| বিশ্লেষণ
টাইমলাইন: ওসমান হাদির জীবন ও মৃত্যু
২৫ জানুয়ারী ২০২৬
আততায়ীর গুলিতে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে উঠে আসা অন্যতম সাহসী ও জনপ্রিয় মুখ। গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়ী হওয়ার পরে তিনি একইভাবে সত্যভাষী তৎপরতা চালিয়ে যান। গঠন করেন বাংলাদেশপন্থী সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম 'ইনকিলাব মঞ্চ'।
ফ্যাসিবাদ অপসারণের সংগ্রামে জুলাইয়ের গণহত্যার বিচার, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী জাগরণে প্রধান মুখ হয়ে উঠছিলেন ওসমান হাদি। ঢাকা ৮ আসনে নির্দলীয় প্রার্থী হয়েছিলেন জাতীয় নির্বাচনে। জোরদার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিলেন বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা মির্জা আব্বাসের। ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শুনে মির্জা আব্বাস হাসপাতালে তাঁকে দেখতে ছুটে যান। ডাকসুর বিজয়ী ভিপি এবং জুলাইয়ের সহযোদ্ধা সাদিক কায়েম একটি পোস্ট দিয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে নির্বাচনী প্রতিপক্ষের দিকে ইঙ্গিত করেন, এবং পরে সেই পোস্টের জন্য ক্ষমা চান।
গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যে জুম্মার নামাজ থেকে ফেরার পথে তিনি রাজধানীর বিজয়নগরের নয়াপল্টনে মোটরসাইকেল আরোহী আততায়ীর প্রাণঘাতী গুলিতে আহত হন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে নেওয়া হলে হাজারো সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীর মধ্যে ক্রন্দন ও ক্ষোভের প্রকাশ দেখা যায়। ১৮ ডিসেম্বর তিনি সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হন।
ওসমান হাদি চলতি বছরের নভেম্বর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের থেকে হুমকি পেয়ে আসছিলেন। তাঁর গুলি বিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় আওয়ামীপন্থীদের উল্লাস করতে দেখা গেছে । শরিফ ওসমান হাদির সংক্ষিপ্ত কিন্তু দাগ কেটে যাওয়া জীবনের এই ঘটনাবলীর সংক্ষিপ্ত পথরেখা নিচে দেয়া হলো।
ইনকিলাব মঞ্চ গঠন: ১৩ আগস্ট ২০২৪ তারিখে “সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা”র ঘোষণা দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করেন। তিনি এ সংগঠনের আহ্বায়ক ছিলেন।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ আন্দোলন: ৮ মে ২০২৫ থেকে ১০ মে ২০২৫ পর্যন্ত সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে রাজনৈতিক দলের বিচারের বিধান অন্তর্ভুক্তি এবং জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র জারির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। ওসমান হাদি এই আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠস্বর ছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারণা: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন ওসমান হাদি। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন।
হত্যার হুমকি:
ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ডাল্টন সৌভাত হীরা ওসমান হাদিকে নিয়ে বেশ কয়েকবার হুমকি দেন, তাঁর উপর সহিংসতার আহ্বান জানান এবং তাঁর ঠিকানা ও ফোন নাম্বার উন্মুক্ত করেন।
গত ১৩ নভেম্বর আওয়ামীলীগের কথিত লকডাউন কর্মসূচির আগে, ১১ নভেম্বরে ডাল্টন সৌভাত হীরা একটি পোস্টে লেখেন, “১৩ তারিখের মধ্যে কিছু মানুষ কে যেন তাদের পাওনা টুকু বুঝিয়ে দেয়া হয়, যদি তারা সাহস করে বের হয়। হাদী একজন।”
১৪ নভেম্বর তিনি “হাদী মিশন অন দ্য ওয়ে” লিখে আরেকটি পোস্ট দেন, এবং ইনকিলাব মঞ্চের ফাতিমা তাসনিম জুমাকেও হুমকি দেন।
