর এক বায়বীয় সূত্রের বরাতে উল্লেখ করা হয় আওয়ামী লীগ নিষদ্ধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জের ধরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেননি। ৮০% জনগণ ড. ইউনূসের নেতৃত্ব চায় না, এমন একটি ভুয়া সংবাদ ১৩ জুন এই সাইটে প্রকাশিত হয়, এতে কোনো জরিপের তথ্য, বা সূত্র কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।


ওয়েবসাইটটির footer-এ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আইকন থাকলেও সেখানে কোনো লিংক দেয়া নেই। এক্স-এ এটির একটি একাউন্ট পাওয়া যায়, যা আওয়মীলীগের অফিসিয়াল পেইজ থেকে ফলো করা হয়। এক্স-এর About this account থেকে দেখা যায়, এই একাউন্টট ভারত থেকে পরিচালিত। এটির প্রচারও সজীব ওয়াজেদ জয়সহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও এক্টিভিস্টদের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ছড়ানো হয়, পরে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা তা ছড়িয়ে দেয়।


Untold BD


এই ওয়েবসাইট চালু হয় ২০২৫ এর ১৫ মার্চে। ইংরেজি ভাষার এই সাইটটির এক্স হ্যান্ডেলটি ভারত থেকে পরিচালিত হয়। এটির মাত্র ৭ জন ফলোয়ার রয়েছে। Human Rights Updates 🇧🇩 নামে একটি হ্যান্ডেল থেকে আনটোল্ড বিডি’র পোস্ট নিয়মিত শেয়ার করা হয়, নামের মধ্যে বাংলাদেশ থাকলেও এটিও ভারত থেকে পরিচালিত। 


১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কিছু আওয়মীপন্থী গ্রুপ বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন এখানে)। এUntold BD-ও এই প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অংশ হিসেবে আক্রমণের জন্য জামায়াতকে দায়ী করে ‘সংবাদ’ প্রকাশ করে, যাতে কোনো তথ্যসূত্র নেই। আরেকটি সংবাদে মাইকেল চাকমার গুমের ঘটনাকে ভুয়া বলে দাবি করে, তিনি জামায়াতের অর্থায়নে সরকার পতনের সহিংস নকশা বাস্তবায়নে যুক্ত ছিলেন মর্মে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের July conspirators, গণ-অভ্যুত্থানকে Coup আখ্যা দিয়ে এটিতে ‘সংবাদ’ প্রকাশ করা হয়, যা আওয়ামী লীগের বয়ানেরই অনুরূপ। 


Bangladesh Perspectives


এক্সে যেসব আইডি থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে সক্রিয়ভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানো হয়, Bangladesh Perspectives তার একটি, যা ভারত থেকে পরিচালিত হয়। ২৮ এপ্রিল, ২০২৫ এটি ওয়বসাইট  চালু করে এবং তা ধীরে ধীরে একটি নিউজ সাইটের রূপ নেয়। সাইটটির পরিচিতি অংশে লেখা রয়েছে, এটি “one of the leading online news portal to display the policies and opinions about Bangladeshi people.” কিন্তু সাইটে প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদন বা মতামতের সঙ্গে লেখকের নাম থাকে না, যা এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। 


পোর্টালটি অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপিকে ঘিরে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডায় পরিপূর্ণ। যদিও এটি চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে চালু হয়েছে,বিভিন্ন সংবাদে ২০২৪ সালের শুরুর সময় দেখানো হয়েছে। যেমন, Yunus ‘s plot to forcibly occupy eight companies owned by 10.05 million members of Grameen Bank শিরোনামে একটি ভুয়া খবরের প্রকাশ-তারিখ দেখানো হয়েছে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। দেখে মনে হতে পারে, সাইটটি বহু আগে থেকেই চালু ছিল এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেরও আগেই ড. ইউনূসকে নিয়ে এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তবে প্রকৃত সত্য হলো, ওয়ার্ডপ্রেস প্ল্যাটফর্মে সহজেই যেকোনো পোস্টের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া যায়; অর্থাৎ, আজ লেখা প্রকাশ করলেও সেটিকে আগের যেকোনো তারিখে প্রদর্শন করা সম্ভব। একই কায়দায় State Dept concerned over arrests but mum on BNP’s arson terrorism শিরোনামের এক খবরের প্রকাশ-তারিখ দেখানো হয়েছে ৩১ জানুয়ারি ২০২৪। সংবাদটি সময় টিভির একটি সংবাদ  থেকে সম্পূর্ণ নকল করা। ডোমেইন রেজিস্ট্রেশন যাচাইকরণ টুল Whois ব্যবহার করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সাইটটি ২৮ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে নিবন্ধিত হয়েছে।


The Daily Republic

 

২৭ মে চালু হয়েছে দ্যা ডেইলি রিপাবলিক নামে আরেকটি ভুয়া নিউজ সাইট।  এটির ফেসবুক পেইজ খোলা হয় ১ জুন। ১৫ জুন “Kaler Kantho forced to delete news story on Yunus’ tax evasion” শিরোনামে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়, কালের কণ্ঠকে একটি সংবাদ ডিলিট করতে বাধ্য করা হয়েছে, কিন্তু দাবির সপক্ষে কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি। শেখ হাসিনার উক্তি, নির্দেশনা ইত্যাদি দলীয় প্রচারমাধ্যমের মতোই প্রকাশ করে চলছে সাইটটি।  জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারকে mockery of justice উল্লেখ করেও ‘সংবাদ’ প্রকাশ করেছে এটি। 

সাইটটির ‘অপিনিয়ন’ সেকশনে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৯টি আর্টিকেল পাওয়া গেছে যার ৫টিতেই লেখকের নামের উল্লেখ নেই। ৩ জুন ২০২৫-এ প্রকাশিত “Rakhine Corridor: Possibilities and challenges” শিরোনামে ড. রাহমান নাসির উদ্দিনের নামে একটি লেখা পাওয়া যায়। বাংলাফ্যাক্ট যাচাই করে দেখেছে, মূল লেখাটি ঢাকা ট্রিবিউনে A humanitarian corridor for Rakhine? Dissecting the potentials and challenges শিরোনামে ৮ মে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখক বাংলাফ্যাক্টকে জানিয়েছেন, তিনি “ডেইলি রিপাবলিক” নামক সাইটে প্রকাশের জন্য কোনো লেখা দেননি। সাইটটি মূল লেখার শিরোনাম ও বিভিন্ন অংশ পরিবর্তন করে লেখকের অনুমতি ছাড়াই লেখাটি প্রকাশ করেছে। 


মজার ব্যাপার হলো, প্রোপাগান্ডা সাইটটির একটি ‘ফ্যাক্টচেক’ সেকশনও রয়েছে। ১৫ জুন প্রকাশিত এক “ফ্যাক্টচেক”-এর শিরোনাম ছিল “Did BNP’s Salahuddin Ahmed stage his own disappearance?” । অবশ্য এটি কোনো অর্থেই ফ্যাক্টচেকের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পড়ে না। এখানে কোনো ফ্যাক্টচেক করা হয়নি বরং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম হওয়ার দাবির বিপরীতে এতে উল্লেখ করা হয়েছে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বক্তব্য। 


ডেইলি রিপাবলিক নিয়মিত বিভিন্ন আলোচনার আয়োজন করে যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত থাকে। একটি “আলোচনা অনুষ্ঠানে” আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অংশ নেন, যা আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল পেইজ থেকে শেয়ার দেয়া হয়। অনুরূপভাবে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সাথে আলোচনাও দলটির অফিসিয়াল পেইজ থেকে শেয়ার দেয়া হয়। 



বাংলাদেশ ইনসাইট


১৯ জুন ২০২৫-এ নিবন্ধিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ইনসাইট’ নামক আরেকটি ভুয়া পোর্টালের ডোমেইন। এর ফেসবুক পেইজ বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত হয়। এক্স-এ এটি বেশ সক্রিয় এবং ভেরিফায়েড। এক্স একাউন্টে গেলে দেখা যায়, প্লাটফর্মটিতে এটি ২০২৪-এর আগস্টে যুক্ত হয়েছে। ওয়েবসাইট খোলার আগ পর্যন্ত এটি দ্য ডেইলি রিপাবলিকের পোস্ট নিয়মিতভাবে রিপোস্ট করেছে। এর থেকে বোঝা যায় যে, ভুয়া নিউজসাইটগুলো পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত এবং সংগঠিত। এক্স একাউন্টটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত বলে দেখা যায়।


