| এক্সপ্লেইনার | এক্সপ্লেইন
জাতিসংঘ কখন কোন অবস্থায় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায়
৭ জানুয়ারী ২০২৬
গত ৫ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক পাঠাবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে জানান, “না। সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেট ছাড়া জাতিসংঘ নিজে থেকে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায় না। ফলে আমরা এখন আর এটি করি না।” এ বিষয়ের সংবাদকে কিছু গণমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন বাংলাদেশে পর্যবেক্ষক পাঠানোর কথা ছিল, কিন্তু কোনো কারণে পাঠাচ্ছে না। আওয়ামীপন্থীরা এটির সাথে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার প্রসঙ্গ জুড়ে দিয়ে নানান অপব্যাখ্যা হাজির করছে।
জাতিসংঘ আগে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের মতো কাজগুলো করলেও বর্তমানে সাধারণত নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কাজ করে না। কেবল নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদের ম্যান্ডেট থাকলে কোনো দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে। দুজুরিক বলেছেন, “আমরা এখন আর এটি (নির্বাচন পর্যবেক্ষণ) করি না।” ২০১২ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি নথিতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ আছে, “সাধারণভাবে, অন্যান্য সংস্থাগুলো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, আর জাতিসংঘ এই কর্মকাণ্ড থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে।” জাতিসংঘের এই ধরনের কাজকে "খুবই বিরল" হিসেবে উল্লেখ করা হয় আরেকটি নথিতে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে দুজারিক আরও বলেন, “নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কান্ট্রি অফিস প্রায়ই কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে। তারা এ ধরনের কোনো সহায়তা দিচ্ছে কি না, তা আমি আপনাদের জেনে জানাতে পারি।” জাতিসংঘের নথিতে উল্লেখ আছে, “স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর জন্য, যেসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নির্বাচন সংক্রান্ত কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে, সেসব ক্ষেত্রে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা উচিত নয়। শুধুমাত্র তখনই উভয় কার্যক্রম একসাথে পরিচালনা করা যায় যদি তা বিশেষভাবে সাধারণ পরিষদ এবং/অথবা নিরাপত্তা পরিষদের দ্বারা অনুমোদিত হয় এবং জাতিসংঘের দুটি ভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তার কাজ আলাদাভাবে সম্পন্ন করে।” দুজারিক যেহেতু বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে কারিগরি সহায়তার সম্ভাবনার কথা বলেছেন, ফলে নীতি অনুযায়ী জাতিসংঘের এখানে পর্যবেক্ষণ না করাই স্বাভাবিক।
জাতিসংঘের বৈশ্বিকভাবে “নির্বাচন পর্যবেক্ষণ” কার্যক্রম থেকে ক্রমাগত সরে আসার নীতির কারণে ও সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেটের বাধ্যবাধকতার কারণে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল না-পাঠানোই স্বাভাবিক। কিছু গণমাধ্যমে এমনভাবে এ সংক্রান্ত খবর উপস্থাপন করা হচ্ছে, যার ফলে পাঠক এটিকে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘের নেতিবাচক মনোভাব হিসেবে পাঠ করতে পারেন। যদিও বিষয়টি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার সাথে সম্পর্কিত নয়। যেমন, দেশ রূপান্তর আশ্চর্যবোধক চিহ্নসহ শিরোনাম করেছে “নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না জাতিসংঘ!”। তবে কয়েকটি গণমাধ্যম দায়িত্বশীল শিরোনাম ও খবর পরিবেশন করেছে। যেমন, প্রথম আলোর “নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেট ছাড়া জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক পাঠায় না” শীর্ষক শিরোনামে বিষয়টি উঠে এসেছে যে সংস্থাটি নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা ছাড়া সাধারণত পর্যবেক্ষণের কাজ করে না।
এই সংবাদটিকে ঘিরে অপব্যাখ্যা হাজির করছে আওয়ামীপন্থীরাও। এটির সাথে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, এ সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করছে তাঁরা। কিছু নমুনা দেখুন এখানে , এখানে, এখানে ও এখানে। যদিও মুখপাত্র স্পষ্টভাবেই প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, “আমরা শুধু বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং অবাধ মতপ্রকাশের মাধ্যমে যে নির্বাচন হবে, তাকে সব উপায়ে সমর্থন দিয়ে যাব।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনের আগে দুজারিককে পর্যবেক্ষক পাঠানো নিয়ে প্রশ্ন ক্রয়া হলে তিনি বলেছিলেন, “জাতিসংঘ এসব নির্বাচনে পর্যবেক্ষক মোতায়েন করছে না। নির্দিষ্ট আদেশ ছাড়া আমরা খুব কমই এটি করে থাকি।” সে সময় নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ছয় সদস্যের একটি প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশ সফর করে। এরপর তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে না ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে এবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে বলে জানায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
Topics:
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য গণনাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ভাবে উপস্থাপন
সুরভীর বিরুদ্ধে মামলায় ৫০ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, পুলিশের ‘বেনামি’ বরাতে গণমাধ্যম বানাল ৫০ কোটি
ব্যাক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বাংলাদেশের কৃষক ও জনগণের সক্ষমতার কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা
শুধু বাংলাদেশের নয়, অর্থ ঘাটতিতে শান্তিরক্ষা মিশনের এক চতুর্থাংশ ছাটাই
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যের বিকৃতি জুলাইকে ‘মব’-এর সাথে মেলানোর বিপক্ষেই বলেছেন মাহফুজ আলম
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!
