| বিশ্লেষণ

'মানহানি'র নিশানায় নারী রাজনীতিক : নির্বাচনী প্রচারণাতেও রেহাই নাই

২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


'মানহানি'র নিশানায় নারী রাজনীতিক : নির্বাচনী প্রচারণাতেও রেহাই নাই
বিভ্রান্তিকর

বিগত কয়েক বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে মানহানিকর অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারের একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারে থাকা ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নারীদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিতভাবে মানহানিকর, বিকৃত ও ভুয়া কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

রাজনীতিতে সক্রিয় নারীদের জড়িয়ে মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নাম ও লোগো ব্যবহার করে তৈরি করা জাল বা বিকৃত ফটোকার্ড, মানহানিকরভাবে সম্পাদিত ছবি, কিংবা ভুয়া মন্তব্য সংবলিত ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেদারসে ছড়ানো হচ্ছে।  

বাংলাফ্যাক্ট রাজনৈতিক মহলে সক্রিয় ও পরিচিত নারীদের নিয়ে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া কিছু আপত্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত করেছে। অপতথ্যগুলোতে দেখা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বিরোধী দল ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নারী নেত্রীদের লক্ষ্য করে নিয়মিতভাবে ডিজিটাল ‘ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’ বা চরিত্র হনন চালানো হচ্ছে। 

এই অপপ্রচারের মূল কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মূলধারার গণমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন সংবলিত ভুয়া ফটোকার্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি বিকৃত ছবি ও ভিডিও এবং কুরুচিপূর্ণ মিথ্যা মন্তব্য। বিশেষ করে রাজনৈতিক সমালোচনার পরিবর্তে যৌন হয়রানিমূলক এবং ব্যক্তিগত মানহানিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে জনমনে দ্রুত বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, জাইমা রহমান, তাসনিম জারা, ফাতিমা তাসনিম জুমা, মাহমুদা মিতু, তাওহিদা সুলতানাসহ অনেকের বিরুদ্ধে এই ধরনের ‘মানহানিকর’ অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে।  

দলীয় আদর্শ নির্বিশেষে রাজনীতিতে সক্রিয় নারীরা এই সাইবার আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। উল্লেখ্য, কয়েক মাসে পূর্বে বাংলাফ্যাক্ট নারী রাজনীতিকদের নিয়ে ছড়ানো আপত্তিকর কনটেন্ট নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানেও দেখা গিয়েছিল, নারী রাজনীতিবিদদের নামে যে সকল অপতথ্য ছড়ানো হয়, সেগুলো কেবল মিথ্যা বা ভুয়া বা বিকৃত বক্তব্যের মধ্যেই সীমিত থাকে না; বরঞ্চ তার অধিকাংশই থাকে যৌন হয়রানিমূলক ও মানহানিকর।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, নারী রাজনীতিবিদদের আক্রমণ করার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেতে পারে।   


অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে নিয়ে গত ২৫ জানুয়ারি একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। সমকাল পত্রিকার লগো ও ডিজাইন সংবলিত এই ফটোকার্ডে লেখা হয়, ‘‘আগামী সরকারের জন্য উপদেষ্টা রিজওয়ানার উপদেশ, পাটের তৈরি কনডমের প্রচারণা যেন বন্ধ না হয়’। মূলত, সমকালের ফেসবুক পেজে গত ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘আগামী সরকারের জন্য উপদেষ্টা রিজওয়ানার সাত দফা ‘পরিবেশ এজেন্ডা’ শিরোনামের ফটোকার্ডটি সম্পাদনার মাধ্যমে বিকৃত করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।



সম্প্রতি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের এক বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন গণমাধ্যম ‘দায়িত্ব ছাড়ার পর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে দ্বিধা নেই: রিজওয়ানা হাসান’ এবং ‘দায়িত্ব ছাড়ার পর জবাবদিহিতা দিতে সমস্যা নেই’ শিরোনামের ফটোকার্ড প্রকাশ করেছিল। এই উক্তি ও ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন আপত্তিকর ও যৌনসুড়সুড়িমূলক ফটোকার্ড বানিয়ে অপতথ্য ছড়ানো হয়। যেমন, বাংলাভিশনের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ডটিতে লেখা হয়, ‘অর্গানিক কনডম ব্যবহারে অনুরোধ করলেন: রিজওয়ানা হাসান’। অন্যদিকে, কালের কণ্ঠের লোগো ব্যবহার করে রিজওয়ানা হাসানের উদ্ধৃতিকে বিকৃত করে ফটোকার্ডে  লেখা হয়, ‘দায়িত্ব ছাড়ার পর অর্গানিক কনডমের ব্যবসা করতে চান’।


