| এক্সপ্লেইনার | এক্সপ্লেইন
কেন বাংলাদেশে গ্যাস সংকট দেখা যাচ্ছে?
৪ আগস্ট ২০২৬
রান্নার চুলার জ্বালানি থেকে শুরু করে ভারী শিল্পের চাকা, সবকিছুতেই আজ গ্যাসের সংকট দেখা যাচ্ছে। দেশের দৈনিক প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে ২,১১৪ থেকে ২,১৫১ মিলিয়ন ঘনফুটে। এই ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ২০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে এবং দেশজুড়ে লোডশেডিংও দেখা যাচ্ছে।
এই আকস্মিক গ্যাস সংকটের নেপথ্যে কোনো একক কারণ নেই। এটি মূলত দুর্ঘটনা, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি ত্রুটিপূর্ণ জ্বালানি নীতির সম্মিলিত ফল।
মহেশখালী এফএসআরইউ দুর্ঘটনা ও যান্ত্রিক জটিলতা
চলমান গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক কারণ হলো ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ (Floating Storage and Regasification Unit)-তে ঘটা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। আমদানি করা গ্যাস এলএনজি টার্মিনালে আনা হয়। সেখানে রিগ্যাসিফিকেশন করতে হয়। এর মধ্যে একটি আমেরিকান কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালনা করে। সেটায় একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনার কারিগরি জটিলতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
টার্মিনালটির দুটি বয়লারের সাথে সংযুক্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাওয়ার (বিদ্যুৎ), কন্ট্রোল (নিয়ন্ত্রণ) এবং ইনস্ট্রুমেন্টেশন তারে আগুন লেগে ১৫ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে তা জ্বলতে থাকে। আগুনে বয়লার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও এর মোটরের সংযোগকারী বিদ্যুৎ কেবল, ফুয়েল অয়েল বার্নার, ট্রান্সফরমার এবং প্রি-হিটারগুলো পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। একই সাথে জ্বালানি ও স্টিম ভালভ, ইন্টারলক এবং জরুরি শাটডাউন সিস্টেমের কন্ট্রোল কেবল এবং প্রেশার, তাপমাত্রা ও লেভেল সেন্সরের তারগুলো সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। এই বিশেষায়িত কেবল ও যন্ত্রাংশগুলো স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় না। এক্সিলারেট এনার্জিকে বিশ্বজুড়ে এগুলো খুঁজে আমদানি করতে হচ্ছে, যা মেরামতের প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।
এই একটি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৪৫০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট (mmcfd) গ্যাস সরবরাহ এক ধাক্কায় কমে গেছে। যদি আগুন আর কয়েক মিনিট স্থায়ী হতো, তবে বয়লারের অপূরণীয় ক্ষতি হতো এবং এটি সচল করতে ৬ থেকে ১২ মাস সময় লাগত, যা দেশকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি বিপর্যয়ে ফেলতে পারত।
স্পট এলএনজি কার্গো আমদানিতে স্থবিরতা ও দরপত্র ব্যর্থতা
এফএসআরইউ বিকল হওয়ার পর এলএনজি আমদানির বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে। দুর্ঘটনার পর গানভোর সিঙ্গাপুর (Gunvor Singapore) এবং টোটালএনার্জিস (TotalEnergies)-এর দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ বঙ্গোপসাগরের বহির্নোঙরে আটকা পড়ে। পরে আলোচনার মাধ্যমে গানভোরের কার্গোটি ডিসেম্বরে এবং টোটালএনার্জিসের কার্গোটি আগস্টে নেওয়ার জন্য স্থগিত করা হয়। কিন্তু এই বিলম্বের কারণে পেট্রোবাংলাকে টোটালএনার্জিসের কাছে জরিমানা গুণতে হচ্ছে।
১০ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সামিট গ্রুপের টার্মিনালের জন্য স্পট মার্কেট থেকে দুটি এলএনজি কার্গো আমদানির উদ্দেশ্যে দরপত্র (Tender) আহ্বান করেছিল রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (RPGCL)। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ১৬-১৭টি তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক কোম্পানির কেউই এই টেন্ডারে সাড়া দেয়নি। কারণ, যান্ত্রিক জটিলতায় জর্জরিত টার্মিনাল পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহকারীরা এলএনজি খালাস করতে রাজী হচ্ছে না। এর ফলে সামিটের আংশিক সচল টার্মিনালেও আগামী দিনে গ্যাস সংকটের তীব্রতা বাড়তে পারে।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি
আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কেবল দেশের ভেতরের যান্ত্রিক ত্রুটির শিকার নয়, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিও এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাতার এনার্জি (QatarEnergy), সৌদি আরামকো (Aramco), ওমান গ্যাস এবং এক্সিলারেটসহ কয়েকটি বড় কোম্পানি বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। তাদের দাবি, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্রসেসিং প্ল্যান্ট ও ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে যে এলএনজি আসত, এই যুদ্ধের কারণে কাতার থেকে আগামী ৩-৪ বছরে চুক্তিকৃত এলএনজির প্রায় অর্ধেক কার্গো পাওয়া নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির আকাশচুম্বী দাম
আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) মূল্য বৃদ্ধি সংকটের গভীরতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ (MMBtu) ছিল ১০.৬০ ডলার। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২১.৪৫ থেকে ২২.৩৫ ডলারে উন্নীত হয়েছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া লিমিটেডের কাছ থেকে ২২.৩৫ ডলারে এক কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৯৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে ক্রমাগত ও আশঙ্কাজনক ধস
দেশে প্রতি বছর দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন প্রায় ১৫ কোটি (১৫০ মিলিয়ন) ঘনফুট করে কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে প্রতি বছর ৩ কোটি ঘনফুট হারে। দেশের একক বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র হলো বিবিয়ানা, যা পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি শেভরন এবং এটি দেশের মোট গ্যাস চাহিদার ৫০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। গত মাত্র চার মাসে এই বিবিয়ানা ফিল্ড থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। একইসাথে, দেশীয় গ্যাসের সংকট মেটাতে যে বাড়তি এলএনজি আমদানি করা প্রয়োজন, তা করার মতো পর্যাপ্ত বন্দর ও রিগ্যাসিফিকেশন অবকাঠামোই বাংলাদেশে বর্তমানে নেই।
সংকট উত্তরণে সরকার বর্তমানে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি কোম্পানির সাথে মহেশখালীর কুতুবজোমে বাংলাদেশের তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের চুক্তি অনুমোদন করেছে, যা ১৮ মাসে শেষ হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে বিশেষ ‘ক্রায়োজেনিক আইএসও ট্যাংক’ এনে অক্টোবরের মধ্যে ভোলার অতিরিক্ত গ্যাস ঢাকায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
Topics:
গত এক বছরে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে পুশ-ইন:
বিএনপি সরকারের আমলেই বাড়ে পুশ-ইন চেষ্টা!
বর্ণবাদী বুলডোজার ইসরাইল থেকে ই ছড়ায় ভারতে এবং বাংলাদেশেও
কৃষক কার্ড পাওয়া কবীর হোসেন আপাদমস্তক কৃষক; ছড়ানো ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি
১/১১ এর পরিকল্পনা: গবেষণা প্রতিবেদনের সাক্ষ্য
জেনারেল মাসুদ শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ হেলালসহ
গুলশানে গোপন বৈঠক করেছিলেন
মামলা হয়নি, অথচ সাওদা সুমির মামলা প্রত্যাহারের দাবি জামায়াতের মহিলা বিভাগের
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!
0%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
| আরও পড়ুন
এক্সপ্লেইনার
কেন বাংলাদেশে গ্যাস সংকট দেখা যাচ্ছে?
৪ আগস্ট ২০২৬
রান্নার চুলার জ্বালানি থেকে শুরু করে ভারী শিল্পের চাকা, সবকিছুতেই আজ গ্যাসের সংকট দেখা যাচ্ছে। দেশের দৈনিক প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে ২,১১৪ থেকে ২,১৫১ মিলিয়ন ঘনফুটে। এই ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ২০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে এবং দেশজুড়ে লোডশেডিংও দেখা যাচ্ছে।
এই আকস্মিক গ্যাস সংকটের নেপথ্যে কোনো একক কারণ নেই। এটি মূলত দুর্ঘটনা, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি ত্রুটিপূর্ণ জ্বালানি নীতির সম্মিলিত ফল।
মহেশখালী এফএসআরইউ দুর্ঘটনা ও যান্ত্রিক জটিলতা
চলমান গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক কারণ হলো ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ (Floating Storage and Regasification Unit)-তে ঘটা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। আমদানি করা গ্যাস এলএনজি টার্মিনালে আনা হয়। সেখানে রিগ্যাসিফিকেশন করতে হয়। এর মধ্যে একটি আমেরিকান কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালনা করে। সেটায় একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনার কারিগরি জটিলতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
টার্মিনালটির দুটি বয়লারের সাথে সংযুক্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাওয়ার (বিদ্যুৎ), কন্ট্রোল (নিয়ন্ত্রণ) এবং ইনস্ট্রুমেন্টেশন তারে আগুন লেগে ১৫ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে তা জ্বলতে থাকে। আগুনে বয়লার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও এর মোটরের সংযোগকারী বিদ্যুৎ কেবল, ফুয়েল অয়েল বার্নার, ট্রান্সফরমার এবং প্রি-হিটারগুলো পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। একই সাথে জ্বালানি ও স্টিম ভালভ, ইন্টারলক এবং জরুরি শাটডাউন সিস্টেমের কন্ট্রোল কেবল এবং প্রেশার, তাপমাত্রা ও লেভেল সেন্সরের তারগুলো সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। এই বিশেষায়িত কেবল ও যন্ত্রাংশগুলো স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় না। এক্সিলারেট এনার্জিকে বিশ্বজুড়ে এগুলো খুঁজে আমদানি করতে হচ্ছে, যা মেরামতের প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।