ওয়েবসাইটিতে গেলেই দেখা যায় ‘ইউনূস গং’ সেনাবাহিনী ধ্বংস করছে, আরকানে আর্মিকে অস্ত্র দিচ্ছে, জঙ্গি রাষ্ট্র তৈরি করছে, পিলখানার হত্যাকারীদের মুক্তি দিচ্ছে, পার্বত্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, এমনসব মনগড়া উস্কানিমূলক ‘সংবাদে’ এটি ভরপুর। এটির ইপেপার নামে একটা সেকশন থাকলেও বাস্তবে কোনো ইপেপার ভার্সন নেই। গণমাধ্যমের ছদ্মবেশ নেয়া সাইটটিতে একটি ফোন নাম্বার দেয়া আছে, যেটি চালু নেই। একটি ঠিকানাও দেয়া আছে, তবে ওই ঠিকানার ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে সেখানে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে, বাংলাদেশ ইনসাইটস বা কোনো গণমাধ্যমের কোনো অফিস নেই। অর্থাৎ পাঠকের কাছে কাছে বিশ্বাসযোগ্য দেখানোর জন্য ফোন নাম্বার এবং ঠিকনা দেয়া হলেও, সেগুলো মূলত ভূয়া।


দৈনিক আজকের কণ্ঠ


Daily Ajker Kantho নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে নিয়মিত ফটোকার্ড এবং ভিডিও পোস্ট করা হয়। এর ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয় নানান ‘খবর’। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এটি কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যম। এটির পেইজ ও ওয়েবসাইটে ই-পেপারের ছবি দেয়া আছে, যাতে মনে হতে পারে এটি কোনো প্রিন্ট গণমাধ্যম। আদতে এই পোর্টালটির কোনো ইপেপার বা প্রিন্ট ভার্সন নেই। 

বাংলাদেশ, ভারত, ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত পেইজটির সাম্প্রতিক কিছু পোস্ট পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে বেশ কিছু ভুয়া তথ্য খুঁজে পেয়েছে বাংলাফ্যাক্ট টিম। গত ৫ জুলাই ২০২৫-এ আলোচিত পেইজটি থেকে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে দাবি করা হয়, মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,  ‘শেখ হাসিনার মতো ডায়নামিক লিডার বিরল।’ তবে সে দাবির সত্যতা খুঁজে পায়নি বাংলাফ্যাক্ট। মাহাথির মোহাম্মদ শেখ হাসিনার প্রশংসার করেছেন, এমন দাবির সপক্ষে গণমাধ্যম বা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। গত ১৭ জুলাই আলোচিত পেইজটি থেকে ‘বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের জবাব কে দেবে?’ ক্যাপশনে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। সেখানে দেখা যায়, অচেতন অবস্থায় এক যুবককে দুই পুলিশ সদস্য পুলিশ ভ্যানে তুলছেন। ভিডিওটি ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জের ঘটনা বলে দাবি করা হলেও যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি গত ৪ জুন, ২০২৫ থেকে ইন্টারনেটে রয়েছে। অর্থাৎ, ভিডিওটি পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার।

এছাড়াও, গত ৮ আগস্ট ‘আর নেই সাংবাদিক আনোয়ার, পুলিশের সামনেই যাকে পিটিয়েছিল চাঁদাবাজরা’ শীর্ষক শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রচার করে দাবি করা হয়, গাজীপুরে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় পুলিশের উপস্থিতিতেই একদল দুর্বৃত্তের হাতে নির্মমভাবে প্রহৃত সেই সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন মারা গেছেন। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, গত ৬ আগস্ট গাজীপুরের সাহাপাড়া এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বেধড়ক মারধরের শিকার দৈনিক বাংলাদেশের আলো পত্রিকার রিপোর্টার আনোয়ার হোসেন মারা যাননি। তিনি জীবিত আছেন বলে গাজীপুর সদর থানার ওসি মেহেদি হাসান বাংলাফ্যাক্টকে নিশ্চিত করেছেন।

এটির ফেসবুক পেইজ খোলা হয় ২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল। প্রাথমিকভাবে এটি শুধু ফটোকার্ড প্রচারের কাজ করত।  ছদ্মবেশী এই গণমাধ্যমের ফটোকার্ডগুলো দেখতে প্রফেশনাল, ফলে অনেকে না বুঝেও এই পেইজের ফটোকার্ড শেয়ার করে থাকেন যা বিভ্রান্তি ছড়ায়। এটির ওয়েবসাইট চালু হয় এ বছরের ৩১শে জুলাই। উল্লেখ্য, আজকের কণ্ঠ নামে https://ajkerkantho.com ডোমেইনে একটি সাধারণ নিউজ পোর্টালের সন্ধান পাওয়া যায়, যা ২০২১ সাল থেকে চালু আছে। “দৈনিক আজকের কণ্ঠ” নামক আলোচিত ভুয়া পোর্টালটির ডোমেইন https://www.dainikajkerkantho.com/


দিনপত্র


৪ আগস্ট ২০২৫-এ নিবন্ধিত হয় দিনপত্র নামক ওয়েবসাইট। অন্যান্য ভুয়া নিউজসাইটের মতো এখানেও নিয়মিতভাবে অপতথ্য ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে। নভেম্বরে প্রকাশিত একটি তথাকথিত সংবাদের শিরোনাম ছিল “সংকটকালীন বাংলাদেশ,রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বই সমাধান”, যা সাইটটির স্পষ্ট দলীয় অবস্থান নির্দেশ করে। কেবল অপতথ্যই নয়, কুরুচিপূর্ণ ও অবমাননাকর ভাষার ব্যবহারও এখানে লক্ষণীয়। 


অপতথ্য ছড়ানো ও অপেশাদারিত্বের আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় “অবৈধ ইউনূস সরকারের কারণে জাতিসংঘ মিশনে সংকট, আন্তর্জাতিকভাবে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি চরম চাপে” শীর্ষক তথাকথিত সংবাদে। বাস্তবে তহবিল ঘাটতির কারণে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে এক চতুর্থাংশ ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু প্রতিবেদনে সেই সিদ্ধান্তের দায় কোনো সূত্র ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপানো হয় (বাংলাফ্যাক্টের বিশ্লেষণ দেখুন এখানে)।  একই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয় যে, ‘আয়না ঘর’ বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চালু হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু নিয়েও গুজবও ছড়িয়েছে দিনপত্র।


দিনপত্রের ফেসবুক পেইজে ফটোকার্ডের পাশাপাশি SA Sabbir নামের একজন আওয়ামীপন্থী কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বিভিন্ন  রিল পোস্ট  করা হয়। এসব রিলের ভাষা, ভঙ্গি ও উপস্থাপনা কোনোভাবেই সংবাদমাধ্যমের পেশাগত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং তা সাইটটির রাজনৈতিক প্রচারণামূলক চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে।


দোয়েল কণ্ঠ


৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ নিউজসাইটের আদলে বানানো এই ওয়েবসাইটটি নিবন্ধিত হয়। ওয়েবসাইটে বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ার আইকন থাকলেও সেগুলোতে কোনো লিংক দেয়া নেই। সাইটটিতে গত ২৮ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর ব্যাপক চাঁদাবাজি, শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা শিরোনামে একটি তথ্যসূত্রহীন ‘সংবাদ’ প্রকাশিত হয়। ২৫ ডিসেম্বরে একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল “হিন্দুদের জ্যান্ত পোড়ানোর পরিকল্পনা, জামায়াত-শিবিরের আগুনে তটস্থ বাংলাদেশ”। এটিতে তথাকথিত ‘সংবাদ’-এ কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র বা প্রমাণ নেই; বরং পুরো ওয়েবসাইট জুড়েই আতঙ্ক ছড়ানো, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও উসকানিমূলক বয়ানকে সংবাদরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে।


এটিতে খেলাধুলা নিয়ে একটি সেকশন রয়েছে, তবে তাতে কোনো সংবাদ নেই। বিনোদন ও বাণিজ্য সেকশনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের খবরাখবর নেই, বরং অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে নানান অপতথ্য ছড়ানো। যেমন, বাণিজ্য সেকশনের একটি সংবাদের শিরোনাম “গ্রামীণ টেলিকমের ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা ড: ইউনুসের”, এটিতে অভিযোগের সপক্ষে কোনো সূত্রের উল্লেখ নেই। 