 



একইভাবে জাইমা রহমানকে নিয়ে ছড়ানো হয় আপত্তিকর কনটেন্ট। জাইমা রহমানের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে গতবছরের ২৪ নভেম্বর একটি ছবি প্রকাশ করেছিলেন। সেই ছবিকে (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে বিকৃত করে একটি ফটোকার্ডে ব্যবহার করা হয়। গণমাধ্যমের ফটোকার্ডের আদলে তৈরি কার্ডে বিকৃত ছবিটি বসিয়ে শিরোনাম দেয়া হয়, ‘পর্নহাবের টপ ২০ তালিকায় বাংলাদেশী পর্ন তারকার নাম’। 

 


ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী তাসনিম জারাকে নিয়ে জনকণ্ঠ ২৪ জানুয়ারি একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছিল। তাতে লেখা ছিল ‘ঢাকা-৯ আসনে তাসনিম জারার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা’। এই শিরোনামকে বিকৃত করে আরেকটি  ফটোকার্ড ছড়িয়ে বলা হয়, ‘ঢাকা-৯ আসনে তাসনিম জারার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা, যৌন রোগীদের চিকিৎসা ফ্রি।’

 


অভ্যুত্থানের পরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর থেকে যে কয়জন নারী রাজনীতিবিদ অনলাইনে সবচেয়ে বেশি এই ধরনের আক্রমনের শিকার হয়েছেন, তার মধ্যে তসনিম জারা অন্যতম। গত ডিসেম্বরেও একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হয়। সেখানে এআই দিয়ে জারার সাথে অন্য আরেক রাজনৈতিক নেতার চুম্বনের ভিডিও বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়। পুরনো ও ভিন্ন প্রেক্ষাপটের একটি ভিডিওকে ব্যবহার করে এটা বানানো হয়।  


সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতুকে নিয়ে নাহিদ ইসলাম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার পর কালবেলা ‘মধ্যরাতে মাহমুদা মিতুকে নিয়ে নাহিদ ইসলামের স্ট্যাটাস’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে। সেখানে এই স্ট্যাটাস দেয়ার সংবাদটাই প্রকাশ করা হয়। এই ফটোকার্ডের ব্যবহৃত নাহিদ ইসলাম ও মাহমুদা মিতুর ছবি এবং কালবেলার লোগো ব্যবহার করে আপত্তিকর একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেয়া হয়। সেখানে লেখা হয় ‘মধ্যরাতে মাহমুদা মিতুকে নিয়ে হোটেল ওয়েস্টিনে নাহিদ ইসলাম’। 



একইভাবে দেখা যায়, জাগো নিউজ ৩০ ডিসেম্বর মাহমুদা মিতুকে নিয়ে একটা ফটোকার্ড প্রকাশ করে। সেই ফটোকার্ডে লেখা ছিল ‘এনসিপির প্রার্থী মাহমুদা মিতুকে হ’ত্যা’র হু’মকির অভিযোগ’। এই সংবাদ শিরোনামকে বিকৃত করে আরেকটি ফটোকার্ড বানানো হয়, যেখানে লেখা হয়, ‘এনসিপির প্রার্থী মাহমুদা মিতুকে লাগানোর হু’মকির অভিযোগ’।  


 


ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাও রেহাই পাননি এই ধরনের অপপ্রচার থেকে। গত ১৫ জানুয়ারি কালের কণ্ঠের ফেসবুক পেজ থেকে ফাতিমা তাসনিম জুমাকে উদ্ধৃত করে একটি ফটোকার্ডটি প্রকাশ করা হয়। শিরোনাম ছিল, ‘হাদিকে হত্যার পরিকল্পনাকারীরা জানাজার সামনের কাতারেই ছিল : জুমা’। 


