| ফ্যাক্ট চেক | রাজনীতি
কথিত ‘লকডাউন’ নিয়ে আওয়ামীলীগের প্রোপাগান্ডা পেজ থেকে যে সকল অপপ্রচার চালানো হচ্ছে
১২ নভেম্বর ২০২৫
আগামী ১৩ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ১৩ তারিখে ‘লকডাউন’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত দুই দিনে সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণসহ একাধিক সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। (গত দুইদিনে আওয়ামীলীগের এই আগুন সন্ত্রাস ও তাদের উষ্কানির খতিয়ান দেখুন)।
সহিংস কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা অ্যাকাউন্ট ও পেজগুলো। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, উষ্কানি প্রদানের পাশাপাশি ‘লকডাউন’ কর্মসূচিকে সফল দেখাতে এবং জনসম্পৃক্ততার দাবি তুলে ধরতে এসব পেজ থেকে ব্যাপক ভুয়া তথ্য, পুরোনো ভিডিও ও এআই-সৃষ্ট কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে।
গত দুইদিনে আওয়ামীলীগের বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা পেজ থেকে ছড়িয়ে পড়া এমন ভিডিও থেকে দেখা যায়, প্রচারিত এসব ভিডিও সাম্প্রতিক বা কথিত লকডাউন কর্মসূচির নয়। এগুলো পুরোনো কিংবা ভিন্ন কোনো ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। পাশাপাশি এআই-সৃষ্ট ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
ভিডিও ১: ২০২৩ সালের বিএনপির সড়ক অবরোধের ভিডিও দিয়ে লকডাউনের প্রচার
আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, ভিডিওটি ঢাকায় লকডাউন কর্মসূচি পালনের। তবে দাবিটি সঠিক নয়। ভিডিওটি আসলে ২০২৩ সালে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধের ঘটনার।
এছাড়াও, পর্যবেক্ষণে ভিডিওটিতে থাকা লোকগুলোর কর্মকাণ্ডের মধ্যে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়, যা এআই (AI) দিয়ে তৈরি ভিডিওতে দেখা যায়। অর্থাৎ, ২০২৩ সালের বিএনপির সড়ক অবরোধের ছবি ব্যবহার করে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে।
ভিডিও ২: ২০২৩ সালের ঘটনাকে লকডাউনের বলে প্রচার
আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডামূলক অ্যাকাউন্ট থেকে ‘যানবাহন ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়ার’ একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয় যে এটি ১০ নভেম্বরের ঘটনা। তবে, প্রচারিত এই ভিডিওটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার নয়। এটি আসলে ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর অবরোধের সমর্থনে সিলেটে বিএনপি নেতাকর্মীদের মশাল মিছিলের সময় সংঘটিত ঘটনায় ধারণকৃত।
ভিডিও ৩: শিক্ষার্থীদের পুরোনো ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ছবি দিয়ে এআইয়ের ব্যবহার
সড়কে আগুন জ্বালানোর এই ভিডিওটি ছড়িয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডামূলক অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয় যে এটি ১১ নভেম্বরের ঘটনা। তবে, যাচাই করে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারির শেষের দিকে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনার। এছাড়াও, পর্যবেক্ষণে ভিডিওটিতে ব্যক্তিদের অবস্থান পরিবর্তন ও হাঁটার মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখতে পাওয়া যায়, যা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ভিডিওর সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
ভিডিও ৪: ছাত্রদলের পুরোনো অবরোধের ভিডিওর ব্যবহার
আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, ছাত্রলীগ রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে লকডাউন কর্মসূচি পালন করছে। তবে দেখা গেছে, এই ভিডিওটি আসলে ২০২৩ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর দ্বিতীয় দফার ৪৮ ঘণ্টার অবরোধে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের অবরোধ কর্মসূচীর।
ভিডিও ৫: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছবির ব্যবহার
রাস্তায় আগুন জালানোর একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয় যে এটি ১০ নভেম্বরের ঘটনা। কিন্তু এটি আসলে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকে ইন্টারনেটে বিদ্যমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিউজ দেখুন-১, ২, ৩।
ভিডিও ৬: বিএনপির সড়ক অবরোধের ঘটনাকে লকডাউন বলে প্রচার