সংবাদের ভাষা ও উপস্থাপনাতেও অপেশাদারিত্ব স্পষ্ট। “দখলদার ইউনুস”, “অবৈধ জামাতি ইউনুস”, “জুলাই দাঙ্গা” ইত্যাদি শব্দচয়ন, যা সাধারণত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক বয়ানে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোই এখানে সংবাদরূপে প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে স্পষ্ট যে, এই ওয়েবসাইট মূলত নিউজ সাইটের ছদ্মবেশে দলীয় প্রচারণা ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কাজ করছে।



অগ্নি শিখা 


২৫ অক্টোবর ২০২৫-এ চালু হয় অগ্নি শিখা ওয়েবসাইটটি। এটিতে কয়েকটি সোশাল মিডিয়ার আইকন দেয়া থাকলেও কোনো লিংক দেয়া নেই। ফেসবুকে সার্চ দিয়েও এটির পেইজ পাওয়া যায়নি, তবে “রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ” নামক একটি পেইজটি থেকে এই ওয়েবসাইটের লিংক শেয়ার দিতে দেখা যায়। 


ডাকসু নেত্রীর বাড়িতে হামলা, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নোবেল পুরস্কার, রমনা থানায় পুলিশের গাড়িতে আগুন, এবং আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে গ্রেপ্তার ইত্যাদি নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়েছে সাইটটিতে। এছাড়া এখান থেকে নিয়মিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বও ছড়ানো হয়। যেমন গত ১৭ ডিসেম্বর “ক্যান্টনমেন্টে হামলার পরিকল্পনা শিবিরের: গোপন ভার্চুয়াল বৈঠক” শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়, যার পুরোটাই মিথ্যা। খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেছেন এবং সরকার তা প্রকাশ করতে মানা করেছে, এমন দাবি করেও সাইটটিতে প্রতিবেদন  প্রকাশিত হয়।


রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ 


এটির ফেসবুক পেজে বর্তমানে ১ লাখ ১০ হাজার ফলোয়ার রয়েছে। এটি ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চালু করা হয়, আর ওয়েবসাইট চালু হয় চলতি বছরের ৩ নভেম্বরে। সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরী করা হলেও এর ‘সংবাদ’ বা প্রতিবেদনগুলোতে পেশাদারিত্বের কোনো ছাপ নেই। উদাহরণস্বরূপ, ২৬ নভেম্বর একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘স্ক্রিপ্ট দূর্বল! হরিনের এবং নৌকার সোনা এরকম সিলভার ঝালাই ক্যান? পিতলের উপর সোনালী রং হলেই সোনা হয়না রে পাগলা। একটা লকার বানাইতে ১৬ মাস লাগলো’। 


প্লাটফরমটি মৃত্যুর গুজব, ব্যক্তিগত জীবনের স্ক্যান্ডাল, গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টাদের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার মিথ্যা দাবি, এবং ভুয়া কোটেশন/সংবাদ ছড়াতে সক্রিয়। এটি থেকে ছড়ানো কয়েকটি অপতথ্য ও ফ্যাক্টচেক দেখুন এখানে।


সংগঠিত ক্যাম্পেইন


একাধিক ভুয়া নিউজ সাইট খুলে সংবাদের আদলে যেভাবে অপতথ্য ও দলীয় বয়ান প্রচার করা হচ্ছে, তা বাংলাদেশে নতুন। এর সঙ্গে ‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকালস’-এর মিল পাওয়া যায়। ২০২০ সালে EU DisinfoLab অনুসন্ধান করে দেখায় যে, বহির্বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপনের জন্য এবং পাকিস্তান, চীন ও কাশ্মীর ইস্যুতে নেতিবাচক প্রচার চালানোর জন্য ভারতের Srivastava Group ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে একটি অপতথ্য ক্যাম্পেইন চালায়। এর  অংশ হিসেবে ১১৬টি দেশে ৭৫০টির বেশি ফেইক মিডিয়া খোলা হয়েছিল। আওয়ামী লীগও অনুরূপভাবে দলীর প্রচার, নিজস্ব বয়ানের প্রচার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে অপতথ্য ছড়ানোর জন্য সোশাল মিডিয়ায় প্রচারণার পাশাপাশি বিভিন্ন ভুয়া নিউজ সাইট গড়ে তুলছে। পোর্টালের সংখ্যা আগামীতে বাড়তে পারে বলে ধারণা করা যায়।



বাংলাদেশের বর্তমান তথ্য–পরিসরে এটি একটি সংগঠিত অপতথ্য ক্যাম্পেইন, যেখানে গুজব, অপতথ্য ও দলীয় প্রচারণাকে “সংবাদ”, “আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন”, বা “মতামত” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আওয়ামী সমর্থকদের ছড়ানো বিভিন্ন গুজবের রেফারেন্স হিসেবে প্রায়ই এই পোর্টালগুলোকে দেখানো হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ছদ্মবেশে এগুলো সুপরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে অনেক সাধারণ পাঠকও না বুঝে অপতথ্যের বাহক হয়ে উঠছেন। 

পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, এসব প্লাটফরমের একটি থেকে অন্যটির পোস্ট শেয়ার দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এসব প্লাটফরমের আলোচনা অনুষ্ঠানে আসছেন, দলটির অফিসিয়াল পেইজগুলো ও নেতৃবৃন্দের ভেরিফায়েড একাউন্ট থেকে এসব ভুয়া নিউজসাইটের বিভিন্ন লিংক শেয়ার করা হচ্ছে। ফলে এগুলোকে নিছক ভুয়া সংবাদ পরিবেশনকারী প্ল্যাটফরম বলে মনে করার সুযোগ নেই; বরং এগুলোকে একটি সুগঠিত ও ধারাবাহিক ডিজইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।









Topics:



আপনার মতামত দিন

এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?

এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!

0%

0%

আপনার মতামত শেয়ার করুন:

| মন্তব্য সমূহ:

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!



ভুয়া নিউজসাইট খুলে অপতথ্য ছড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ

অনুসন্ধান

ভুয়া নিউজসাইট খুলে অপতথ্য ছড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ

৫ জানুয়ারী ২০২৬

<p>ভুয়া নিউজসাইট খুলে অপতথ্য ছড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ</p>

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রোপাগান্ডা, গুজব, ভুয়া-তথ্য ও অপতথ্যের নতুন এক ঢেউ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের ব্যবহার আগ থেকে চলে আসলেও, সম্প্রতি আরও সংগঠিত ও পদ্ধতিগত উপায়ে এর ব্যবহার হচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অনলাইনে গজিয়ে উঠেছে একসারি প্রোপাগান্ডা ওয়েবপোর্টাল ও ফেসবুক পেজ। এসবের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,  এসব ওয়েবপোর্টাল ও পেজের সাথে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা প্রবল এবং তাদের অন্যতম কাজ হচ্ছে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রোপাগান্ডা ও বয়ান ফেরি করে বেড়ানো। 

অনুমান করা যায়, স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর মাঠের রাজনীতি থেকে কার্যত অদৃশ্য হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ অপতথ্যকে তাদের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়। নিয়মিত ভুয়া তথ্য ছড়ানোর পাশাপাশি তাদের প্রচারিত অপতথ্য “বিশ্বাসযোগ্য” হিসেবে দেখানোর জন্য পরিচালনা করা হচ্ছে বিভিন্ন ছদ্মবেশী নিউজ পোর্টাল। কেবল, ভুয়া তথ্য ছড়িয়েই ক্ষান্ত দিচ্ছে না তারা, সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একের পর এক ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। 

বাংলাফ্যাক্ট এরকম অন্তত পনেরোটি  ওয়েবসাইটের খোঁজ পেয়েছে।  সজীব ওয়াজেদ জয়, এ টিম ও আওয়ামিলীগ সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল একাউন্ট থেকে  এসব পোর্টালের সংবাদ, মতামত নিয়মিত শেয়ার দেয়া হয়। । আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ও  সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকরাও এই ধরনের অপতথ্যে বিভ্রান্ত হোন। 


খেয়াল করার মতো বিষয়, প্রত্যেকটি সাইটই খোলা হয়েছে ৫ আগস্টের পর। এই লেখার উদ্দেশ্য হলো, ভুয়া নিউজসাইট খুলে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতাকে শনাক্ত করা, এবং সাইটগুলোর পরিচয় ও কার্যক্রম তুলে ধরে পাঠককে সচেতন করা।