সেই কার্ডে ব্যবহৃত জুমার ছবিকে বিকৃত করে আরেকটি ফটোকার্ড বানানো হয়। বিকৃত ফটোকার্ডে এআই দিয়ে তার পরিহিত পোশাককে পরিবর্তন করে দেয়া হয়। শিরোনামও বিকৃত করে আপত্তিকর বক্তব্য জুড়ে দেয়া হয় জুমার নামে। তাতে লেখা হয়, ‘হাদীকে ভুলে গেলে জান্নাতে হুর পাবেন না’। এই বিকৃত ফটোকার্ডেও কালের কণ্ঠের লোগো ব্যবহার করা হয়।    



আবার, মূলধারার গণমাধ্যমের ফটোকার্ড ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যকে বিকৃত করে ভুয়া বক্তব্য প্রচারের পাশাপাশি,  কোনো গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার না করেও একেবারে ভুয়া ও মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নামে। নারী রাজনীতিবিদদের নামে প্রচার করা হচ্ছে আপত্তিকর ও যৌনসুড়সুড়িমূলক বক্তব্য। যেমন, গতবছরের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হল ছাত্রদলের আহবায়ক তাওহিদা সুলতানার নামে একটা ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। সেখানে তাকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়, ‘আগে ছাত্রদলের পোগ্রামে গেলে বিভিন্ন খারাপ কাজে লিপ্ত হতে জোরপূর্বক বাধ্য করলেও বর্তমানে তাদের কাছে নিরাপদ মনে করি’। 


ফটোকার্ডটি ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুক একটি পোস্ট করেন। তিনি লিখেন, ‘গত একমাসে আমার নাম দিয়ে এরকম ফটোকার্ড কতগুলো বানানো হয়েছে আমার কাছে হিসাব নেই। বানালে যে আমার খুব ছিঁড়ছে কিছু এমন না। কিন্তু বাসার লোকজন যখন দেখে তখন সত্যি ভাবে। আমাকে যারা পার্সোনালি চেনে তারা জানে আমি একরকম পরিবারের সাথে যুদ্ধ করে রাজনীতিটা করছি। তারপর এসব যখন দেখে তার ইফেক্ট কী হয় বলাই বাহুল্য। অ্যাজ আ উইমেন, আমার পলিটিক্যাল স্পেসটা যারা এভাবে সংকুচিত করছে তাদের বিরুদ্ধে কি ডাকসুর ভিপি দুয়েকটা মামলা করবে? আমাদের সকলের প্রিয় Shehreen Amin Bhuiyan ম্যাম কি দুয়েকটা প্রতিবাদ জানাবেন?’ 


তাওহিদা সুলতানার কথা থেকে এই ধরনের আপত্তিকর কনটেন্টের ব্যপকতা এবং সামাজিক প্রভাব টের পাওয়া যায়। 


উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া অভিনেত্রী, মডেল, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও অন্যান্য শ্রেণি-পেশার নারীদের নিয়েও প্রতিনিয়ত এই ধরনের মানহানিকর, আপত্তিকর ও যৌনহয়রানিমূলক কনটেন্ট ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নারী রাজনীতিবিদদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।   







Topics:

Bangla Fact বাংলা ফ্যাক্ট



অন্তর্বর্তী সরকারকে “অবৈধ” বলে আখ্যা: আওয়ামীলীগের পেইজের লেখা যখন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে
৭ মার্চ ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারকে “অবৈধ” বলে আখ্যা: আওয়ামীলীগের পেইজের লেখা যখন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে



অন্তর্বর্তী সরকারকে “অবৈধ” বলে আখ্যা: আওয়ামীলীগের পেইজের লেখা যখন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে
৭ মার্চ ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারকে “অবৈধ” বলে আখ্যা: আওয়ামীলীগের পেইজের লেখা যখন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে

বাংলাভিশনের বিভ্রান্তিকর শিরোনামে পাঠক মনে করছে দেশজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব
বিভ্রান্তিকর
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাভিশনের বিভ্রান্তিকর শিরোনামে পাঠক মনে করছে দেশজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব

বাংলাভিশনের বিভ্রান্তিকর শিরোনামে পাঠক মনে করছে দেশজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব
বিভ্রান্তিকর
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাভিশনের বিভ্রান্তিকর শিরোনামে পাঠক মনে করছে দেশজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব

‘দরিদ্র বাড়িয়ে বিদায় দারিদ্র্যের জাদুকরের’ শিরোনামে একযোগে ভুল সংবাদ প্রকাশ
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

‘দরিদ্র বাড়িয়ে বিদায় দারিদ্র্যের জাদুকরের’ শিরোনামে একযোগে ভুল সংবাদ প্রকাশ

আপনার মতামত দিন

এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?

100%

0%

আপনার মতামত শেয়ার করুন:

| মন্তব্য সমূহ:

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!



'মানহানি'র নিশানায় নারী রাজনীতিক : নির্বাচনী প্রচারণাতেও রেহাই নাই

বিশ্লেষণ

'মানহানি'র নিশানায় নারী রাজনীতিক : নির্বাচনী প্রচারণাতেও রেহাই নাই

২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

<p><span style="font-weight: bold;">'মানহানি'র নিশানায় নারী রাজনীতিক : নির্বাচনী প্রচারণাতেও রেহাই নাই</span><br /></p>

বিগত কয়েক বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে মানহানিকর অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারের একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারে থাকা ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নারীদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিতভাবে মানহানিকর, বিকৃত ও ভুয়া কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

রাজনীতিতে সক্রিয় নারীদের জড়িয়ে মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নাম ও লোগো ব্যবহার করে তৈরি করা জাল বা বিকৃত ফটোকার্ড, মানহানিকরভাবে সম্পাদিত ছবি, কিংবা ভুয়া মন্তব্য সংবলিত ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেদারসে ছড়ানো হচ্ছে।  

বাংলাফ্যাক্ট রাজনৈতিক মহলে সক্রিয় ও পরিচিত নারীদের নিয়ে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া কিছু আপত্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত করেছে। অপতথ্যগুলোতে দেখা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বিরোধী দল ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নারী নেত্রীদের লক্ষ্য করে নিয়মিতভাবে ডিজিটাল ‘ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’ বা চরিত্র হনন চালানো হচ্ছে। 

এই অপপ্রচারের মূল কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মূলধারার গণমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন সংবলিত ভুয়া ফটোকার্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি বিকৃত ছবি ও ভিডিও এবং কুরুচিপূর্ণ মিথ্যা মন্তব্য। বিশেষ করে রাজনৈতিক সমালোচনার পরিবর্তে যৌন হয়রানিমূলক এবং ব্যক্তিগত মানহানিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে জনমনে দ্রুত বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, জাইমা রহমান, তাসনিম জারা, ফাতিমা তাসনিম জুমা, মাহমুদা মিতু, তাওহিদা সুলতানাসহ অনেকের বিরুদ্ধে এই ধরনের ‘মানহানিকর’ অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে।  

দলীয় আদর্শ নির্বিশেষে রাজনীতিতে সক্রিয় নারীরা এই সাইবার আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। উল্লেখ্য, কয়েক মাসে পূর্বে বাংলাফ্যাক্ট নারী রাজনীতিকদের নিয়ে ছড়ানো আপত্তিকর কনটেন্ট নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানেও দেখা গিয়েছিল, নারী রাজনীতিবিদদের নামে যে সকল অপতথ্য ছড়ানো হয়, সেগুলো কেবল মিথ্যা বা ভুয়া বা বিকৃত বক্তব্যের মধ্যেই সীমিত থাকে না; বরঞ্চ তার অধিকাংশই থাকে যৌন হয়রানিমূলক ও মানহানিকর।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, নারী রাজনীতিবিদদের আক্রমণ করার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেতে পারে।   


অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে নিয়ে গত ২৫ জানুয়ারি একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। সমকাল পত্রিকার লগো ও ডিজাইন সংবলিত এই ফটোকার্ডে লেখা হয়, ‘‘আগামী সরকারের জন্য উপদেষ্টা রিজওয়ানার উপদেশ, পাটের তৈরি কনডমের প্রচারণা যেন বন্ধ না হয়’। মূলত, সমকালের ফেসবুক পেজে গত ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘আগামী সরকারের জন্য উপদেষ্টা রিজওয়ানার সাত দফা ‘পরিবেশ এজেন্ডা’ শিরোনামের ফটোকার্ডটি সম্পাদনার মাধ্যমে বিকৃত করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।



সম্প্রতি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের এক বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন গণমাধ্যম ‘দায়িত্ব ছাড়ার পর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে দ্বিধা নেই: রিজওয়ানা হাসান’ এবং ‘দায়িত্ব ছাড়ার পর জবাবদিহিতা দিতে সমস্যা নেই’ শিরোনামের ফটোকার্ড প্রকাশ করেছিল। এই উক্তি ও ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন আপত্তিকর ও যৌনসুড়সুড়িমূলক ফটোকার্ড বানিয়ে অপতথ্য ছড়ানো হয়। যেমন, বাংলাভিশনের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ডটিতে লেখা হয়, ‘অর্গানিক কনডম ব্যবহারে অনুরোধ করলেন: রিজওয়ানা হাসান’। অন্যদিকে, কালের কণ্ঠের লোগো ব্যবহার করে রিজওয়ানা হাসানের উদ্ধৃতিকে বিকৃত করে ফটোকার্ডে  লেখা হয়, ‘দায়িত্ব ছাড়ার পর অর্গানিক কনডমের ব্যবসা করতে চান’।


 



একইভাবে জাইমা রহমানকে নিয়ে ছড়ানো হয় আপত্তিকর কনটেন্ট। জাইমা রহমানের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে গতবছরের ২৪ নভেম্বর একটি ছবি প্রকাশ করেছিলেন। সেই ছবিকে (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে বিকৃত করে একটি ফটোকার্ডে ব্যবহার করা হয়। গণমাধ্যমের ফটোকার্ডের আদলে তৈরি কার্ডে বিকৃত ছবিটি বসিয়ে শিরোনাম দেয়া হয়, ‘পর্নহাবের টপ ২০ তালিকায় বাংলাদেশী পর্ন তারকার নাম’। 

 


ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী তাসনিম জারাকে নিয়ে জনকণ্ঠ ২৪ জানুয়ারি একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছিল। তাতে লেখা ছিল ‘ঢাকা-৯ আসনে তাসনিম জারার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা’। এই শিরোনামকে বিকৃত করে আরেকটি  ফটোকার্ড ছড়িয়ে বলা হয়, ‘ঢাকা-৯ আসনে তাসনিম জারার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা, যৌন রোগীদের চিকিৎসা ফ্রি।’

 


অভ্যুত্থানের পরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর থেকে যে কয়জন নারী রাজনীতিবিদ অনলাইনে সবচেয়ে বেশি এই ধরনের আক্রমনের শিকার হয়েছেন, তার মধ্যে তসনিম জারা অন্যতম। গত ডিসেম্বরেও একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হয়। সেখানে এআই দিয়ে জারার সাথে অন্য আরেক রাজনৈতিক নেতার চুম্বনের ভিডিও বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়। পুরনো ও ভিন্ন প্রেক্ষাপটের একটি ভিডিওকে ব্যবহার করে এটা বানানো হয়।  


সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতুকে নিয়ে নাহিদ ইসলাম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার পর কালবেলা ‘মধ্যরাতে মাহমুদা মিতুকে নিয়ে নাহিদ ইসলামের স্ট্যাটাস’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে। সেখানে এই স্ট্যাটাস দেয়ার সংবাদটাই প্রকাশ করা হয়। এই ফটোকার্ডের ব্যবহৃত নাহিদ ইসলাম ও মাহমুদা মিতুর ছবি এবং কালবেলার লোগো ব্যবহার করে আপত্তিকর একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেয়া হয়। সেখানে লেখা হয় ‘মধ্যরাতে মাহমুদা মিতুকে নিয়ে হোটেল ওয়েস্টিনে নাহিদ ইসলাম’। 



