| এক্সপ্লেইনার | এক্সপ্লেইন
গত এক বছরে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে পুশ-ইন:
বিএনপি সরকারের আমলেই বাড়ে পুশ-ইন চেষ্টা!
৮ জুন ২০২৬
গত ৫ জুন ভোরে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি’র কঠোর নজরদারির কারণে সেই চেষ্টা সফল হয়নি
বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ-এর পুশ ইনের নতুন কর্মসূচী শুরু হয় ৩ জুন, ২০২৬ থেকে তখন থেকে চার দিনে অন্তত ২২টি পুশ ইনের চেষ্টা ঠেকিয়ে দেয় বিজেবি। এই দফায় দুই শতাধিক ব্যক্তিকে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে এই ধারার পুশ ইনের শুরু হয় গতবছর।
২০২৫ সালের ৭ মে প্রথম ভারত থেকে দেশটির সীমান্তরক্ষাকারী বাহিনী বিএসএফ খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা ও পানছড়ি সীমান্ত দিয়ে ৬৬ জন ও কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে আরও ৩৬ জনকে বাংলাদেশে পুশ–ইন করে।
বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে বিএসএফ মোট ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়েছে। এরপর আরও ৩২ জনকে পুশ ইন করা হয়েছে বলে বাংলাফ্যাক্টের অনুসন্ধানে উঠে আসে। অর্থাৎ, গত এক বছরে অন্তত ২৫১১ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছে ভারত। কিন্তু পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত ৭ জুন বলেছেন, ভারত এই দফায় ৪৮০০ জন ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে।
পুশ-ইনের শিকার কারা
বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন ধরনের মানুষ পুশ ইনের শিকার হচ্ছেন।
প্রথমত, যারা বহু বছর যাবত ভারতে বসবাস করছেন, সেখানে বছরের পর বছর কাজ করেছেন।
দ্বিতীয়ত, ভারতের নিজস্ব নাগরিক। বিশেষত আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, যাদের "বাংলাদেশি" তকমা দিয়ে ধরে নিয়ে পুশ-ইন করা হচ্ছে। ভারতের বম্বে হাইকোর্ট পর্যন্ত এমন কয়েকটি মামলায় হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা। যারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, এখন তাদেরও বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপি আমলেই পুশ-ইন বাড়ে
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ভারতের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ পুশ-ইন করার অভিযান দেখা প্রথম যায় বিএনপি সরকারের আমলে, ১৯৯২ সালে। সেসময় পিভি নরসিমহা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার উত্থানমুখী বিজেপির চাপে পড়ে দিল্লি থেকে তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের ধরে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয় “অপারেশন পুশব্যাক”।
এই অভিযানে সেপ্টেম্বর ১৯৯২-এ দিল্লি থেকে ১৩২ জনকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে ধরে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বহিষ্কৃতদের মাথা কামিয়ে দেওয়া হয়েছিল চিহ্নিত করার জন্য। এই নিষ্ঠুরতা আন্তর্জাতিক সমালোচনার ঝড় তোলে। কয়েক মাসের মধ্যেই অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয় ভারত।
বাংলাদেশ সরকারের তীব্র প্রতিবাদ এবং দেশের ভেতরে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিরোধিতার কারণে অভিযানটি হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বিএনপি সরকারের আমলে আবার শুরু হয় পুশ-ইন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তর পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায় ৮০ শিশু ও ৬৫ নারীসহ মোট ২১৩ জন মানুষ নো-ম্যানস-ল্যান্ডে পাঁচ দিন ধরে আটকে থাকেন। এক পর্যায়ে দলটি বাংলাদেশের দিকে ঢোকার চেষ্টা করলে বিডিআর তাদের ঠেলে ভারতের দিকে পাঠিয়ে দেয়। দলটি খোলা আকাশের নিচে, শীতের মধ্যে, খাবার ও পানি ছাড়া অপেক্ষা করে। এই ঘটনাটি তখন বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এই ঘটনার পরেই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পুশ-ইন নীতির নিন্দা করে।