বিডি ডাইজেস্ট


এই পোর্টালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে গড়া হয়েছে বিডি ডাইজেস্ট। সাধারণ একটি নিউজ পোর্টালের মতোই এটি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করে চলছে। এই সাইটটি ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট চালু হয়। যদিও এটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ খোলা হয়েছিল ২০২৩ সালে, যখন পেইজটির নাম ছিল ‘Edit lew Fan’s Bangladesh’। পরে তা Rubel Miah Official, একলা জীবন, ইত্যাদি নানা নামে পরিবর্তিত হয়। ৫ আগস্টের পর প্রথমে পেইজের নাম হয় ‘হিদায়েত’। ১৫ অক্টোবর  ২০২৪ থেকে বর্তমানে ‘BDDIGEST’ নামে চালু আছে। 


বিডি ডাইজেস্টের ফেসবুক পেইজের “পেইজ ট্রান্সপারেন্সি” থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ, জার্মানি, কানাডা ও সুইডেন থেকে পেইজটি পরিচালিত হয়। কানাডাপ্রবাসী আওয়ামী লীগ এক্টিভিস্ট কাজী মামুন এই পেজের একাধিক লাইভ ভিডিওতে হোস্ট হিসেবে ছিলেন। সাইটটির footer-এ লেখা আছে, A Global Justice Network Foundation Program; এই “গ্লোবাল জাস্টিস নেটওয়ার্ক”-এর ওয়েবসাইট পাওয়া গেলে সেখানে একটি প্রেস ব্রিফিং ছাড়া এ নামের সংগঠনটির কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। আওয়ামী এক্টিভিস্ট কাজী মামুন ফেসবুক ভিডিওতে নিজেকে এই ‘গ্লোবাল জাস্টিস নেটওয়ার্ক’-এর ডিরেক্টর পরিচয় দেন। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিডি ডাইজেস্ট উদ্যোগটির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা প্রতীয়মান হয়। কাজী মামুনের এই ‘গ্লোবাল জাস্টিস নেটওয়ার্ক’-এর কোনো স্বতন্ত্র ও যাচাইযোগ্য কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। Global Justice Network নামে আসলেই সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি আইনজীবী সংগঠন রয়েছে, যার ওয়েবসাইট globaljusticenetwork.com ডোমেইনে সক্রিয়। ডট কমের বদলে ডট অর্গ দিয়ে কাজী মামুনের নকল সংস্থাটির ডোমেইন globaljusticenetwork.org রাখা হয়েছে।


করিডর ও আরাকান ইস্যুতে অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে সাইটটি।  গত ২৫ এপ্রিল এটি “আরাকান আর্মিকে স্টারলিঙ্ক প্রযুক্তি সরবরাহে ইউনূস সরকারের গোপন তৎপরতা, শঙ্কায় জাতীয় নিরাপত্তা” শিরোনামে ভুয়া খবর পরিবেশন করে । ২৭ এপ্রিল “অবশেষে গোপনীয়তা ভেঙে রাখাইন যুদ্ধে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা নিয়ে মুখ খুললেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা” শিরোনামে বিকৃত উদ্বৃতি, উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিত উপস্থাপনের সাথে আরেকটি বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করে।  ৩০ এপ্রিল এক খবরের শিরোনাম ছিল “ঝুঁকিতে জাতীয় নিরাপত্তা: রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অন্ধকারে রেখে আরাকান আর্মির জন্য করিডোর”। ৩ মে প্রকাশিত এক খবরের শিরোনাম ছিল “সীমান্তে বাড়তে থাকা আরকান আর্মির আধিপত্যের মাঝে ‘মানবিক করিডর’ এর আড়ালে কি “প্রাণঘাতী মরণাস্ত্র” সরবরাহ হবে?”। এতে বলা হয় মরণাস্ত্র সরবরহারের আশংকাটি স্থানীয় জনগণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের, যদিও এর সপক্ষে কারো উদ্বৃতি দেয়নি তারা। ১৯ মে “যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সঙ্গে সেনাপ্রধানের বৈঠক: ‘মানবিক করিডর’ ইস্যুতে অটল জেনারেল ওয়াকার” শিরোনামে তারা আরেকটি বানোয়াট খবর প্রকাশ করে। বিভিন্ন সংবাদ ও মতামতে আওয়ামী লীগের বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ করে সাইটটি। যেমন ১০ জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত কয়েকটি সংবাদ ও মতামতে দাবি করা হয় যে, টিউলিপকে ‘ভিত্তিহীন মামলায়’ ফাঁসানো হয়েছে, কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করা হচ্ছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে প্রেস সচিব মিথ্যাচার করেছেন,  ইত্যাদি। 


২০২৪ সালে নূর হোসেন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ঘোষিত কর্মসূচির ইভেন্টসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ইভেন্ট বিডি ডাইজেস্টের পেইজ থেকে খোলা হয়েছিল। ফলে স্পষ্ট যে, নিউজ সাইটের ছদ্মবেশে অপতথ্য ও আওয়মী বয়ান ছড়ানোর উদ্দেশ্যে কাজী মামুনের নেতৃত্বে কাজ করছে বিডি ডাইজেস্ট।



The Voice


নিউজ সাইটের ছদ্মবেশে পরিচালিত ‘বিডি ডাইজেস্ট’ চালুর তিন দিন পরই, ১৮ আগস্ট ২০২৪-এ ‘দ্য ভয়েস’ নামের একটি ওয়েবসাইটের ডোমেইন নিবন্ধিত হয়। সাইটটির বিন্যাস আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মতো, এবং ফুটারে নিজেদের পরিচয়ে তারা লিখেছে: “Its primary focus is the diplomacy, politics, and policy of the USA and Bangladesh.” কিন্তু সাইটটিতে বাংলাদেশ–সম্পর্কিত সংবাদেরই আধিক্য চোখে পড়ে। ইংরেজিভাষী প্ল্যাটফর্ম হলেও এতে বাংলা ভাষায় পড়ার অপশনও রয়েছে।


এটির ২২ হাজার ফলোয়ার সম্বলিত ফেসবুক পেইজের ট্রান্সপারেন্সি থেকে দেখা যায়, এর দুজন এডমিন রয়েছেন, একজন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্যজন বাংলাদেশ থেকে। এছাড়া ১৩ হাজার সাবস্ক্রাইবারের ইউটিউব চ্যানেলেও বাংলা ভাষার ভিডিও আছে। অর্থাৎ, সাইটটি স্পষ্টতই বাংলাদেশ–কেন্দ্রিক এবং এর অডিয়েন্সও মূলত বাংলাদেশি।  



সাইটটির পরিচিতিতে লেখা আছে, এর সম্পাদক দস্তগীর জাহাঙ্গীর ও নির্বাহী সম্পাদক এ.জেড.এম সাজ্জাদ হোসেন। দস্তগীর জাহাঙ্গীর সময় টিভির সাবেক সাংবাদিক এবং হোয়াইট হাউজ প্রতিনিধি ছিলেন। নির্বাহী সম্পাদক এ.জেড.এম সাজ্জাদ হোসেন ২০২১ সাল থেকে গণ-অভ্যুত্থানের সময় পর্যন্ত ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার ছিলেন। এ দুজনই মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার রায়ের পর এই রায়ের বিপক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন, যা শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের অবস্থানের সঙ্গে তাঁদের একাত্মতা নির্দেশ করে।


অভ্যুত্থান চলাকালীন, ২৫ জুলাই ২০২৪-এ তিনি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দস্তগীর জাহাঙ্গীর প্রশ্ন করতে গিয়ে  বলেছিলেন, “ছাত্র আন্দোলনের নামে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলের জঙ্গি সদস্যরা ঢাকায় জড়ো হয়েছিল”। তাঁর প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বাংলাদেশ সরকারকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানালেও সময় টিভির প্রতিবেদনে দস্তগীর জাহাঙ্গির সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিলেন।