একইভাবে দেখা যায়, জাগো নিউজ ৩০ ডিসেম্বর মাহমুদা মিতুকে নিয়ে একটা ফটোকার্ড প্রকাশ করে। সেই ফটোকার্ডে লেখা ছিল ‘এনসিপির প্রার্থী মাহমুদা মিতুকে হ’ত্যা’র হু’মকির অভিযোগ’। এই সংবাদ শিরোনামকে বিকৃত করে আরেকটি ফটোকার্ড বানানো হয়, যেখানে লেখা হয়, ‘এনসিপির প্রার্থী মাহমুদা মিতুকে লাগানোর হু’মকির অভিযোগ’।  


 


ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাও রেহাই পাননি এই ধরনের অপপ্রচার থেকে। গত ১৫ জানুয়ারি কালের কণ্ঠের ফেসবুক পেজ থেকে ফাতিমা তাসনিম জুমাকে উদ্ধৃত করে একটি ফটোকার্ডটি প্রকাশ করা হয়। শিরোনাম ছিল, ‘হাদিকে হত্যার পরিকল্পনাকারীরা জানাজার সামনের কাতারেই ছিল : জুমা’। 


সেই কার্ডে ব্যবহৃত জুমার ছবিকে বিকৃত করে আরেকটি ফটোকার্ড বানানো হয়। বিকৃত ফটোকার্ডে এআই দিয়ে তার পরিহিত পোশাককে পরিবর্তন করে দেয়া হয়। শিরোনামও বিকৃত করে আপত্তিকর বক্তব্য জুড়ে দেয়া হয় জুমার নামে। তাতে লেখা হয়, ‘হাদীকে ভুলে গেলে জান্নাতে হুর পাবেন না’। এই বিকৃত ফটোকার্ডেও কালের কণ্ঠের লোগো ব্যবহার করা হয়।    



আবার, মূলধারার গণমাধ্যমের ফটোকার্ড ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যকে বিকৃত করে ভুয়া বক্তব্য প্রচারের পাশাপাশি,  কোনো গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার না করেও একেবারে ভুয়া ও মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নামে। নারী রাজনীতিবিদদের নামে প্রচার করা হচ্ছে আপত্তিকর ও যৌনসুড়সুড়িমূলক বক্তব্য। যেমন, গতবছরের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হল ছাত্রদলের আহবায়ক তাওহিদা সুলতানার নামে একটা ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। সেখানে তাকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়, ‘আগে ছাত্রদলের পোগ্রামে গেলে বিভিন্ন খারাপ কাজে লিপ্ত হতে জোরপূর্বক বাধ্য করলেও বর্তমানে তাদের কাছে নিরাপদ মনে করি’। 


ফটোকার্ডটি ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুক একটি পোস্ট করেন। তিনি লিখেন, ‘গত একমাসে আমার নাম দিয়ে এরকম ফটোকার্ড কতগুলো বানানো হয়েছে আমার কাছে হিসাব নেই। বানালে যে আমার খুব ছিঁড়ছে কিছু এমন না। কিন্তু বাসার লোকজন যখন দেখে তখন সত্যি ভাবে। আমাকে যারা পার্সোনালি চেনে তারা জানে আমি একরকম পরিবারের সাথে যুদ্ধ করে রাজনীতিটা করছি। তারপর এসব যখন দেখে তার ইফেক্ট কী হয় বলাই বাহুল্য। অ্যাজ আ উইমেন, আমার পলিটিক্যাল স্পেসটা যারা এভাবে সংকুচিত করছে তাদের বিরুদ্ধে কি ডাকসুর ভিপি দুয়েকটা মামলা করবে? আমাদের সকলের প্রিয় Shehreen Amin Bhuiyan ম্যাম কি দুয়েকটা প্রতিবাদ জানাবেন?’ 


তাওহিদা সুলতানার কথা থেকে এই ধরনের আপত্তিকর কনটেন্টের ব্যপকতা এবং সামাজিক প্রভাব টের পাওয়া যায়। 


উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া অভিনেত্রী, মডেল, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও অন্যান্য শ্রেণি-পেশার নারীদের নিয়েও প্রতিনিয়ত এই ধরনের মানহানিকর, আপত্তিকর ও যৌনহয়রানিমূলক কনটেন্ট ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নারী রাজনীতিবিদদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।