সেদিনই তিনি ওসমান হাদির ফোন নাম্বার ও স্থায়ী ঠিকানা ফেসবুকে পোস্ট করেন এবং ওসমান হাদি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের উপর সহিংসতার আহ্বান জানান। ওইদিন তিনি হাদিকে নিয়ে অন্তত ৫টি পোস্ট দেন। এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বরে ওসমান হাদিকে হত্যা করা “কতলে ওয়াজিব” বলে একটি পোস্ট দেন।
উল্লেখ্য, ওইদিন ওসমান হাদি তিন ঘণ্টার মধ্যে দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নাম্বার থেকে কল ও টেক্সটে হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ: ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার জুম্মার নামাজের পরে নিজের নির্বাচনী প্রচারের জন্য বিভিন্ন মসজিদে যাওয়ার কথা ছিল ওসমান হাদির। দুপুরে বিজয়নগর কালভার্ট রোড দিয়ে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় হেলমেট পরা ২ জন মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরবর্তীতে সেখান থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। ১৫ ডিসেম্বর তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেয়া হয় এবং সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
আজ ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শরিফ ওসমান হাদি।
দায় চাপানোর রাজনীতি
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পেইজ ও এক্টিভিস্টরা কোনো ধরনের তথ্যপ্রমান ছাড়া বিদ্যমান সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর নামে দায় চাপানোর রাজনীতি শুরু করেন। কখনো দায় চাপানো হয় বিএনপির ওপর, আবার কখনো বা জামায়াতে ইসলামীর ওপর।
প্রাথমিকভাবে আজকের কণ্ঠ ও ডাল্টন সৌভাত হীরা বিএনপির মির্জা আব্বাসের নির্দেশে হামলা হয়েছে মর্মে প্রচার করেন, তবে সুশান্ত দাশ গুপ্ত, দস্তগীর জাহাঙ্গীরসহ অনেকে হামলার জন্য দায়ী করেন জামায়াতকে।
আওয়ামীলীগের প্রোপাগাণ্ডা মাধ্যম “দৈনিক আজকের কণ্ঠ” সক্রিয়ভাবে অপতথ্য প্রচার শুরু করে। এদিন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পেইজটি থেকে ১৭টি পোস্ট করা হয়। ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপর কোনোরকম তথ্য প্রমাণ ছাড়াই আজকের কণ্ঠের পেইজ থেকে “ব্রেকিং: মির্জা আব্বাসের নির্দেশে গু/লি/বিদ্ধ ওসমান হাদি, নেওয়া হয়েছে ঢামেকে” শিরোনামে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। এর ২০ মিনিট পর “মির্জা আব্বাসের নির্দেশে” করা হয়েছে দাবিতে আরেকটি ফটোকার্ড ও ভিডিও পোস্ট করে। পেইজটি থেকে ওসমান হাদির উপর গুলি চালানোকে সমর্থন করেন কিনা, এমন প্রশ্ন দিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। আওয়ামীলীগের সমর্থকদের সেখানে হামলা সমর্থন করতে দেখা যায়।
আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও হাদিকে ক্রমাগত হুমকি দেয়া ডাল্টন সৌভাত হীরাও অন্তত তিনটি পোস্ট দেন, যেখানে তিনি কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া মির্জা আব্বাসকে দায়ী করেন।
তবে আওয়ামীলীগের আরেক প্রোপাগান্ডা প্লাটফরম এ টিম-এর সদস্য সুশান্ত দাশ গুপ্ত জামায়াতের উপর দায় চাপান। তিনি প্রথমে ঘটনাটিকে “বিএনপি প্রার্থীর উপর দায় চাপাতে জামায়াতে ইসলামের পরিকল্পিত হামলা” বলে পোস্ট দেন, পরে জামায়াতকে দায়ী করে আরও দুটি পোস্ট করেন। সময় টিভির সাবেক সাংবাদিক ও আওয়ামীলীগের “গুজবের কন্ঠস্বর” হয়ে ওঠা ছদ্মবেশী নিউজসাইট দ্যা ভয়েসের সম্পাদক দস্তগীর জাহাঙ্গীর পোস্ট দেন, “হাদী কে দিয়ে মির্জা আব্বাস মাইনাস খেলায় জামাত! কথা পরিষ্কার!