দস্তগীর জাহাঙ্গীর বর্তমানে Press Xpress নামে একটি গণমাধ্যমের হোয়াইট হাউজ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। প্রেস এক্সপ্রেস কিছুটা পুরোনো হলেও, এটিও The Voice এর মতো বাংলাদেশ সম্পর্কিত ভুয়া সংবাদ ও অপতথ্যে ভরপুর। ২০২০ সাল থেকে এটির ফেসবুক পেইজ এবং ২০২২ সাল থেকে এটির ইউটিউব চ্যানেল ও ওয়েবসাইট আওয়ামী লীগের ইংরেজি প্রোপাগান্ডা মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। প্রেস এক্সপ্রেসের ফেসবুক পেইজের ৭ জন এডমিন আছেন, যার ৫জনই বাংলাদেশ থেকে পেইজ পরিচালনা করেন। প্রেস এক্সপ্রেসের “যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো প্রধান” হিসেবে অভ্যুত্থানের পরেও তিনি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে আওয়ামী লীগের পক্ষ হয়ে অপতথ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রশ্ন অব্যাহত রেখেছেন। যেমন, ১৭ অক্টোবর ২০২৪-এ তিনি প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, আন্দোলন চলাকালীন বাংলাদেশে ৩ হাজারের বেশি পুলিশ নিহত হয়েছে, যা সম্পূর্ণই মিথ্যা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিহত পুলিশের সংখ্যা ছিল ৪৪। বিস্তারিত ফ্যাক্টচেক দেখুন এখানে। এ বছর ১৯ মার্চ প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি পুরনো একটি ছবিকে “গতকাল হিজবুত তাহরিরের মিছিল” দাবি করে প্রশ্ন করেন। দেখুন বাংলাফ্যাক্টের ফ্যাক্টচেক।

দ্যা ভয়েসের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, এতে পতিত আওয়ামী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের নামে অন্তত ৫টি কলাম রয়েছে। সাইটটিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে “ডিপস্টেটের ষড়যন্ত্র” হিসেবে আখ্যা দিয়ে Deepanwita Roy Martin নামে একজনের মতামত পাওয়া যায়। দ্বীপান্তিতা রায় মার্টিন একজন অভিনেত্রী, যিনি গণ-অভ্যুত্থানের সময় আলোচিত “আলো আসবেই” গ্রুপের সদস্য ছিলেন। তাঁর ফেসবুক একাউন্টে লেখা আছে, তিনি দ্যা ভয়েসে কাজ করেন।  তিনি আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ ও অন্যান্য পেইজ থেকে নিয়মিত লাইভ আলোচনায় হোস্ট হিসেবে অংশ নেন। 

গত ১৩ নভেম্বর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছবি দিয়ে আওয়ামী লীগের কথিত লকডাউন প্রচার করে একটি সংবাদ প্রকাশ করে সাইটটি। এ সময় ফেসবুক পেইজে এই কর্মসূচির পক্ষে প্রচারণা চালিয়েও পোস্ট দেয়। অর্থাৎ দ্যা ভয়েস কেবল আওয়ামী লীগের হয়ে অপপ্রচার নয়, বরং দলীয় প্রচারের কাজও করে।




এসব তথ্য ও সংশ্লিষ্টতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ছদ্মবেশ নেওয়া “দ্য ভয়েস” মূলত আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকদের দ্বারা পরিচালিত একটি অপতথ্যভিত্তিক ভুয়া নিউজসাইট।


নাউ বাংলাদেশ


‘নাউ বাংলাদেশ’ নামের একটি ওয়েবসাইট ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর নিবন্ধিত হয়। নিউজ সাইটের আদলে তৈরি সাইটটিতে “ইসলামী শাসনের নামে ভোটের রাজনীতি, গণতন্ত্র না কি উগ্র মতাদর্শের পথে বাংলাদেশ!” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের আরেকটি ভুয়া নিউজসাইট Untold BD তে ইংরেজিতে একই শিরোনাম ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা একাধিক প্রোপাগান্ডামাধ্যমের পারস্পরিক সংযোগের ইঙ্গিত দেয়।


তারেক রহমানকে প্রটোকল দেওয়ার জন্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে—এমন একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব কোনো ধরনের তথ্যসূত্র ছাড়াই সংবাদের আদলে সাইটটিতে প্রকাশ করা হয়। একই হত্যাকাণ্ডের দায় আরেকটি প্রতিবেদনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের ওপর চাপানো হয়।


ফেসবুকে সাইটটির কোনো পেইজ পাওয়া যায়নি। তবে এক্সে একটি অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে, যা ভারত থেকে পরিচালিত হচ্ছে।



The Asia Post


২৫ অক্টোবর ২০২৪-এ ওয়ার্ডপ্রেসের ফ্রি থিম ব্যবহার করে “দ্য এশিয়া পোস্ট” নামের একটি ওয়েবসাইট খোলা হয়। সাইটটির নামকরণ এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে এটি একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলে মনে হয়। সাইটটির ‘About’ অংশে লেখা আছে, “unfiltered news from South Asia and the rest of the world”; তবে ইংরেজি ভাষার এই সাইটে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত প্রায় সব সংবাদই বাংলাদেশ–সম্পর্কিত। সেনা অভ্যুত্থান, জঙ্গিবাদ, সীমান্ত ইস্যু এবং দুর্নীতিতে বাইনান্স অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের মতো বিভিন্ন বিষয়ে সাইটটি ভিত্তিহীন ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছে।উদাহরণস্বরূপ, Bangladesh Interim Government Officials Accused of Corruption: Bribes and Illicit Funds Stashed in Bitcoin শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, উপদেষ্টা ও ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে বাইনান্স অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ভুয়া খবর প্রকাশ করা হয়। এসব অ্যাকাউন্টের ভুয়া স্ক্রিনশটও সাইটটিতে ব্যবহার করা হয়। সজীব ওয়াজেদ জয় এটি ফেসবুকে পোস্ট করে পরে ডিলিট করে দেন। এ বছর ২৯ মে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে লস্কর ই তাইয়েবা যুক্ত ছিল মর্মে একটি বানোয়াট খবর প্রকাশ করে দ্য এশিয়া পোস্ট। এটিও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ফেসবুক ও টুইটারে ব্যাপকভাবে শেয়ার করেন।


সাইটটির কোনো ফেসবুক বা সোশাল মিডিয়া পেজ নেই। সজীব ওয়াজেদ জয়সহ আওয়ামী লীগের লোকজন প্রায়ই এটির বিভিন্ন লিংক শেয়ার করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেন। “ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া” হিসেবে আখ্যা দিয়েও সোর্স হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মহিত উর রহমান শান্ত বিনান্স একাউন্ট সম্পর্কিত ভুয়া সংবাদটিকে “বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতি কেলেঙ্কারিগুলি” প্রমাণ আখ্যা দিয়ে ফেসবুক পোস্ট দিয়েছিলেন। গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে সাইটটিকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া, ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্ট ইত্যাদি আখ্যা দিয়েও সোর্স হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ৪ জুন ২০২৫-এর পর থেকে সাইটটিতে আর কোনো নতুন কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়নি।


মুক্তিবার্তা৭১


মুক্তিবার্তা৭১ নামে এ বছর জানুয়ারিতে একটি ফেসবুক পেইজ ও ওয়েবসাইট চালু করা হয়, যার মোটো “প্রতিদিনের সত্য খবরের প্রত্যয়ে”। এটির ফেইসবুক পেইজের কনটেন্ট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এখানে নিয়মিতভাবে শেখ হাসিনার বাণী, বক্তব্য ও দলীয় বয়ানভিত্তিক কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ফটোকার্ডে লেখা হয়েছে, “নীতি আদর্শ নিয়ে পথ চলবে, নীতি আদর্শ যদি ঠিক থাকে, লক্ষ্য যদি স্থির থাকে—যেকোনো দুর্যোগ অতিক্রম করে অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। শেখ হাসিনা।” আরেকটি ফটোকার্ডে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে লেখা হয়েছে, “জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে কারাগারে বাকপ্রতিবন্দী সাইদ, পাশে আছে স্বয়ং জননেত্রী শেখ হাসিনা।” এসব ক্ষেত্রে ফটোকার্ড প্রকাশ করা হলেও সংশ্লিষ্ট খবরের লিংক বা বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।


১৩ই জানুয়ারি ২০২৫-এ এটির ফেসবুক পেইজ খোলা হয়। এটির ওয়েবসাইটের ডোমেইন muktibarta71.com যা ১ আগস্ট ২০২৫-এ চালু করা হয়। তবে সাইটে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের সংবাদও প্রকাশিত রয়েছে, যা নির্দেশ করে যে কিছু সংবাদ ব্যাকডেটে পোস্ট করা হয়েছে।


১ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সাইটটিতে “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের গুলিতে শিশু ইফতি নিহত” নামে একটি ভুয়া খবর প্রকাশিত হয়। ২৭ আগস্ট দেখা যায় “জুলাই আন্দোলনে স্নাইপার—শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিবিয়া মডেল” শিরোনামে এক সংবাদ, যাতে সংবাদ হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো উপাদানই নেই। সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব শেয়ার করে থাকে পোর্টালটির ফেসবুক পেইজ। যেমন, ৭ অক্টোবর ২০২৫-এ একটি পোস্টে বলা হয়, “ইউনুস সরকারের ৫ জন উপদেষ্ঠা এখন পর্যন্ত জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে যোগাযোগ করে ক্ষমা চেয়েছেন এবং সেইফ এক্সিট দেওয়ার অনুরোধ করেছেন!”