২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ৮ মে পর্যন্ত এক বছরে বিএসএফ মোট ২ হাজার ৫১১ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা চালায়।
‘‘অনুপ্রবেশকারী’ বয়ানের রাজনীতি
ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি প্রায়শই রাজনৈতিক স্বার্থে “বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী”, “রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে। ২০১৮ সালে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একাধিক সভায় বলেছিলেন, "কোটি কোটি অনুপ্রবেশকারী দেশে ঢুকে উইপোকার মতো খেয়ে ফেলছে।" তিনি নির্বাচনী জনসভায় দাবি করেছিলেন আসামের সাতটি জেলায় ৬৪ লাখ অনুপ্রবেশকারী আছে।
আসামে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে ২০১৬ সাল থেকে পরিচালিত এনআরসির মাধ্যমে প্রথমে ৪০ লাখ ও চূড়ান্ত তালিকায় ১৯ লাখ মানুষকে বাদ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাভাষী মুসলমানের সংখ্যা ছিল অসামঞ্জস্যভাবে বেশি।
এই তালিকা যে ত্রুটিপূর্ণ ছিল, তার অনেক নজির পাওয়া যায়। যেমন, ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমদ-এর পরিবারের সদস্যরাও এনআরসির খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন। কার্গিল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সানাউল্লাহ, যিনি রাষ্ট্রপতির পদক পেয়েছিলেন, তাঁকেও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল "বিদেশি" ঘোষণা করে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। আদালতে পরে তাঁদের ভারতীয় বলে ঘোষণা করে।
এ বছরে পশ্চিম বাংলায় রাজ্যসভা নির্বাচনের আগে ভোটার যাচাইয়ের নামে ৯২ লাখ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়। এঁরা মোট ভোটারের ১২ ভাগ, এবং এঁদের মধ্যে মুসলমানরাই বেশি। এদেরও সম্ভাব্য পুশ-ইনের শিকার হওয়ার আশংকা রয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য, বিজেপির “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” বয়ানটি স্পষ্টভাবেই ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত। বৈধ কাগজপত্রবিহীন হিন্দু অভিবাসীদের অনেক সময় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-এর আওতায় সুরক্ষার যোগ্য শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অথচ মুসলিম অভিবাসীদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে “বহিষ্কারযোগ্য” করা হয়।
পুশ ইন কিভাবে শুরু, কেন বাড়ছে
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনার পর ভারত পাকিস্তানে হামলা চালায় এবং “অপারেশন সিঁদুর” পরিচালনা করে। এরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্য সরকারদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, অবৈধভাবে যাঁরা বসবাস করছেন, সেই বিদেশিদের চিহ্নিত করে যেন দ্রুত ফেরত পাঠানো হয়। সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, গণহারে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ সেই অভিযানেরই অংশ। পেহেলগামের ঘটনার পরপরই বাংলাদেশে পুশ ইন শুরু হয়।
সম্প্রতি, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়লাভ করে। এরপর আবার পুশ ইনের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখার তৎকালীন প্রধান দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, রাজ্যে ১ কোটি অবৈধ বাংলাদেশি মুসলিম আছে। বর্তমান মূখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্য সরকারের দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দেন, ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ও ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ আটক করে বাংলাদেশে পাঠানো হবে।