১০ নভেম্বর চাঁদপুর মহাসড়ক অবরোধ দাবি করে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। তবে, যাচাই করে দেখা গেছে, চাঁদপুরে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় চলতি মাসের ৫ তারিখ সড়ক অবরোধ ও দুই পক্ষের উত্তেজনার ঘটনার ভিডিও এটি।
ভিডিও ০৭: বিএনপির মশাল মিছিলকে লকডাউন কর্মসূচি দাবি
মশাল মিছিলের একটি ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, এটি লকডাউন কর্মসূচি পালনের। কিন্তু ভিডিওটি আসলে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে বিএনপি সমর্থকদের। ০৯ নভেম্বর টেকনাফ পৌরসভার বিভিন্ন সড়কে জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সমর্থকরা মশাল মিছিল করেন। সংবাদমাধ্যমেও সেদিনের ঘটনার দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।
ভিডিও ৮: বিএনপির মশাল মিছিলের একই ঘটনার ভিন্ন ভিডিও ব্যবহার
৯ নভেম্বর টেকনাফে বিএনপির মশাল মিছিলের একই ঘটনার আরেকটি ভিডিওকে লকডাউন কর্মসূচির ভিডিও বলে ছড়ানো হয়। কিন্তু এটাও ছিল ভিন্ন ঘটনার। সংবাদমাধ্যমেও এই ঘটনার দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।
ভিডিও ০৯: পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের মিছিলকে ছাত্রলীগের মিছিল বলে দাবি
কাফনের কাপড় পরে মিছিলের একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, এটা ছাত্রলীগের মিছিল। কিন্তু এই দৃশ্য আসলে চলতি বছরের এপ্রিলে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের। তাঁরা রাজধানীতে মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে বিক্ষোভ মিছিল করেছিলেন।
এছাড়াও, ভিডিওটিতে কিছু অসঙ্গতি দেখতে পাওয়া যায়। যেমন: সবার হাঁটার ভঙ্গিতে অস্বাভাবিকতা এবং সামনের লোকটির প্যান্টের রঙ ও আকার পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। এই ধরনের অসঙ্গতি সাধারণত প্রম্পট ব্যবহার করে ছবি থেকে এআই (AI) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের এপ্রিলের বিক্ষোভ মিছিলের একটি ছবি এআই ব্যবহার করে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
ভিডিও ১০: বিএনপির কর্মীদের অবরোধ ও বিক্ষোভের দৃশ্যকে লকডাউন কর্মসূচি বলে প্রচার
'ঢাকায় লকডাউন শুরু' ক্যাপশন দিয়ে একটি ভিডিওতে দাবি করা হয় যে, এটি সোমবারের (১০ নভেম্বর) ঘটনা। কিন্তু, এটি আসলে মাদারীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাভলু মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে তাঁর কর্মী-সমর্থকদের ৩ নভেম্বর অবরোধ ও বিক্ষোভের দৃশ্য।
এই ভিডিওটিতেও বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখতে পাওয়া যায়। যেমন: স্লোগানের শব্দে কৃত্রিমতা এবং হঠাৎ একাধিক ব্যক্তির আগুনের পেছনে সমবেত হওয়া। সাধারণত এসব লক্ষণ এআই (AI) দিয়ে তৈরি ভিডিওতে লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ, মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপি নেতার সমর্থকদের অবরোধের ছবি এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিডিওতে রূপান্তরিত করে আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে জনমনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
ভিডিও ১১: গাছ ফেলে সড়ক অবরোধের পুরোনো ঘটনার প্রচার
১০ নভেম্বর ‘সাধারণ জনগণ লকডাউন কর্মসূচী পালন করছে’ দাবি করে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। কিন্তু এই ভিডিওটা অন্তত গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ইন্টারনেটে বিদ্যমান রয়েছে। সেই সময় ভিডিওটি ফরিদপুরের ভাঙ্গার ঘটনা দাবিতে প্রচার হতে দেখা যায়। গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রতিবাদে গত ৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় লোকজন গাছ কেটে ও বাঁশ ফেলে অবরোধ করে।
ভিডিও ১২: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভিডিও দিয়ে লকডাউনের মিছিল দাবি
লকডাউন উপলক্ষে রাজপথে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল দাবি করে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। কিন্তু, এই ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। ভিডিওটি ‘History of July’ নামক ফেসবুক পেজে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট প্রচার হতে দেখা যায়। এছাড়াও, প্রায় এক বছর আগে থেকেই, অর্থাৎ অন্তত ২০২৪ সালের আগস্ট থেকেই, ইন্টারনেটে ভিডিওটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
