| বিশ্লেষণ

পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপির জয়ে ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ বয়ানের প্রভাব

৭ মে ২০২৬


পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপির জয়ে ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ বয়ানের প্রভাব

২০২৬ সালের ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়লাভ করেছে। তারা পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিপুল বিজয় লাভ করেছে। ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করেছে তারা। এবং একই সঙ্গে আসামে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা ধরে রাখার কাজও সম্ভব করেছে তারা ৮২টি আসন নিয়ে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই দুটি রাজ্যে বিজেপির জয়ের একটা বিশেষ কারণ হলো, বিজেপির “বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী” তত্ত্ব। বাংলাভাষী মুসলমানদের অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিত্রিত করে এবং তাদের হিন্দু সংস্কৃতি, ভূমি ও গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত রাজনৈতিক প্রচার চালিয়েছে দলটি।  

মাসের পর মাস এসব প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মত বিজেপির নেতারা জনমিতিক আতঙ্ক, নাগরিক বঞ্চনা এবং ইসলাম সম্পর্কে ভীতি ছড়িয়ে ‘ঘুসপেটিয়া’ (অনুপ্রবেশকারী) শব্দটিকে একটি গোটা সম্প্রদায় ও দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত রাজনৈতিক বয়ানে পরিণত করেছেন।  


কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপ্রবেশকারী তত্ত্বের স্বাভাবিকীকরণের সূচনা

দুই রাজ্যে এই কৌশল প্রয়োগের পরিকল্পনা স্পষ্ট হয় ২০২৫ সালের অক্টোবরে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পেট্রাপোলে একটি সীমান্ত ক্রসিং উদ্বোধন করে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের অনুপ্রবেশ বন্ধে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানান। আর ঠিক একই দিনে হেমন্ত শর্মা গুয়াহাটিতে একটি অনুষ্ঠানে একই বার্তা জোরদার করেন। 

পশ্চিমবঙ্গে মোদিসহ বিজেপি নেতারা মুসলমানদের 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' বলে অভিযুক্ত করেন এবং 'অবৈধ অভিবাসীদের' তাড়াতে হিন্দু ঐক্যের আহ্বান জানান। কাউন্টারকারেন্টস-এর একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রচারণায় পশ্চিমবঙ্গকে 'নতুন বাংলাদেশে পরিণত হওয়ার মুখে' বলে দাবি করা হয় এবং তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে 'মুসলিম তোষণের' মাধ্যমে এই পরিস্থিতির সহায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

আসামে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত শর্মা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। তিনি 'অবৈধ বাংলাদেশি মুসলমানদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার' প্রতিশ্রুতি দিলেন, নির্বাচনে ভালো ফলাফলের উপর শর্ত রেখে আরও বড় উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা দিলেন, এবং আসামবাসীকে 'যেকোনো উপায়ে' মিয়া মুসলমানদের 'কষ্ট দেওয়ার' আহ্বান জানালেন, যাতে তারা রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। বাংলাভাষী মুসলমানদের অবজ্ঞা করে ডাকা হয় মিয়া মুসলমান। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি ঘোষণা দেন যে আসামীয় বংশোদ্ভূত নন এমন সকল বাংলাভাষী মুসলমানকে উচ্ছেদ করা হবে। মার্চে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন নির্বাচনের ফলাফল অনুকূল হলে আরও বড় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।


আসামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো 

আসামের এসব প্রচার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছায়, যখন বিজেপির আসাম শাখার আনুষ্ঠানিক সামাজিক গণমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত ভিডিও পোস্ট করা হয়, যেখানে হেমন্ত শর্মাকে দুই মুসলমান পুরুষের ছবিতে রাইফেল দিয়ে গুলি করতে দেখা যাচ্ছে । শিরোনামে লেখা ছিল 'নো মার্সি' ও 'পয়েন্ট ব্লাঙ্ক শট।' গণরোষের মুখে ভিডিওটি মুছে ফেলা হয়। কংগ্রেস এটিকে 'গণহত্যার আহ্বান' বলে অভিহিত করে। একজন বিজেপি সামাজিক মাধ্যম কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। 

তবে একমাস পরে শর্মা তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি পুনরায় পোস্ট করার ঘোষণা দেন। 


পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা নিয়ে বয়ান নির্মাণ 

বিজেপির অনুপ্রবেশকারী বয়ান অনির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের উপর তৈরি করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন রাজ্যের ভোটার তালিকায় দেড় কোটি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। এটি প্রমাণ করা সম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গার মোট সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাবেক সভাপতি দিলীপ ঘোষ এর আগে দাবি করেছিলেন ভারতে দুই কোটি বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কাউকে থাকতে দেওয়া হবে না, তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হবে। 


ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া 

এ বয়ান শুধু প্রচারের মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় পুনরীক্ষণ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, যা মুসলিম-অধ্যুষিত জেলাগুলোকে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাবিত করেছে। মুর্শিদাবাদে ৪,৬০,০০০ নাম মুছে যায়, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩,৩০,০০০ এবং মালদায় ২,৪০,০০০। মোট রাজ্যজুড়ে ৫৮ লাখেরও বেশি নাম অস্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হয়।

বিজেপি এই নাম মোছার প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানায়। শুভেন্দু অধিকারী বলেন তাঁর দল 'মৃত ভোটার, ভুয়া ভোটার ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ভরসায়' নির্বাচন করে না। দ্য কারাভান পর্যবেক্ষণ করে যে এসআইআর প্রক্রিয়া 'অনুমিত অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে নৈতিক আতঙ্কে' ইন্ধন দিয়েছে, দেশভাগ-পূর্ব বাংলার হিন্দু ভোটারদের মধ্যে বিদ্যমান ইসলামোফোবিক মনোভাবকে সক্রিয় করে তুলে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনকে বিজেপির নির্দেশে কাজ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন, এসআইআরকে 'অবৈধ, অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক' বলে অভিহিত করেন। দ্য ডিপ্লোম্যাটের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা যায় নথিপত্র ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও মুসলিম পরিবারগুলো ভোটাধিকার হারিয়েছে।

ভোটের ফলাফলে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যায়। বিজেপির জয় পাওয়া ২০৭ আসনের মধ্যে ১০৫টি আসনে বিজেপি যত ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে তার সংখ্যা এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম। এর মধ্যে ৮৬ আসনে বিজেপি আগে কখনো জিতেনি। 


আসামে অনুপ্রবেশকারী তত্ত্বের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ  

আসামে অনুপ্রবেশকারী বয়ান নির্বাচনী মৌসুমের বহু আগেই সরকারি নীতিতে পরিণত হয়েছিল। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শর্মা সরকার বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারের ২২,০০০টিরও বেশি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় ভূমি দখলের অভিযোগ তুলে। ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ সরকার বুলডোজার নিয়ে প্রচারণায় নামে এবং পঞ্চাশ হাজার একরেরও বেশি জমি থেকে সম্প্রদায়টিকে উচ্ছেদের দাবি করে। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে ২০১৬ সাল থেকে পরিচালিত এনআরসি প্রক্রিয়া ১৯ লাখ মানুষকে তালিকা থেকে বাদ দেয়। এর মধ্যে বাংলাভাষী মুসলমানের সংখ্যা ছিল অসামঞ্জস্যভাবে বেশি। 

বাংলাদেশের ডেইলি স্টার মিয়া সম্প্রদায়ের টিকে থাকার সংকট নিয়ে রিপোর্ট করেছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে আসা অভিবাসীদের উত্তরসূরিদের ব্রিটিশরা নদীতীরের জমি চাষের জন্য বসিয়েছিল। তারা ১৯৫১ সালে অসমীয়াকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিল, এরপরেও তারা বিদেশি তকমায় আটকে আছে। গ্লোবাল ভয়েসেস ২০১৬ সালের এনআরসি প্রক্রিয়া থেকে এই ধারাবাহিক ইতিহাস অনুসরণ করেছে, তুলে ধরেছে কীভাবে বিজেপি আসামের দীর্ঘস্থায়ী জাতীয়তাবাদী উত্তেজনাকে প্রচলিত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে রূপান্তরিত করেছে, এবং মিয়া মুসলমানদের বানিয়েছে স্থায়ী শত্রু।


ভোটের ফলাফলের প্রতিক্রিয়া 

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় উদযাপনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেন, বাংলার জনগণ 'অনুপ্রবেশকারী ও তাদের সহানুভূতিশীলদের এমন শিক্ষা দিয়েছে যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না'।