বদলে যায় প্রোপাগান্ডার ধরন
পরবর্তীকালে ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ফয়সাল করিম দাউদ নামে একজনকে শনাক্ত করে পুলিশ। এই ব্যক্তি কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের (এখন নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্যা ডিসেন্ট জানায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও পুলিশও সন্দেহভাজন ফয়সাল ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন বলে জানায়। এরপর থেকে আওয়ামীপন্থীদের মধ্যে প্রোপাগাণ্ডার ধরনে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
যেমন, প্রথমে হামলাকে মির্জা আব্বাসের নির্দেশ হিসেবে প্রচার করলেও পরে আজকের কণ্ঠ এটিকে “সাজানো হামলা” বলে একটি ফটোকার্ড ও লেখা প্রকাশ করে। আজ সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে “হাদির ওপর হামলা: হত্যাচেষ্টা নাকি হারানো গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়ার 'মাস্টারপ্ল্যান'?” শীর্ষক ফটোকার্ডে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করে। এতে “অভিযোগ উঠেছে” বলে বলা হয়, “এই হামলা কোনো বিরোধী পক্ষের কাজ নয়, বরং হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধার ও সহানুভূতি আদায়ের লক্ষ্যে সাজানো এক ‘আত্মঘাতী নাটক”।
সুশান্ত দাশ গুপ্ত সন্দেহভাজন হামলাকারী হিসেবে এআই দিয়ে তৈরী একটি ছবি পোস্ট করে ছবিটিকে “হাদীর বন্ধুর ছোটভাই” বলে দাবি করেন, যা ফ্যাক্টচেকে ভুল প্রমাণিত হয়।
গণমাধ্যমের আদলে সাজানো আওয়ামীলীগের আরেকটি অপতথ্য ছড়ানো ওয়েবসাইট বিডি ডাইজেস্ট গতকাল ১৩ ডিসেম্বর “ছাত্রলীগের কোনো পদেই ছিলেন না ফয়সাল: হাদী গুলিবিদ্ধের ঘটনায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ আসলে কে?” শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে।
দস্তগীর জাহাঙ্গীরের দ্যা ভয়েসে “আততায়ীকে জেল থেকে ছাড়ার মধ্যে হাদিকে গুলি করার রহস্য!” শিরোনামে সংবাদের আদলে একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রকাশ করা হয়।
মূলত সন্দেহভাজন ফয়সালের ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতা সামনে আসার পর থেকে প্রোপাগাণ্ডা প্লাটফরমগুলো ফয়সালের ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করে প্রচারণা শুরু করে।
আওয়ামীপন্থীদের উল্লাস ও উদযাপন
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় রীতিমতো উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে আওয়ামীপন্থীদের।
মোটরসাইকেল থেকে গুলি করার একটি সিসিটিভি ফুটেজ শেয়ার দিয়ে সুশান্ত দাশ গুপ্ত লিখেছেন, “দ্যা মোমেন্ট…*** নাই হইয়া গ্যালো…”।
আরেক আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও এ-টিম সদস্য অমি রহমান পিয়াল “ছোট বেলা থেকে ট্রাম্পের রাজনীতি ফলো করেন ওসমান হাদী...!!” লেখা সম্বলিত একটি ছবি পোস্ট করেন।
আজকের কণ্ঠ থেকে “হামলা সমর্থন করেন কিনা” মর্মে যে পোস্ট করা হয়েছে, সেখানেও দলটির সমর্থকদের উল্লাস করতে দেখা গেছে।
শরিফ ওসমান হাদির জন্ম ১৯৯৩ সালে, ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায়। ৬ ভাইবোনের মধ্যে হাদি সর্বকনিষ্ঠ. নলছিটির একটি মাদ্রাসায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু। ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকার রামপুরা এলাকায় বসবাস করতে শুরু করেন। স্কলার ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। ওসমান হাদির ১০ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।
Topics:
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙা নিয়ে অপপ্রচার
গণশিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যের খণ্ডাংশ নিয়ে বিভ্রান্তিকর শিরোনামে কালের কণ্ঠের সংবাদ প্রকাশ
গণশিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যের খণ্ডাংশ নিয়ে কালের কণ্ঠের বিভ্রান্তিকর শিরোনাম
সংশয় নয়, বরং দ্য পোস্ট নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা বিষয়ে উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে
বাংলাদেশিদের সব ধরনের ভিসা স্থগিত করেনি যুক্তরাষ্ট্র
আপনার মতামত দিন
এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?
এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!
0%
0%
আপনার মতামত শেয়ার করুন:
| মন্তব্য সমূহ:
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!
বিশ্লেষণ
টাইমলাইন: ওসমান হাদির জীবন ও মৃত্যু
২৫ জানুয়ারী ২০২৬
আততায়ীর গুলিতে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে উঠে আসা অন্যতম সাহসী ও জনপ্রিয় মুখ। গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়ী হওয়ার পরে তিনি একইভাবে সত্যভাষী তৎপরতা চালিয়ে যান। গঠন করেন বাংলাদেশপন্থী সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম 'ইনকিলাব মঞ্চ'।
ফ্যাসিবাদ অপসারণের সংগ্রামে জুলাইয়ের গণহত্যার বিচার, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী জাগরণে প্রধান মুখ হয়ে উঠছিলেন ওসমান হাদি। ঢাকা ৮ আসনে নির্দলীয় প্রার্থী হয়েছিলেন জাতীয় নির্বাচনে। জোরদার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিলেন বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা মির্জা আব্বাসের। ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শুনে মির্জা আব্বাস হাসপাতালে তাঁকে দেখতে ছুটে যান। ডাকসুর বিজয়ী ভিপি এবং জুলাইয়ের সহযোদ্ধা সাদিক কায়েম একটি পোস্ট দিয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে নির্বাচনী প্রতিপক্ষের দিকে ইঙ্গিত করেন, এবং পরে সেই পোস্টের জন্য ক্ষমা চান।
গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যে জুম্মার নামাজ থেকে ফেরার পথে তিনি রাজধানীর বিজয়নগরের নয়াপল্টনে মোটরসাইকেল আরোহী আততায়ীর প্রাণঘাতী গুলিতে আহত হন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে নেওয়া হলে হাজারো সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীর মধ্যে ক্রন্দন ও ক্ষোভের প্রকাশ দেখা যায়। ১৮ ডিসেম্বর তিনি সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হন।
ওসমান হাদি চলতি বছরের নভেম্বর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের থেকে হুমকি পেয়ে আসছিলেন। তাঁর গুলি বিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় আওয়ামীপন্থীদের উল্লাস করতে দেখা গেছে । শরিফ ওসমান হাদির সংক্ষিপ্ত কিন্তু দাগ কেটে যাওয়া জীবনের এই ঘটনাবলীর সংক্ষিপ্ত পথরেখা নিচে দেয়া হলো।
ইনকিলাব মঞ্চ গঠন: ১৩ আগস্ট ২০২৪ তারিখে “সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা”র ঘোষণা দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করেন। তিনি এ সংগঠনের আহ্বায়ক ছিলেন।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ আন্দোলন: ৮ মে ২০২৫ থেকে ১০ মে ২০২৫ পর্যন্ত সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে রাজনৈতিক দলের বিচারের বিধান অন্তর্ভুক্তি এবং জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র জারির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। ওসমান হাদি এই আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠস্বর ছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারণা: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন ওসমান হাদি। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন।
হত্যার হুমকি:
ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ডাল্টন সৌভাত হীরা ওসমান হাদিকে নিয়ে বেশ কয়েকবার হুমকি দেন, তাঁর উপর সহিংসতার আহ্বান জানান এবং তাঁর ঠিকানা ও ফোন নাম্বার উন্মুক্ত করেন।
গত ১৩ নভেম্বর আওয়ামীলীগের কথিত লকডাউন কর্মসূচির আগে, ১১ নভেম্বরে ডাল্টন সৌভাত হীরা একটি পোস্টে লেখেন, “১৩ তারিখের মধ্যে কিছু মানুষ কে যেন তাদের পাওনা টুকু বুঝিয়ে দেয়া হয়, যদি তারা সাহস করে বের হয়। হাদী একজন।”