এই একটি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৪৫০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট (mmcfd) গ্যাস সরবরাহ এক ধাক্কায় কমে গেছে। যদি আগুন আর কয়েক মিনিট স্থায়ী হতো, তবে বয়লারের অপূরণীয় ক্ষতি হতো এবং এটি সচল করতে ৬ থেকে ১২ মাস সময় লাগত, যা দেশকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি বিপর্যয়ে ফেলতে পারত।
স্পট এলএনজি কার্গো আমদানিতে স্থবিরতা ও দরপত্র ব্যর্থতা
এফএসআরইউ বিকল হওয়ার পর এলএনজি আমদানির বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে। দুর্ঘটনার পর গানভোর সিঙ্গাপুর (Gunvor Singapore) এবং টোটালএনার্জিস (TotalEnergies)-এর দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ বঙ্গোপসাগরের বহির্নোঙরে আটকা পড়ে। পরে আলোচনার মাধ্যমে গানভোরের কার্গোটি ডিসেম্বরে এবং টোটালএনার্জিসের কার্গোটি আগস্টে নেওয়ার জন্য স্থগিত করা হয়। কিন্তু এই বিলম্বের কারণে পেট্রোবাংলাকে টোটালএনার্জিসের কাছে জরিমানা গুণতে হচ্ছে।
১০ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সামিট গ্রুপের টার্মিনালের জন্য স্পট মার্কেট থেকে দুটি এলএনজি কার্গো আমদানির উদ্দেশ্যে দরপত্র (Tender) আহ্বান করেছিল রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (RPGCL)। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ১৬-১৭টি তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক কোম্পানির কেউই এই টেন্ডারে সাড়া দেয়নি। কারণ, যান্ত্রিক জটিলতায় জর্জরিত টার্মিনাল পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহকারীরা এলএনজি খালাস করতে রাজী হচ্ছে না। এর ফলে সামিটের আংশিক সচল টার্মিনালেও আগামী দিনে গ্যাস সংকটের তীব্রতা বাড়তে পারে।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি
আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কেবল দেশের ভেতরের যান্ত্রিক ত্রুটির শিকার নয়, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিও এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাতার এনার্জি (QatarEnergy), সৌদি আরামকো (Aramco), ওমান গ্যাস এবং এক্সিলারেটসহ কয়েকটি বড় কোম্পানি বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। তাদের দাবি, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্রসেসিং প্ল্যান্ট ও ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে যে এলএনজি আসত, এই যুদ্ধের কারণে কাতার থেকে আগামী ৩-৪ বছরে চুক্তিকৃত এলএনজির প্রায় অর্ধেক কার্গো পাওয়া নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির আকাশচুম্বী দাম
আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) মূল্য বৃদ্ধি সংকটের গভীরতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ (MMBtu) ছিল ১০.৬০ ডলার। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২১.৪৫ থেকে ২২.৩৫ ডলারে উন্নীত হয়েছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া লিমিটেডের কাছ থেকে ২২.৩৫ ডলারে এক কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৯৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে ক্রমাগত ও আশঙ্কাজনক ধস
দেশে প্রতি বছর দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন প্রায় ১৫ কোটি (১৫০ মিলিয়ন) ঘনফুট করে কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে প্রতি বছর ৩ কোটি ঘনফুট হারে। দেশের একক বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র হলো বিবিয়ানা, যা পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি শেভরন এবং এটি দেশের মোট গ্যাস চাহিদার ৫০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। গত মাত্র চার মাসে এই বিবিয়ানা ফিল্ড থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। একইসাথে, দেশীয় গ্যাসের সংকট মেটাতে যে বাড়তি এলএনজি আমদানি করা প্রয়োজন, তা করার মতো পর্যাপ্ত বন্দর ও রিগ্যাসিফিকেশন অবকাঠামোই বাংলাদেশে বর্তমানে নেই।
সংকট উত্তরণে সরকার বর্তমানে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি কোম্পানির সাথে মহেশখালীর কুতুবজোমে বাংলাদেশের তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের চুক্তি অনুমোদন করেছে, যা ১৮ মাসে শেষ হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে বিশেষ ‘ক্রায়োজেনিক আইএসও ট্যাংক’ এনে অক্টোবরের মধ্যে ভোলার অতিরিক্ত গ্যাস ঢাকায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।