নির্বাচন-পূর্ব বিশ্লেষণে দ্য ডিপ্লোম্যাট সতর্ক করেছিল যে 'বাংলাদেশের ভূগোলটাই রাজনৈতিক আখ্যানের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে'। আল জাজিরা মূল্যায়ন করেছে যে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা সুসংহত করার সাথে সাথে 'অবৈধ' মুসলিম বাসিন্দাদের উপর দমন-পীড়নের আশঙ্কা আরও ব্যাপক হবে,  যার ঢেউ নয়াদিল্লি ও ঢাকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও পড়তে পারে।





Topics:



‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দের অপব্যাখ্যা করে অনলাইনে প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন আওয়ামীপন্থীরা
৮ অক্টোবর ২০২৬

‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দের অপব্যাখ্যা করে অনলাইনে প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন আওয়ামীপন্থীরা

৩১ বছরের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের নামে প্রচারিত পরজীবী ও বায়োফিল্মের গল্পটি ভুয়া
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৩১ বছরের ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারের নামে প্রচারিত পরজীবী ও বায়োফিল্মের গল্পটি ভুয়া

মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে কাল্পনিক বয়ান ছড়াচ্ছেন সালাহউদ্দীন শোয়েব চৌধুরী
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে কাল্পনিক বয়ান ছড়াচ্ছেন সালাহউদ্দীন শোয়েব চৌধুরী

নিরঞ্জনকে হত্যার কারণ উদঘাটনের আগেই সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করল ভারতীয় গণমাধ্যম
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিরঞ্জনকে হত্যার কারণ উদঘাটনের আগেই সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করল ভারতীয় গণমাধ্যম



নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের কারণে নয়, গ্রেপ্তারে অবহেলার অভিযোগে এসআই ক্লোজড
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তারের কারণে নয়, গ্রেপ্তারে অবহেলার অভিযোগে এসআই ক্লোজড

আপনার মতামত দিন

এই পোস্টটি কি আপনার জন্য সহায়ক ছিল?

এখনো কেউ ভোট দেয়নি। আপনিই প্রথম হোন!

0%

0%

আপনার মতামত শেয়ার করুন:

| মন্তব্য সমূহ:

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!



পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপির জয়ে ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ বয়ানের প্রভাব

বিশ্লেষণ

পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপির জয়ে ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ বয়ানের প্রভাব

৭ মে ২০২৬

<p><span style="font-size: 24px;">পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপির জয়ে ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ বয়ানের প্রভাব</span> <br /></p>

২০২৬ সালের ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়লাভ করেছে। তারা পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিপুল বিজয় লাভ করেছে। ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করেছে তারা। এবং একই সঙ্গে আসামে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা ধরে রাখার কাজও সম্ভব করেছে তারা ৮২টি আসন নিয়ে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই দুটি রাজ্যে বিজেপির জয়ের একটা বিশেষ কারণ হলো, বিজেপির “বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী” তত্ত্ব। বাংলাভাষী মুসলমানদের অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিত্রিত করে এবং তাদের হিন্দু সংস্কৃতি, ভূমি ও গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত রাজনৈতিক প্রচার চালিয়েছে দলটি।  

মাসের পর মাস এসব প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মত বিজেপির নেতারা জনমিতিক আতঙ্ক, নাগরিক বঞ্চনা এবং ইসলাম সম্পর্কে ভীতি ছড়িয়ে ‘ঘুসপেটিয়া’ (অনুপ্রবেশকারী) শব্দটিকে একটি গোটা সম্প্রদায় ও দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত রাজনৈতিক বয়ানে পরিণত করেছেন।  


কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপ্রবেশকারী তত্ত্বের স্বাভাবিকীকরণের সূচনা

দুই রাজ্যে এই কৌশল প্রয়োগের পরিকল্পনা স্পষ্ট হয় ২০২৫ সালের অক্টোবরে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পেট্রাপোলে একটি সীমান্ত ক্রসিং উদ্বোধন করে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের অনুপ্রবেশ বন্ধে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানান। আর ঠিক একই দিনে হেমন্ত শর্মা গুয়াহাটিতে একটি অনুষ্ঠানে একই বার্তা জোরদার করেন। 

পশ্চিমবঙ্গে মোদিসহ বিজেপি নেতারা মুসলমানদের 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' বলে অভিযুক্ত করেন এবং 'অবৈধ অভিবাসীদের' তাড়াতে হিন্দু ঐক্যের আহ্বান জানান। কাউন্টারকারেন্টস-এর একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রচারণায় পশ্চিমবঙ্গকে 'নতুন বাংলাদেশে পরিণত হওয়ার মুখে' বলে দাবি করা হয় এবং তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে 'মুসলিম তোষণের' মাধ্যমে এই পরিস্থিতির সহায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