পশ্চিমবঙ্গে মমতা সরকার এক দশকের বেশি সময় ধরে বিএসএফকে বেড়া নির্মাণের জমি দিতে রাজি হয়নি, যদিও কেন্দ্রীয় সরকারের চাপ ছিল। তাছাড়া মমতা এনআরসির বিরোধিতা করেছিলেন, এবং বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশী নয়, এমন মত জোরালোভাবে ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন দল রাজ্যটিতে “অনুপ্রবেশকারী” ঠেকানোর রাজনীতি শুরু করেছে। রাজ্য সরকার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ শুরু করছে, অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে আটকদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের সব জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী গত ৭ জুন, ২০২৬ তারিখে বলেছেন, ভারত থেকে ৪৮০০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, অপেক্ষায় আরও ৮৩৬ জন। যদিও তাঁর এই দাবি বিজেবির দেয়া পরিসংখ্যানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পুশ-ইনের শিকার অনেকেই অভিযোগ করেছেন তাদের আধার কার্ড কেড়ে নেয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অর্থাৎ আইনের মাধ্যমেই “অনুপ্রবেশকারী” বয়ানের রাজনৈতিক অপব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিজিবির নজরদারি ও তৎপরতা
নতুন করে শুরু হওয়া পুশ ইন ঠেকাতে বাংলাদেশের ২৬ জেলার সীমান্তে বিপুল সংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। চার পালায় ২৪ ঘণ্টা তাঁরা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় লোকজনও তাঁদের সহযোগিতা করছেন। ভারতের পাঁচ রাজ্যের সঙ্গে দেশের ২৬ জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে আছেন। এ ছাড়া সাদাপোশাকে বিজিবি সদস্যরা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছেন।
আগামী ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে চার দিনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ওই সম্মেলনে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি অবৈধ পুশ ইন প্রসঙ্গও গুরুত্ব পাবে বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
Topics:
বর্ণবাদী বুলডোজার ইসরাইল থেকে ই ছড়ায় ভারতে এবং বাংলাদেশেও
কৃষক কার্ড পাওয়া কবীর হোসেন আপাদমস্তক কৃষক; ছড়ানো ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি
১/১১ এর পরিকল্পনা: গবেষণা প্রতিবেদনের সাক্ষ্য
জেনারেল মাসুদ শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ হেলালসহ
গুলশানে গোপন বৈঠক করেছিলেন
মামলা হয়নি, অথচ সাওদা সুমির মামলা প্রত্যাহারের দাবি জামায়াতের মহিলা বিভাগের
গণভোট বাতিল হয়নি, গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!
0%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
| আরও পড়ুন
মন্দিরে হামলা নয়, রেলওয়ের জমিতে মন্দির তৈরি নিয়ে কলহ
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে তুলসী গ্যাবার্ডর বক্তব্যের বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন
মামলা হয়নি, অথচ সাওদা সুমির মামলা প্রত্যাহারের দাবি জামায়াতের মহিলা বিভাগের
সুরভীর বিরুদ্ধে মামলায় ৫০ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, পুলিশের ‘বেনামি’ বরাতে গণমাধ্যম বানাল ৫০ কোটি
এক্সপ্লেইনার
গত এক বছরে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে পুশ-ইন:
বিএনপি সরকারের আমলেই বাড়ে পুশ-ইন চেষ্টা!