১৪ নভেম্বর তিনি “হাদী মিশন অন দ্য ওয়ে” লিখে আরেকটি পোস্ট দেন, এবং ইনকিলাব মঞ্চের ফাতিমা তাসনিম জুমাকেও হুমকি দেন।
সেদিনই তিনি ওসমান হাদির ফোন নাম্বার ও স্থায়ী ঠিকানা ফেসবুকে পোস্ট করেন এবং ওসমান হাদি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের উপর সহিংসতার আহ্বান জানান। ওইদিন তিনি হাদিকে নিয়ে অন্তত ৫টি পোস্ট দেন। এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বরে ওসমান হাদিকে হত্যা করা “কতলে ওয়াজিব” বলে একটি পোস্ট দেন।
উল্লেখ্য, ওইদিন ওসমান হাদি তিন ঘণ্টার মধ্যে দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নাম্বার থেকে কল ও টেক্সটে হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ: ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার জুম্মার নামাজের পরে নিজের নির্বাচনী প্রচারের জন্য বিভিন্ন মসজিদে যাওয়ার কথা ছিল ওসমান হাদির। দুপুরে বিজয়নগর কালভার্ট রোড দিয়ে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় হেলমেট পরা ২ জন মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরবর্তীতে সেখান থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। ১৫ ডিসেম্বর তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেয়া হয় এবং সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
আজ ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শরিফ ওসমান হাদি।
দায় চাপানোর রাজনীতি
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পেইজ ও এক্টিভিস্টরা কোনো ধরনের তথ্যপ্রমান ছাড়া বিদ্যমান সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর নামে দায় চাপানোর রাজনীতি শুরু করেন। কখনো দায় চাপানো হয় বিএনপির ওপর, আবার কখনো বা জামায়াতে ইসলামীর ওপর।
প্রাথমিকভাবে আজকের কণ্ঠ ও ডাল্টন সৌভাত হীরা বিএনপির মির্জা আব্বাসের নির্দেশে হামলা হয়েছে মর্মে প্রচার করেন, তবে সুশান্ত দাশ গুপ্ত, দস্তগীর জাহাঙ্গীরসহ অনেকে হামলার জন্য দায়ী করেন জামায়াতকে।
আওয়ামীলীগের প্রোপাগাণ্ডা মাধ্যম “দৈনিক আজকের কণ্ঠ” সক্রিয়ভাবে অপতথ্য প্রচার শুরু করে। এদিন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পেইজটি থেকে ১৭টি পোস্ট করা হয়। ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপর কোনোরকম তথ্য প্রমাণ ছাড়াই আজকের কণ্ঠের পেইজ থেকে “ব্রেকিং: মির্জা আব্বাসের নির্দেশে গু/লি/বিদ্ধ ওসমান হাদি, নেওয়া হয়েছে ঢামেকে” শিরোনামে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। এর ২০ মিনিট পর “মির্জা আব্বাসের নির্দেশে” করা হয়েছে দাবিতে আরেকটি ফটোকার্ড ও ভিডিও পোস্ট করে। পেইজটি থেকে ওসমান হাদির উপর গুলি চালানোকে সমর্থন করেন কিনা, এমন প্রশ্ন দিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। আওয়ামীলীগের সমর্থকদের সেখানে হামলা সমর্থন করতে দেখা যায়।
আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও হাদিকে ক্রমাগত হুমকি দেয়া ডাল্টন সৌভাত হীরাও অন্তত তিনটি পোস্ট দেন, যেখানে তিনি কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া মির্জা আব্বাসকে দায়ী করেন।
তবে আওয়ামীলীগের আরেক প্রোপাগান্ডা প্লাটফরম এ টিম-এর সদস্য সুশান্ত দাশ গুপ্ত জামায়াতের উপর দায় চাপান। তিনি প্রথমে ঘটনাটিকে “বিএনপি প্রার্থীর উপর দায় চাপাতে জামায়াতে ইসলামের পরিকল্পিত হামলা” বলে পোস্ট দেন, পরে জামায়াতকে দায়ী করে আরও দুটি পোস্ট করেন। সময় টিভির সাবেক সাংবাদিক ও আওয়ামীলীগের “গুজবের কন্ঠস্বর” হয়ে ওঠা ছদ্মবেশী নিউজসাইট দ্যা ভয়েসের সম্পাদক দস্তগীর জাহাঙ্গীর পোস্ট দেন, “হাদী কে দিয়ে মির্জা আব্বাস মাইনাস খেলায় জামাত! কথা পরিষ্কার!