0%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
| আরও পড়ুন
তুরস্কভিত্তিক এনজিও বাংলাদেশে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’র ম্যাপ প্রচার করছে বলে মিথ্যা তথ্য প্রচার ভারতীয় গণমাধ্যমের
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যের বিকৃতি জুলাইকে ‘মব’-এর সাথে মেলানোর বিপক্ষেই বলেছেন মাহফুজ আলম
জানুয়ারির গুজব মার্চে কেন?
যা যা জানা গেলো ।। জোর করে চুল দাড়ি কেটে ‘ভিডিও কন্টেন্ট’ বানানোর হোতা কারা?
এক্সপ্লেইনার
জাতিসংঘ কখন কোন অবস্থায় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায়
৭ জানুয়ারী ২০২৬
গত ৫ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক পাঠাবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে জানান, “না। সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেট ছাড়া জাতিসংঘ নিজে থেকে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায় না। ফলে আমরা এখন আর এটি করি না।” এ বিষয়ের সংবাদকে কিছু গণমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন বাংলাদেশে পর্যবেক্ষক পাঠানোর কথা ছিল, কিন্তু কোনো কারণে পাঠাচ্ছে না। আওয়ামীপন্থীরা এটির সাথে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার প্রসঙ্গ জুড়ে দিয়ে নানান অপব্যাখ্যা হাজির করছে।
জাতিসংঘ আগে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের মতো কাজগুলো করলেও বর্তমানে সাধারণত নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কাজ করে না। কেবল নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদের ম্যান্ডেট থাকলে কোনো দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে। দুজুরিক বলেছেন, “আমরা এখন আর এটি (নির্বাচন পর্যবেক্ষণ) করি না।” ২০১২ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি নথিতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ আছে, “সাধারণভাবে, অন্যান্য সংস্থাগুলো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, আর জাতিসংঘ এই কর্মকাণ্ড থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে।” জাতিসংঘের এই ধরনের কাজকে "খুবই বিরল" হিসেবে উল্লেখ করা হয় আরেকটি নথিতে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে দুজারিক আরও বলেন, “নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কান্ট্রি অফিস প্রায়ই কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে। তারা এ ধরনের কোনো সহায়তা দিচ্ছে কি না, তা আমি আপনাদের জেনে জানাতে পারি।” জাতিসংঘের নথিতে উল্লেখ আছে, “স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর জন্য, যেসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নির্বাচন সংক্রান্ত কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে, সেসব ক্ষেত্রে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা উচিত নয়। শুধুমাত্র তখনই উভয় কার্যক্রম একসাথে পরিচালনা করা যায় যদি তা বিশেষভাবে সাধারণ পরিষদ এবং/অথবা নিরাপত্তা পরিষদের দ্বারা অনুমোদিত হয় এবং জাতিসংঘের দুটি ভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তার কাজ আলাদাভাবে সম্পন্ন করে।” দুজারিক যেহেতু বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে কারিগরি সহায়তার সম্ভাবনার কথা বলেছেন, ফলে নীতি অনুযায়ী জাতিসংঘের এখানে পর্যবেক্ষণ না করাই স্বাভাবিক।
জাতিসংঘের বৈশ্বিকভাবে “নির্বাচন পর্যবেক্ষণ” কার্যক্রম থেকে ক্রমাগত সরে আসার নীতির কারণে ও সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেটের বাধ্যবাধকতার কারণে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল না-পাঠানোই স্বাভাবিক। কিছু গণমাধ্যমে এমনভাবে এ সংক্রান্ত খবর উপস্থাপন করা হচ্ছে, যার ফলে পাঠক এটিকে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘের নেতিবাচক মনোভাব হিসেবে পাঠ করতে পারেন। যদিও বিষয়টি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার সাথে সম্পর্কিত নয়। যেমন, দেশ রূপান্তর আশ্চর্যবোধক চিহ্নসহ শিরোনাম করেছে “নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না জাতিসংঘ!”। তবে কয়েকটি গণমাধ্যম দায়িত্বশীল শিরোনাম ও খবর পরিবেশন করেছে। যেমন, প্রথম আলোর “নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেট ছাড়া জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক পাঠায় না” শীর্ষক শিরোনামে বিষয়টি উঠে এসেছে যে সংস্থাটি নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা ছাড়া সাধারণত পর্যবেক্ষণের কাজ করে না।
এই সংবাদটিকে ঘিরে অপব্যাখ্যা হাজির করছে আওয়ামীপন্থীরাও। এটির সাথে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, এ সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করছে তাঁরা। কিছু নমুনা দেখুন এখানে , এখানে, এখানে ও এখানে। যদিও মুখপাত্র স্পষ্টভাবেই প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, “আমরা শুধু বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং অবাধ মতপ্রকাশের মাধ্যমে যে নির্বাচন হবে, তাকে সব উপায়ে সমর্থন দিয়ে যাব।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনের আগে দুজারিককে পর্যবেক্ষক পাঠানো নিয়ে প্রশ্ন ক্রয়া হলে তিনি বলেছিলেন, “জাতিসংঘ এসব নির্বাচনে পর্যবেক্ষক মোতায়েন করছে না। নির্দিষ্ট আদেশ ছাড়া আমরা খুব কমই এটি করে থাকি।” সে সময় নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ছয় সদস্যের একটি প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশ সফর করে। এরপর তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে না ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে এবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে বলে জানায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।