৮ জুন ২০২৬
গত ৫ জুন ভোরে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি’র কঠোর নজরদারির কারণে সেই চেষ্টা সফল হয়নি
বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ-এর পুশ ইনের নতুন কর্মসূচী শুরু হয় ৩ জুন, ২০২৬ থেকে তখন থেকে চার দিনে অন্তত ২২টি পুশ ইনের চেষ্টা ঠেকিয়ে দেয় বিজেবি। এই দফায় দুই শতাধিক ব্যক্তিকে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে এই ধারার পুশ ইনের শুরু হয় গতবছর।
২০২৫ সালের ৭ মে প্রথম ভারত থেকে দেশটির সীমান্তরক্ষাকারী বাহিনী বিএসএফ খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা ও পানছড়ি সীমান্ত দিয়ে ৬৬ জন ও কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে আরও ৩৬ জনকে বাংলাদেশে পুশ–ইন করে।
বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে বিএসএফ মোট ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়েছে। এরপর আরও ৩২ জনকে পুশ ইন করা হয়েছে বলে বাংলাফ্যাক্টের অনুসন্ধানে উঠে আসে। অর্থাৎ, গত এক বছরে অন্তত ২৫১১ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছে ভারত। কিন্তু পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত ৭ জুন বলেছেন, ভারত এই দফায় ৪৮০০ জন ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে।
পুশ-ইনের শিকার কারা
বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন ধরনের মানুষ পুশ ইনের শিকার হচ্ছেন।
প্রথমত, যারা বহু বছর যাবত ভারতে বসবাস করছেন, সেখানে বছরের পর বছর কাজ করেছেন।
দ্বিতীয়ত, ভারতের নিজস্ব নাগরিক। বিশেষত আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, যাদের "বাংলাদেশি" তকমা দিয়ে ধরে নিয়ে পুশ-ইন করা হচ্ছে। ভারতের বম্বে হাইকোর্ট পর্যন্ত এমন কয়েকটি মামলায় হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা। যারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, এখন তাদেরও বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপি আমলেই পুশ-ইন বাড়ে
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ভারতের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ পুশ-ইন করার অভিযান দেখা প্রথম যায় বিএনপি সরকারের আমলে, ১৯৯২ সালে। সেসময় পিভি নরসিমহা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার উত্থানমুখী বিজেপির চাপে পড়ে দিল্লি থেকে তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের ধরে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয় “অপারেশন পুশব্যাক”।
এই অভিযানে সেপ্টেম্বর ১৯৯২-এ দিল্লি থেকে ১৩২ জনকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে ধরে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বহিষ্কৃতদের মাথা কামিয়ে দেওয়া হয়েছিল চিহ্নিত করার জন্য। এই নিষ্ঠুরতা আন্তর্জাতিক সমালোচনার ঝড় তোলে। কয়েক মাসের মধ্যেই অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয় ভারত।
বাংলাদেশ সরকারের তীব্র প্রতিবাদ এবং দেশের ভেতরে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিরোধিতার কারণে অভিযানটি হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বিএনপি সরকারের আমলে আবার শুরু হয় পুশ-ইন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তর পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায় ৮০ শিশু ও ৬৫ নারীসহ মোট ২১৩ জন মানুষ নো-ম্যানস-ল্যান্ডে পাঁচ দিন ধরে আটকে থাকেন। এক পর্যায়ে দলটি বাংলাদেশের দিকে ঢোকার চেষ্টা করলে বিডিআর তাদের ঠেলে ভারতের দিকে পাঠিয়ে দেয়। দলটি খোলা আকাশের নিচে, শীতের মধ্যে, খাবার ও পানি ছাড়া অপেক্ষা করে। এই ঘটনাটি তখন বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এই ঘটনার পরেই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পুশ-ইন নীতির নিন্দা করে।
২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ৮ মে পর্যন্ত এক বছরে বিএসএফ মোট ২ হাজার ৫১১ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা চালায়।
‘‘অনুপ্রবেশকারী’ বয়ানের রাজনীতি
ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি প্রায়শই রাজনৈতিক স্বার্থে “বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী”, “রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে। ২০১৮ সালে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একাধিক সভায় বলেছিলেন, "কোটি কোটি অনুপ্রবেশকারী দেশে ঢুকে উইপোকার মতো খেয়ে ফেলছে।" তিনি নির্বাচনী জনসভায় দাবি করেছিলেন আসামের সাতটি জেলায় ৬৪ লাখ অনুপ্রবেশকারী আছে।
আসামে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে ২০১৬ সাল থেকে পরিচালিত এনআরসির মাধ্যমে প্রথমে ৪০ লাখ ও চূড়ান্ত তালিকায় ১৯ লাখ মানুষকে বাদ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাভাষী মুসলমানের সংখ্যা ছিল অসামঞ্জস্যভাবে বেশি।