ভিডিও ১৩: ছাত্রশিবিরের মিছিলকে ছাত্রলীগের মিছিল দাবি
রাজধানীর গুলিস্তানে ছাত্রলীগের বিশাল মিছিল দাবি করে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। কিন্তু ভিডিওটি আসলে গত ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ‘রান উইথ জবি শিবির’ কর্মসূচির।
অর্থাৎ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ আগামী ১৩ নভেম্বর তাদের কথিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে একাধারে সহিংস কার্যক্রম পরিচলনা করছে। অন্যদিকে লকডাউনকে সফল দেখানোর জন্য পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও দিয়ে অপতথ্য ছড়াচ্ছে।
১৪. কথিত ‘শাটডাউনের’ ভিডিও দবিতে পুরোনো ভিন্ন ঘটনার ভিডিও প্রচার
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে ‘শাটডাউনের’ ঘোষণা দিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে, ছাত্রলীগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচিতে মহাসড়ক অবরোধের ভিডিও দাবি করে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়েছে।
তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়, এর সাথে আওয়ামী লীগের কথিত ‘শাটডাউনের’ সম্পর্ক নেই। এটি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ও হামিরদী ইউনিয়নকে ফরিদপুর-৪ আসন থেকে অন্য আসনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিবাদে চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা।
[বিঃদ্রঃ আগামী ১৩ নভেম্বর তাদের কথিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অনলাইনে যে সব গুজব ছড়ানো হবে, তা ‘বাংলাফ্যাক্ট’ দেখার সাথে সাথেই এই প্রতিবেদনে ক্রমাগত হালনাগাদ করা হবে।]
Topics:
ফটোকার্ড নকল করে ঢাকায় নিযুক্ত বর্তমান জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজের নামে ভুয়া মন্তব্য প্রচার
এনসিপি নেত্রী মাহমুদা মিতুকে জড়িয়ে কালের কণ্ঠের নামে ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার
একাত্তর টিভির ফটোকার্ড নকল করে
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে ভুয়া মন্তব্য প্রচার
বাংলাদেশের ভূমিকম্পের ঘটনায় পুরোনো ও এআই-সৃষ্ট দৃশ্যের প্রচার
হাসিনা-জয়ের মন্তব্যকে রয়টার্সের বলে প্রচার
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!
0%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
ফ্যাক্ট চেক
কথিত ‘লকডাউন’ নিয়ে আওয়ামীলীগের প্রোপাগান্ডা পেজ থেকে যে সকল অপপ্রচার চালানো হচ্ছে
১২ নভেম্বর ২০২৫
আগামী ১৩ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ১৩ তারিখে ‘লকডাউন’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত দুই দিনে সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণসহ একাধিক সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। (গত দুইদিনে আওয়ামীলীগের এই আগুন সন্ত্রাস ও তাদের উষ্কানির খতিয়ান দেখুন)।
সহিংস কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা অ্যাকাউন্ট ও পেজগুলো। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, উষ্কানি প্রদানের পাশাপাশি ‘লকডাউন’ কর্মসূচিকে সফল দেখাতে এবং জনসম্পৃক্ততার দাবি তুলে ধরতে এসব পেজ থেকে ব্যাপক ভুয়া তথ্য, পুরোনো ভিডিও ও এআই-সৃষ্ট কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে।
গত দুইদিনে আওয়ামীলীগের বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা পেজ থেকে ছড়িয়ে পড়া এমন ভিডিও থেকে দেখা যায়, প্রচারিত এসব ভিডিও সাম্প্রতিক বা কথিত লকডাউন কর্মসূচির নয়। এগুলো পুরোনো কিংবা ভিন্ন কোনো ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। পাশাপাশি এআই-সৃষ্ট ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
ভিডিও ১: ২০২৩ সালের বিএনপির সড়ক অবরোধের ভিডিও দিয়ে লকডাউনের প্রচার
আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, ভিডিওটি ঢাকায় লকডাউন কর্মসূচি পালনের। তবে দাবিটি সঠিক নয়। ভিডিওটি আসলে ২০২৩ সালে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধের ঘটনার।