পোর্টালটির প্রকাশিত সংবাদ ও মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর কনটেন্ট ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগের দলীয় বয়ানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ৪ অক্টোবর প্রকাশিত একটি লেখার শিরোনাম ছিল, “ষড়যন্ত্রকারীদের পরাজয় অনিবার্য, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন অবধারিত।” এসব তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, মুক্তিবার্তা৭১ মূলত আওয়ামী লীগপন্থী প্রচারণামূলক কনটেন্ট ছড়ানোর একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যা নিয়মিতভাবে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে দলীয় বয়ান প্রচার করে।



VORTEX


গত ৩ মার্চ ২০২৫-এ খোলা হয়েছে ভরটেক্স নামক একটি সাইট। এটিকেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মতো রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যদিও এর ডোমেইনে bdvortex রয়েছে। সাইটের মেনুতে ‘South East Asia’ নামে একটি সেকশন থাকলেও, সেখানে প্রকাশিত সংবাদসমূহের প্রায় সবই বাংলাদেশ–কেন্দ্রিক। যদিও বাংলাদেশ সাউথ ইস্ট এশিয়ার অন্তর্ভূক্ত নয়। এটিতেও সেনাবাহিনী, মিয়ানমার, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে শতাধিক বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া তথ্য সম্বলিত পোস্ট পাওয়া গেছে। 


করিডর ইস্যুর জের ধরে মিয়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে “অবাঞ্ছিত” ঘোষণা করা হয়েছে মর্মে ভুয়া খবরটি এই সাইট থেকে প্রচারিত হয়েছিল। বাংলাদেশ ছায়াযুদ্ধে আছে, এমন বিভ্রান্তিকর বয়ানও ছড়িয়েছে সাইটটি।


১৬ জুন  ২০২৫-এ এটির প্রকাশিত এক খবরে  “Sources close to the British government”-এর এক বায়বীয় সূত্রের বরাতে উল্লেখ করা হয় আওয়ামী লীগ নিষদ্ধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জের ধরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেননি। ৮০% জনগণ ড. ইউনূসের নেতৃত্ব চায় না, এমন একটি ভুয়া সংবাদ ১৩ জুন এই সাইটে প্রকাশিত হয়, এতে কোনো জরিপের তথ্য, বা সূত্র কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।


ওয়েবসাইটটির footer-এ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আইকন থাকলেও সেখানে কোনো লিংক দেয়া নেই। এক্স-এ এটির একটি একাউন্ট পাওয়া যায়, যা আওয়মীলীগের অফিসিয়াল পেইজ থেকে ফলো করা হয়। এক্স-এর About this account থেকে দেখা যায়, এই একাউন্টট ভারত থেকে পরিচালিত। এটির প্রচারও সজীব ওয়াজেদ জয়সহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও এক্টিভিস্টদের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ছড়ানো হয়, পরে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা তা ছড়িয়ে দেয়।


Untold BD


এই ওয়েবসাইট চালু হয় ২০২৫ এর ১৫ মার্চে। ইংরেজি ভাষার এই সাইটটির এক্স হ্যান্ডেলটি ভারত থেকে পরিচালিত হয়। এটির মাত্র ৭ জন ফলোয়ার রয়েছে। Human Rights Updates 🇧🇩 নামে একটি হ্যান্ডেল থেকে আনটোল্ড বিডি’র পোস্ট নিয়মিত শেয়ার করা হয়, নামের মধ্যে বাংলাদেশ থাকলেও এটিও ভারত থেকে পরিচালিত। 


১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কিছু আওয়মীপন্থী গ্রুপ বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন এখানে)। এUntold BD-ও এই প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অংশ হিসেবে আক্রমণের জন্য জামায়াতকে দায়ী করে ‘সংবাদ’ প্রকাশ করে, যাতে কোনো তথ্যসূত্র নেই। আরেকটি সংবাদে মাইকেল চাকমার গুমের ঘটনাকে ভুয়া বলে দাবি করে, তিনি জামায়াতের অর্থায়নে সরকার পতনের সহিংস নকশা বাস্তবায়নে যুক্ত ছিলেন মর্মে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের July conspirators, গণ-অভ্যুত্থানকে Coup আখ্যা দিয়ে এটিতে ‘সংবাদ’ প্রকাশ করা হয়, যা আওয়ামী লীগের বয়ানেরই অনুরূপ। 


Bangladesh Perspectives


এক্সে যেসব আইডি থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে সক্রিয়ভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানো হয়, Bangladesh Perspectives তার একটি, যা ভারত থেকে পরিচালিত হয়। ২৮ এপ্রিল, ২০২৫ এটি ওয়বসাইট  চালু করে এবং তা ধীরে ধীরে একটি নিউজ সাইটের রূপ নেয়। সাইটটির পরিচিতি অংশে লেখা রয়েছে, এটি “one of the leading online news portal to display the policies and opinions about Bangladeshi people.” কিন্তু সাইটে প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদন বা মতামতের সঙ্গে লেখকের নাম থাকে না, যা এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। 


পোর্টালটি অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপিকে ঘিরে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডায় পরিপূর্ণ। যদিও এটি চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে চালু হয়েছে,বিভিন্ন সংবাদে ২০২৪ সালের শুরুর সময় দেখানো হয়েছে। যেমন, Yunus ‘s plot to forcibly occupy eight companies owned by 10.05 million members of Grameen Bank শিরোনামে একটি ভুয়া খবরের প্রকাশ-তারিখ দেখানো হয়েছে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। দেখে মনে হতে পারে, সাইটটি বহু আগে থেকেই চালু ছিল এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেরও আগেই ড. ইউনূসকে নিয়ে এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তবে প্রকৃত সত্য হলো, ওয়ার্ডপ্রেস প্ল্যাটফর্মে সহজেই যেকোনো পোস্টের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া যায়; অর্থাৎ, আজ লেখা প্রকাশ করলেও সেটিকে আগের যেকোনো তারিখে প্রদর্শন করা সম্ভব। একই কায়দায় State Dept concerned over arrests but mum on BNP’s arson terrorism শিরোনামের এক খবরের প্রকাশ-তারিখ দেখানো হয়েছে ৩১ জানুয়ারি ২০২৪। সংবাদটি সময় টিভির একটি সংবাদ  থেকে সম্পূর্ণ নকল করা। ডোমেইন রেজিস্ট্রেশন যাচাইকরণ টুল Whois ব্যবহার করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সাইটটি ২৮ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে নিবন্ধিত হয়েছে।


The Daily Republic

 

২৭ মে চালু হয়েছে দ্যা ডেইলি রিপাবলিক নামে আরেকটি ভুয়া নিউজ সাইট।  এটির ফেসবুক পেইজ খোলা হয় ১ জুন। ১৫ জুন “Kaler Kantho forced to delete news story on Yunus’ tax evasion” শিরোনামে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়, কালের কণ্ঠকে একটি সংবাদ ডিলিট করতে বাধ্য করা হয়েছে, কিন্তু দাবির সপক্ষে কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি। শেখ হাসিনার উক্তি, নির্দেশনা ইত্যাদি দলীয় প্রচারমাধ্যমের মতোই প্রকাশ করে চলছে সাইটটি।  জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারকে mockery of justice উল্লেখ করেও ‘সংবাদ’ প্রকাশ করেছে এটি। 