এই তালিকা যে ত্রুটিপূর্ণ ছিল, তার অনেক নজির পাওয়া যায়। যেমন, ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমদ-এর পরিবারের সদস্যরাও এনআরসির খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন। কার্গিল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সানাউল্লাহ, যিনি রাষ্ট্রপতির পদক পেয়েছিলেন, তাঁকেও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল "বিদেশি" ঘোষণা করে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। আদালতে পরে তাঁদের ভারতীয় বলে ঘোষণা করে।
এ বছরে পশ্চিম বাংলায় রাজ্যসভা নির্বাচনের আগে ভোটার যাচাইয়ের নামে ৯২ লাখ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়। এঁরা মোট ভোটারের ১২ ভাগ, এবং এঁদের মধ্যে মুসলমানরাই বেশি। এদেরও সম্ভাব্য পুশ-ইনের শিকার হওয়ার আশংকা রয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য, বিজেপির “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” বয়ানটি স্পষ্টভাবেই ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত। বৈধ কাগজপত্রবিহীন হিন্দু অভিবাসীদের অনেক সময় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-এর আওতায় সুরক্ষার যোগ্য শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অথচ মুসলিম অভিবাসীদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে “বহিষ্কারযোগ্য” করা হয়।
পুশ ইন কিভাবে শুরু, কেন বাড়ছে
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনার পর ভারত পাকিস্তানে হামলা চালায় এবং “অপারেশন সিঁদুর” পরিচালনা করে। এরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্য সরকারদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, অবৈধভাবে যাঁরা বসবাস করছেন, সেই বিদেশিদের চিহ্নিত করে যেন দ্রুত ফেরত পাঠানো হয়। সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, গণহারে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ সেই অভিযানেরই অংশ। পেহেলগামের ঘটনার পরপরই বাংলাদেশে পুশ ইন শুরু হয়।
সম্প্রতি, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়লাভ করে। এরপর আবার পুশ ইনের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখার তৎকালীন প্রধান দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, রাজ্যে ১ কোটি অবৈধ বাংলাদেশি মুসলিম আছে। বর্তমান মূখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্য সরকারের দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দেন, ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ও ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ আটক করে বাংলাদেশে পাঠানো হবে।
পশ্চিমবঙ্গে মমতা সরকার এক দশকের বেশি সময় ধরে বিএসএফকে বেড়া নির্মাণের জমি দিতে রাজি হয়নি, যদিও কেন্দ্রীয় সরকারের চাপ ছিল। তাছাড়া মমতা এনআরসির বিরোধিতা করেছিলেন, এবং বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশী নয়, এমন মত জোরালোভাবে ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন দল রাজ্যটিতে “অনুপ্রবেশকারী” ঠেকানোর রাজনীতি শুরু করেছে। রাজ্য সরকার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ শুরু করছে, অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে আটকদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের সব জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী গত ৭ জুন, ২০২৬ তারিখে বলেছেন, ভারত থেকে ৪৮০০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, অপেক্ষায় আরও ৮৩৬ জন। যদিও তাঁর এই দাবি বিজেবির দেয়া পরিসংখ্যানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পুশ-ইনের শিকার অনেকেই অভিযোগ করেছেন তাদের আধার কার্ড কেড়ে নেয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অর্থাৎ আইনের মাধ্যমেই “অনুপ্রবেশকারী” বয়ানের রাজনৈতিক অপব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিজিবির নজরদারি ও তৎপরতা
নতুন করে শুরু হওয়া পুশ ইন ঠেকাতে বাংলাদেশের ২৬ জেলার সীমান্তে বিপুল সংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। চার পালায় ২৪ ঘণ্টা তাঁরা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় লোকজনও তাঁদের সহযোগিতা করছেন। ভারতের পাঁচ রাজ্যের সঙ্গে দেশের ২৬ জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে আছেন। এ ছাড়া সাদাপোশাকে বিজিবি সদস্যরা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছেন।
আগামী ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে চার দিনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ওই সম্মেলনে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি অবৈধ পুশ ইন প্রসঙ্গও গুরুত্ব পাবে বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।