এছাড়াও, পর্যবেক্ষণে ভিডিওটিতে থাকা লোকগুলোর কর্মকাণ্ডের মধ্যে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়, যা এআই (AI) দিয়ে তৈরি ভিডিওতে দেখা যায়। অর্থাৎ, ২০২৩ সালের বিএনপির সড়ক অবরোধের ছবি ব্যবহার করে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে।
ভিডিও ২: ২০২৩ সালের ঘটনাকে লকডাউনের বলে প্রচার
আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডামূলক অ্যাকাউন্ট থেকে ‘যানবাহন ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়ার’ একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয় যে এটি ১০ নভেম্বরের ঘটনা। তবে, প্রচারিত এই ভিডিওটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার নয়। এটি আসলে ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর অবরোধের সমর্থনে সিলেটে বিএনপি নেতাকর্মীদের মশাল মিছিলের সময় সংঘটিত ঘটনায় ধারণকৃত।
ভিডিও ৩: শিক্ষার্থীদের পুরোনো ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ছবি দিয়ে এআইয়ের ব্যবহার
সড়কে আগুন জ্বালানোর এই ভিডিওটি ছড়িয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডামূলক অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয় যে এটি ১১ নভেম্বরের ঘটনা। তবে, যাচাই করে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারির শেষের দিকে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনার। এছাড়াও, পর্যবেক্ষণে ভিডিওটিতে ব্যক্তিদের অবস্থান পরিবর্তন ও হাঁটার মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখতে পাওয়া যায়, যা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ভিডিওর সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
ভিডিও ৪: ছাত্রদলের পুরোনো অবরোধের ভিডিওর ব্যবহার
আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, ছাত্রলীগ রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে লকডাউন কর্মসূচি পালন করছে। তবে দেখা গেছে, এই ভিডিওটি আসলে ২০২৩ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর দ্বিতীয় দফার ৪৮ ঘণ্টার অবরোধে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের অবরোধ কর্মসূচীর।
ভিডিও ৫: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছবির ব্যবহার
রাস্তায় আগুন জালানোর একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয় যে এটি ১০ নভেম্বরের ঘটনা। কিন্তু এটি আসলে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকে ইন্টারনেটে বিদ্যমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিউজ দেখুন-১, ২, ৩।
ভিডিও ৬: বিএনপির সড়ক অবরোধের ঘটনাকে লকডাউন বলে প্রচার
১০ নভেম্বর চাঁদপুর মহাসড়ক অবরোধ দাবি করে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। তবে, যাচাই করে দেখা গেছে, চাঁদপুরে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় চলতি মাসের ৫ তারিখ সড়ক অবরোধ ও দুই পক্ষের উত্তেজনার ঘটনার ভিডিও এটি।
ভিডিও ০৭: বিএনপির মশাল মিছিলকে লকডাউন কর্মসূচি দাবি
মশাল মিছিলের একটি ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, এটি লকডাউন কর্মসূচি পালনের। কিন্তু ভিডিওটি আসলে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে বিএনপি সমর্থকদের। ০৯ নভেম্বর টেকনাফ পৌরসভার বিভিন্ন সড়কে জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সমর্থকরা মশাল মিছিল করেন। সংবাদমাধ্যমেও সেদিনের ঘটনার দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।
ভিডিও ৮: বিএনপির মশাল মিছিলের একই ঘটনার ভিন্ন ভিডিও ব্যবহার
৯ নভেম্বর টেকনাফে বিএনপির মশাল মিছিলের একই ঘটনার আরেকটি ভিডিওকে লকডাউন কর্মসূচির ভিডিও বলে ছড়ানো হয়। কিন্তু এটাও ছিল ভিন্ন ঘটনার। সংবাদমাধ্যমেও এই ঘটনার দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।
ভিডিও ০৯: পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের মিছিলকে ছাত্রলীগের মিছিল বলে দাবি
কাফনের কাপড় পরে মিছিলের একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দাবি করা হয়, এটা ছাত্রলীগের মিছিল। কিন্তু এই দৃশ্য আসলে চলতি বছরের এপ্রিলে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের। তাঁরা রাজধানীতে মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে বিক্ষোভ মিছিল করেছিলেন।