বদলে যায় প্রোপাগান্ডার ধরন
পরবর্তীকালে ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ফয়সাল করিম দাউদ নামে একজনকে শনাক্ত করে পুলিশ। এই ব্যক্তি কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের (এখন নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্যা ডিসেন্ট জানায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও পুলিশও সন্দেহভাজন ফয়সাল ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন বলে জানায়। এরপর থেকে আওয়ামীপন্থীদের মধ্যে প্রোপাগাণ্ডার ধরনে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
যেমন, প্রথমে হামলাকে মির্জা আব্বাসের নির্দেশ হিসেবে প্রচার করলেও পরে আজকের কণ্ঠ এটিকে “সাজানো হামলা” বলে একটি ফটোকার্ড ও লেখা প্রকাশ করে। আজ সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে “হাদির ওপর হামলা: হত্যাচেষ্টা নাকি হারানো গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়ার 'মাস্টারপ্ল্যান'?” শীর্ষক ফটোকার্ডে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করে। এতে “অভিযোগ উঠেছে” বলে বলা হয়, “এই হামলা কোনো বিরোধী পক্ষের কাজ নয়, বরং হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধার ও সহানুভূতি আদায়ের লক্ষ্যে সাজানো এক ‘আত্মঘাতী নাটক”।
সুশান্ত দাশ গুপ্ত সন্দেহভাজন হামলাকারী হিসেবে এআই দিয়ে তৈরী একটি ছবি পোস্ট করে ছবিটিকে “হাদীর বন্ধুর ছোটভাই” বলে দাবি করেন, যা ফ্যাক্টচেকে ভুল প্রমাণিত হয়।
গণমাধ্যমের আদলে সাজানো আওয়ামীলীগের আরেকটি অপতথ্য ছড়ানো ওয়েবসাইট বিডি ডাইজেস্ট গতকাল ১৩ ডিসেম্বর “ছাত্রলীগের কোনো পদেই ছিলেন না ফয়সাল: হাদী গুলিবিদ্ধের ঘটনায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ আসলে কে?” শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে।
দস্তগীর জাহাঙ্গীরের দ্যা ভয়েসে “আততায়ীকে জেল থেকে ছাড়ার মধ্যে হাদিকে গুলি করার রহস্য!” শিরোনামে সংবাদের আদলে একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রকাশ করা হয়।
মূলত সন্দেহভাজন ফয়সালের ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতা সামনে আসার পর থেকে প্রোপাগাণ্ডা প্লাটফরমগুলো ফয়সালের ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করে প্রচারণা শুরু করে।
আওয়ামীপন্থীদের উল্লাস ও উদযাপন
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় রীতিমতো উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে আওয়ামীপন্থীদের।
মোটরসাইকেল থেকে গুলি করার একটি সিসিটিভি ফুটেজ শেয়ার দিয়ে সুশান্ত দাশ গুপ্ত লিখেছেন, “দ্যা মোমেন্ট…*** নাই হইয়া গ্যালো…”।
আরেক আওয়ামী এক্টিভিস্ট ও এ-টিম সদস্য অমি রহমান পিয়াল “ছোট বেলা থেকে ট্রাম্পের রাজনীতি ফলো করেন ওসমান হাদী...!!” লেখা সম্বলিত একটি ছবি পোস্ট করেন।
আজকের কণ্ঠ থেকে “হামলা সমর্থন করেন কিনা” মর্মে যে পোস্ট করা হয়েছে, সেখানেও দলটির সমর্থকদের উল্লাস করতে দেখা গেছে।
শরিফ ওসমান হাদির জন্ম ১৯৯৩ সালে, ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায়। ৬ ভাইবোনের মধ্যে হাদি সর্বকনিষ্ঠ. নলছিটির একটি মাদ্রাসায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু। ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকার রামপুরা এলাকায় বসবাস করতে শুরু করেন। স্কলার ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। ওসমান হাদির ১০ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।