সাইটটির ‘অপিনিয়ন’ সেকশনে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৯টি আর্টিকেল পাওয়া গেছে যার ৫টিতেই লেখকের নামের উল্লেখ নেই। ৩ জুন ২০২৫-এ প্রকাশিত “Rakhine Corridor: Possibilities and challenges” শিরোনামে ড. রাহমান নাসির উদ্দিনের নামে একটি লেখা পাওয়া যায়। বাংলাফ্যাক্ট যাচাই করে দেখেছে, মূল লেখাটি ঢাকা ট্রিবিউনে A humanitarian corridor for Rakhine? Dissecting the potentials and challenges শিরোনামে ৮ মে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখক বাংলাফ্যাক্টকে জানিয়েছেন, তিনি “ডেইলি রিপাবলিক” নামক সাইটে প্রকাশের জন্য কোনো লেখা দেননি। সাইটটি মূল লেখার শিরোনাম ও বিভিন্ন অংশ পরিবর্তন করে লেখকের অনুমতি ছাড়াই লেখাটি প্রকাশ করেছে। 


মজার ব্যাপার হলো, প্রোপাগান্ডা সাইটটির একটি ‘ফ্যাক্টচেক’ সেকশনও রয়েছে। ১৫ জুন প্রকাশিত এক “ফ্যাক্টচেক”-এর শিরোনাম ছিল “Did BNP’s Salahuddin Ahmed stage his own disappearance?” । অবশ্য এটি কোনো অর্থেই ফ্যাক্টচেকের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পড়ে না। এখানে কোনো ফ্যাক্টচেক করা হয়নি বরং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম হওয়ার দাবির বিপরীতে এতে উল্লেখ করা হয়েছে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বক্তব্য। 


ডেইলি রিপাবলিক নিয়মিত বিভিন্ন আলোচনার আয়োজন করে যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত থাকে। একটি “আলোচনা অনুষ্ঠানে” আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অংশ নেন, যা আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল পেইজ থেকে শেয়ার দেয়া হয়। অনুরূপভাবে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সাথে আলোচনাও দলটির অফিসিয়াল পেইজ থেকে শেয়ার দেয়া হয়। 



বাংলাদেশ ইনসাইট


১৯ জুন ২০২৫-এ নিবন্ধিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ইনসাইট’ নামক আরেকটি ভুয়া পোর্টালের ডোমেইন। এর ফেসবুক পেইজ বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত হয়। এক্স-এ এটি বেশ সক্রিয় এবং ভেরিফায়েড। এক্স একাউন্টে গেলে দেখা যায়, প্লাটফর্মটিতে এটি ২০২৪-এর আগস্টে যুক্ত হয়েছে। ওয়েবসাইট খোলার আগ পর্যন্ত এটি দ্য ডেইলি রিপাবলিকের পোস্ট নিয়মিতভাবে রিপোস্ট করেছে। এর থেকে বোঝা যায় যে, ভুয়া নিউজসাইটগুলো পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত এবং সংগঠিত। এক্স একাউন্টটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত বলে দেখা যায়।


ওয়েবসাইটিতে গেলেই দেখা যায় ‘ইউনূস গং’ সেনাবাহিনী ধ্বংস করছে, আরকানে আর্মিকে অস্ত্র দিচ্ছে, জঙ্গি রাষ্ট্র তৈরি করছে, পিলখানার হত্যাকারীদের মুক্তি দিচ্ছে, পার্বত্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, এমনসব মনগড়া উস্কানিমূলক ‘সংবাদে’ এটি ভরপুর। এটির ইপেপার নামে একটা সেকশন থাকলেও বাস্তবে কোনো ইপেপার ভার্সন নেই। গণমাধ্যমের ছদ্মবেশ নেয়া সাইটটিতে একটি ফোন নাম্বার দেয়া আছে, যেটি চালু নেই। একটি ঠিকানাও দেয়া আছে, তবে ওই ঠিকানার ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে সেখানে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে, বাংলাদেশ ইনসাইটস বা কোনো গণমাধ্যমের কোনো অফিস নেই। অর্থাৎ পাঠকের কাছে কাছে বিশ্বাসযোগ্য দেখানোর জন্য ফোন নাম্বার এবং ঠিকনা দেয়া হলেও, সেগুলো মূলত ভূয়া।


দৈনিক আজকের কণ্ঠ


Daily Ajker Kantho নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে নিয়মিত ফটোকার্ড এবং ভিডিও পোস্ট করা হয়। এর ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয় নানান ‘খবর’। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এটি কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যম। এটির পেইজ ও ওয়েবসাইটে ই-পেপারের ছবি দেয়া আছে, যাতে মনে হতে পারে এটি কোনো প্রিন্ট গণমাধ্যম। আদতে এই পোর্টালটির কোনো ইপেপার বা প্রিন্ট ভার্সন নেই। 

বাংলাদেশ, ভারত, ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত পেইজটির সাম্প্রতিক কিছু পোস্ট পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে বেশ কিছু ভুয়া তথ্য খুঁজে পেয়েছে বাংলাফ্যাক্ট টিম। গত ৫ জুলাই ২০২৫-এ আলোচিত পেইজটি থেকে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে দাবি করা হয়, মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,  ‘শেখ হাসিনার মতো ডায়নামিক লিডার বিরল।’ তবে সে দাবির সত্যতা খুঁজে পায়নি বাংলাফ্যাক্ট। মাহাথির মোহাম্মদ শেখ হাসিনার প্রশংসার করেছেন, এমন দাবির সপক্ষে গণমাধ্যম বা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। গত ১৭ জুলাই আলোচিত পেইজটি থেকে ‘বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের জবাব কে দেবে?’ ক্যাপশনে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। সেখানে দেখা যায়, অচেতন অবস্থায় এক যুবককে দুই পুলিশ সদস্য পুলিশ ভ্যানে তুলছেন। ভিডিওটি ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জের ঘটনা বলে দাবি করা হলেও যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি গত ৪ জুন, ২০২৫ থেকে ইন্টারনেটে রয়েছে। অর্থাৎ, ভিডিওটি পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার।

এছাড়াও, গত ৮ আগস্ট ‘আর নেই সাংবাদিক আনোয়ার, পুলিশের সামনেই যাকে পিটিয়েছিল চাঁদাবাজরা’ শীর্ষক শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রচার করে দাবি করা হয়, গাজীপুরে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় পুলিশের উপস্থিতিতেই একদল দুর্বৃত্তের হাতে নির্মমভাবে প্রহৃত সেই সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন মারা গেছেন। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, গত ৬ আগস্ট গাজীপুরের সাহাপাড়া এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বেধড়ক মারধরের শিকার দৈনিক বাংলাদেশের আলো পত্রিকার রিপোর্টার আনোয়ার হোসেন মারা যাননি। তিনি জীবিত আছেন বলে গাজীপুর সদর থানার ওসি মেহেদি হাসান বাংলাফ্যাক্টকে নিশ্চিত করেছেন।

এটির ফেসবুক পেইজ খোলা হয় ২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল। প্রাথমিকভাবে এটি শুধু ফটোকার্ড প্রচারের কাজ করত।  ছদ্মবেশী এই গণমাধ্যমের ফটোকার্ডগুলো দেখতে প্রফেশনাল, ফলে অনেকে না বুঝেও এই পেইজের ফটোকার্ড শেয়ার করে থাকেন যা বিভ্রান্তি ছড়ায়। এটির ওয়েবসাইট চালু হয় এ বছরের ৩১শে জুলাই। উল্লেখ্য, আজকের কণ্ঠ নামে https://ajkerkantho.com ডোমেইনে একটি সাধারণ নিউজ পোর্টালের সন্ধান পাওয়া যায়, যা ২০২১ সাল থেকে চালু আছে। “দৈনিক আজকের কণ্ঠ” নামক আলোচিত ভুয়া পোর্টালটির ডোমেইন https://www.dainikajkerkantho.com/


দিনপত্র


৪ আগস্ট ২০২৫-এ নিবন্ধিত হয় দিনপত্র নামক ওয়েবসাইট। অন্যান্য ভুয়া নিউজসাইটের মতো এখানেও নিয়মিতভাবে অপতথ্য ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে। নভেম্বরে প্রকাশিত একটি তথাকথিত সংবাদের শিরোনাম ছিল “সংকটকালীন বাংলাদেশ,রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বই সমাধান”, যা সাইটটির স্পষ্ট দলীয় অবস্থান নির্দেশ করে। কেবল অপতথ্যই নয়, কুরুচিপূর্ণ ও অবমাননাকর ভাষার ব্যবহারও এখানে লক্ষণীয়। 