এছাড়াও, ভিডিওটিতে কিছু অসঙ্গতি দেখতে পাওয়া যায়। যেমন: সবার হাঁটার ভঙ্গিতে অস্বাভাবিকতা এবং সামনের লোকটির প্যান্টের রঙ ও আকার পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। এই ধরনের অসঙ্গতি সাধারণত প্রম্পট ব্যবহার করে ছবি থেকে এআই (AI) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের এপ্রিলের বিক্ষোভ মিছিলের একটি ছবি এআই ব্যবহার করে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
ভিডিও ১০: বিএনপির কর্মীদের অবরোধ ও বিক্ষোভের দৃশ্যকে লকডাউন কর্মসূচি বলে প্রচার
'ঢাকায় লকডাউন শুরু' ক্যাপশন দিয়ে একটি ভিডিওতে দাবি করা হয় যে, এটি সোমবারের (১০ নভেম্বর) ঘটনা। কিন্তু, এটি আসলে মাদারীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাভলু মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে তাঁর কর্মী-সমর্থকদের ৩ নভেম্বর অবরোধ ও বিক্ষোভের দৃশ্য।
এই ভিডিওটিতেও বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখতে পাওয়া যায়। যেমন: স্লোগানের শব্দে কৃত্রিমতা এবং হঠাৎ একাধিক ব্যক্তির আগুনের পেছনে সমবেত হওয়া। সাধারণত এসব লক্ষণ এআই (AI) দিয়ে তৈরি ভিডিওতে লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ, মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপি নেতার সমর্থকদের অবরোধের ছবি এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিডিওতে রূপান্তরিত করে আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে জনমনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
ভিডিও ১১: গাছ ফেলে সড়ক অবরোধের পুরোনো ঘটনার প্রচার
১০ নভেম্বর ‘সাধারণ জনগণ লকডাউন কর্মসূচী পালন করছে’ দাবি করে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। কিন্তু এই ভিডিওটা অন্তত গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ইন্টারনেটে বিদ্যমান রয়েছে। সেই সময় ভিডিওটি ফরিদপুরের ভাঙ্গার ঘটনা দাবিতে প্রচার হতে দেখা যায়। গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রতিবাদে গত ৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় লোকজন গাছ কেটে ও বাঁশ ফেলে অবরোধ করে।
ভিডিও ১২: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভিডিও দিয়ে লকডাউনের মিছিল দাবি
লকডাউন উপলক্ষে রাজপথে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল দাবি করে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। কিন্তু, এই ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। ভিডিওটি ‘History of July’ নামক ফেসবুক পেজে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট প্রচার হতে দেখা যায়। এছাড়াও, প্রায় এক বছর আগে থেকেই, অর্থাৎ অন্তত ২০২৪ সালের আগস্ট থেকেই, ইন্টারনেটে ভিডিওটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
ভিডিও ১৩: ছাত্রশিবিরের মিছিলকে ছাত্রলীগের মিছিল দাবি
রাজধানীর গুলিস্তানে ছাত্রলীগের বিশাল মিছিল দাবি করে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। কিন্তু ভিডিওটি আসলে গত ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ‘রান উইথ জবি শিবির’ কর্মসূচির।
অর্থাৎ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ আগামী ১৩ নভেম্বর তাদের কথিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে একাধারে সহিংস কার্যক্রম পরিচলনা করছে। অন্যদিকে লকডাউনকে সফল দেখানোর জন্য পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও দিয়ে অপতথ্য ছড়াচ্ছে।
১৪. কথিত ‘শাটডাউনের’ ভিডিও দবিতে পুরোনো ভিন্ন ঘটনার ভিডিও প্রচার
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে ‘শাটডাউনের’ ঘোষণা দিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে, ছাত্রলীগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচিতে মহাসড়ক অবরোধের ভিডিও দাবি করে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়েছে।
তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়, এর সাথে আওয়ামী লীগের কথিত ‘শাটডাউনের’ সম্পর্ক নেই। এটি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ও হামিরদী ইউনিয়নকে ফরিদপুর-৪ আসন থেকে অন্য আসনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিবাদে চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা।
[বিঃদ্রঃ আগামী ১৩ নভেম্বর তাদের কথিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অনলাইনে যে সব গুজব ছড়ানো হবে, তা ‘বাংলাফ্যাক্ট’ দেখার সাথে সাথেই এই প্রতিবেদনে ক্রমাগত হালনাগাদ করা হবে।]