অপতথ্য ছড়ানো ও অপেশাদারিত্বের আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় “অবৈধ ইউনূস সরকারের কারণে জাতিসংঘ মিশনে সংকট, আন্তর্জাতিকভাবে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি চরম চাপে” শীর্ষক তথাকথিত সংবাদে। বাস্তবে তহবিল ঘাটতির কারণে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে এক চতুর্থাংশ ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু প্রতিবেদনে সেই সিদ্ধান্তের দায় কোনো সূত্র ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপানো হয় (বাংলাফ্যাক্টের বিশ্লেষণ দেখুন এখানে)।  একই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয় যে, ‘আয়না ঘর’ বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চালু হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু নিয়েও গুজবও ছড়িয়েছে দিনপত্র।


দিনপত্রের ফেসবুক পেইজে ফটোকার্ডের পাশাপাশি SA Sabbir নামের একজন আওয়ামীপন্থী কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বিভিন্ন  রিল পোস্ট  করা হয়। এসব রিলের ভাষা, ভঙ্গি ও উপস্থাপনা কোনোভাবেই সংবাদমাধ্যমের পেশাগত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং তা সাইটটির রাজনৈতিক প্রচারণামূলক চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে।


দোয়েল কণ্ঠ


৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ নিউজসাইটের আদলে বানানো এই ওয়েবসাইটটি নিবন্ধিত হয়। ওয়েবসাইটে বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ার আইকন থাকলেও সেগুলোতে কোনো লিংক দেয়া নেই। সাইটটিতে গত ২৮ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর ব্যাপক চাঁদাবাজি, শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা শিরোনামে একটি তথ্যসূত্রহীন ‘সংবাদ’ প্রকাশিত হয়। ২৫ ডিসেম্বরে একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল “হিন্দুদের জ্যান্ত পোড়ানোর পরিকল্পনা, জামায়াত-শিবিরের আগুনে তটস্থ বাংলাদেশ”। এটিতে তথাকথিত ‘সংবাদ’-এ কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র বা প্রমাণ নেই; বরং পুরো ওয়েবসাইট জুড়েই আতঙ্ক ছড়ানো, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও উসকানিমূলক বয়ানকে সংবাদরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে।


এটিতে খেলাধুলা নিয়ে একটি সেকশন রয়েছে, তবে তাতে কোনো সংবাদ নেই। বিনোদন ও বাণিজ্য সেকশনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের খবরাখবর নেই, বরং অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে নানান অপতথ্য ছড়ানো। যেমন, বাণিজ্য সেকশনের একটি সংবাদের শিরোনাম “গ্রামীণ টেলিকমের ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা ড: ইউনুসের”, এটিতে অভিযোগের সপক্ষে কোনো সূত্রের উল্লেখ নেই। 


সংবাদের ভাষা ও উপস্থাপনাতেও অপেশাদারিত্ব স্পষ্ট। “দখলদার ইউনুস”, “অবৈধ জামাতি ইউনুস”, “জুলাই দাঙ্গা” ইত্যাদি শব্দচয়ন, যা সাধারণত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক বয়ানে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোই এখানে সংবাদরূপে প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে স্পষ্ট যে, এই ওয়েবসাইট মূলত নিউজ সাইটের ছদ্মবেশে দলীয় প্রচারণা ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কাজ করছে।



অগ্নি শিখা 


২৫ অক্টোবর ২০২৫-এ চালু হয় অগ্নি শিখা ওয়েবসাইটটি। এটিতে কয়েকটি সোশাল মিডিয়ার আইকন দেয়া থাকলেও কোনো লিংক দেয়া নেই। ফেসবুকে সার্চ দিয়েও এটির পেইজ পাওয়া যায়নি, তবে “রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ” নামক একটি পেইজটি থেকে এই ওয়েবসাইটের লিংক শেয়ার দিতে দেখা যায়। 


ডাকসু নেত্রীর বাড়িতে হামলা, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নোবেল পুরস্কার, রমনা থানায় পুলিশের গাড়িতে আগুন, এবং আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে গ্রেপ্তার ইত্যাদি নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়েছে সাইটটিতে। এছাড়া এখান থেকে নিয়মিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বও ছড়ানো হয়। যেমন গত ১৭ ডিসেম্বর “ক্যান্টনমেন্টে হামলার পরিকল্পনা শিবিরের: গোপন ভার্চুয়াল বৈঠক” শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়, যার পুরোটাই মিথ্যা। খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেছেন এবং সরকার তা প্রকাশ করতে মানা করেছে, এমন দাবি করেও সাইটটিতে প্রতিবেদন  প্রকাশিত হয়।


রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ 


এটির ফেসবুক পেজে বর্তমানে ১ লাখ ১০ হাজার ফলোয়ার রয়েছে। এটি ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চালু করা হয়, আর ওয়েবসাইট চালু হয় চলতি বছরের ৩ নভেম্বরে। সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরী করা হলেও এর ‘সংবাদ’ বা প্রতিবেদনগুলোতে পেশাদারিত্বের কোনো ছাপ নেই। উদাহরণস্বরূপ, ২৬ নভেম্বর একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘স্ক্রিপ্ট দূর্বল! হরিনের এবং নৌকার সোনা এরকম সিলভার ঝালাই ক্যান? পিতলের উপর সোনালী রং হলেই সোনা হয়না রে পাগলা। একটা লকার বানাইতে ১৬ মাস লাগলো’। 


প্লাটফরমটি মৃত্যুর গুজব, ব্যক্তিগত জীবনের স্ক্যান্ডাল, গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টাদের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার মিথ্যা দাবি, এবং ভুয়া কোটেশন/সংবাদ ছড়াতে সক্রিয়। এটি থেকে ছড়ানো কয়েকটি অপতথ্য ও ফ্যাক্টচেক দেখুন এখানে।


সংগঠিত ক্যাম্পেইন


একাধিক ভুয়া নিউজ সাইট খুলে সংবাদের আদলে যেভাবে অপতথ্য ও দলীয় বয়ান প্রচার করা হচ্ছে, তা বাংলাদেশে নতুন। এর সঙ্গে ‘ইন্ডিয়ান ক্রনিকালস’-এর মিল পাওয়া যায়। ২০২০ সালে EU DisinfoLab অনুসন্ধান করে দেখায় যে, বহির্বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপনের জন্য এবং পাকিস্তান, চীন ও কাশ্মীর ইস্যুতে নেতিবাচক প্রচার চালানোর জন্য ভারতের Srivastava Group ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে একটি অপতথ্য ক্যাম্পেইন চালায়। এর  অংশ হিসেবে ১১৬টি দেশে ৭৫০টির বেশি ফেইক মিডিয়া খোলা হয়েছিল। আওয়ামী লীগও অনুরূপভাবে দলীর প্রচার, নিজস্ব বয়ানের প্রচার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে অপতথ্য ছড়ানোর জন্য সোশাল মিডিয়ায় প্রচারণার পাশাপাশি বিভিন্ন ভুয়া নিউজ সাইট গড়ে তুলছে। পোর্টালের সংখ্যা আগামীতে বাড়তে পারে বলে ধারণা করা যায়।



বাংলাদেশের বর্তমান তথ্য–পরিসরে এটি একটি সংগঠিত অপতথ্য ক্যাম্পেইন, যেখানে গুজব, অপতথ্য ও দলীয় প্রচারণাকে “সংবাদ”, “আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন”, বা “মতামত” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আওয়ামী সমর্থকদের ছড়ানো বিভিন্ন গুজবের রেফারেন্স হিসেবে প্রায়ই এই পোর্টালগুলোকে দেখানো হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ছদ্মবেশে এগুলো সুপরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে অনেক সাধারণ পাঠকও না বুঝে অপতথ্যের বাহক হয়ে উঠছেন। 

পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, এসব প্লাটফরমের একটি থেকে অন্যটির পোস্ট শেয়ার দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এসব প্লাটফরমের আলোচনা অনুষ্ঠানে আসছেন, দলটির অফিসিয়াল পেইজগুলো ও নেতৃবৃন্দের ভেরিফায়েড একাউন্ট থেকে এসব ভুয়া নিউজসাইটের বিভিন্ন লিংক শেয়ার করা হচ্ছে। ফলে এগুলোকে নিছক ভুয়া সংবাদ পরিবেশনকারী প্ল্যাটফরম বলে মনে করার সুযোগ নেই; বরং এগুলোকে একটি সুগঠিত ও ধারাবাহিক ডিজইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।