আসামে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত শর্মা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। তিনি 'অবৈধ বাংলাদেশি মুসলমানদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার' প্রতিশ্রুতি দিলেন, নির্বাচনে ভালো ফলাফলের উপর শর্ত রেখে আরও বড় উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা দিলেন, এবং আসামবাসীকে 'যেকোনো উপায়ে' মিয়া মুসলমানদের 'কষ্ট দেওয়ার' আহ্বান জানালেন, যাতে তারা রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। বাংলাভাষী মুসলমানদের অবজ্ঞা করে ডাকা হয় মিয়া মুসলমান। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি ঘোষণা দেন যে আসামীয় বংশোদ্ভূত নন এমন সকল বাংলাভাষী মুসলমানকে উচ্ছেদ করা হবে। মার্চে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন নির্বাচনের ফলাফল অনুকূল হলে আরও বড় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।


আসামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো 

আসামের এসব প্রচার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছায়, যখন বিজেপির আসাম শাখার আনুষ্ঠানিক সামাজিক গণমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত ভিডিও পোস্ট করা হয়, যেখানে হেমন্ত শর্মাকে দুই মুসলমান পুরুষের ছবিতে রাইফেল দিয়ে গুলি করতে দেখা যাচ্ছে । শিরোনামে লেখা ছিল 'নো মার্সি' ও 'পয়েন্ট ব্লাঙ্ক শট।' গণরোষের মুখে ভিডিওটি মুছে ফেলা হয়। কংগ্রেস এটিকে 'গণহত্যার আহ্বান' বলে অভিহিত করে। একজন বিজেপি সামাজিক মাধ্যম কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। 

তবে একমাস পরে শর্মা তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি পুনরায় পোস্ট করার ঘোষণা দেন। 


পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা নিয়ে বয়ান নির্মাণ 

বিজেপির অনুপ্রবেশকারী বয়ান অনির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের উপর তৈরি করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন রাজ্যের ভোটার তালিকায় দেড় কোটি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। এটি প্রমাণ করা সম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গার মোট সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাবেক সভাপতি দিলীপ ঘোষ এর আগে দাবি করেছিলেন ভারতে দুই কোটি বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কাউকে থাকতে দেওয়া হবে না, তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হবে। 


ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া 

এ বয়ান শুধু প্রচারের মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় পুনরীক্ষণ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, যা মুসলিম-অধ্যুষিত জেলাগুলোকে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাবিত করেছে। মুর্শিদাবাদে ৪,৬০,০০০ নাম মুছে যায়, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩,৩০,০০০ এবং মালদায় ২,৪০,০০০। মোট রাজ্যজুড়ে ৫৮ লাখেরও বেশি নাম অস্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হয়।

বিজেপি এই নাম মোছার প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানায়। শুভেন্দু অধিকারী বলেন তাঁর দল 'মৃত ভোটার, ভুয়া ভোটার ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ভরসায়' নির্বাচন করে না। দ্য কারাভান পর্যবেক্ষণ করে যে এসআইআর প্রক্রিয়া 'অনুমিত অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে নৈতিক আতঙ্কে' ইন্ধন দিয়েছে, দেশভাগ-পূর্ব বাংলার হিন্দু ভোটারদের মধ্যে বিদ্যমান ইসলামোফোবিক মনোভাবকে সক্রিয় করে তুলে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনকে বিজেপির নির্দেশে কাজ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন, এসআইআরকে 'অবৈধ, অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক' বলে অভিহিত করেন। দ্য ডিপ্লোম্যাটের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা যায় নথিপত্র ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও মুসলিম পরিবারগুলো ভোটাধিকার হারিয়েছে।

ভোটের ফলাফলে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যায়। বিজেপির জয় পাওয়া ২০৭ আসনের মধ্যে ১০৫টি আসনে বিজেপি যত ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে তার সংখ্যা এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম। এর মধ্যে ৮৬ আসনে বিজেপি আগে কখনো জিতেনি। 


আসামে অনুপ্রবেশকারী তত্ত্বের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ  

আসামে অনুপ্রবেশকারী বয়ান নির্বাচনী মৌসুমের বহু আগেই সরকারি নীতিতে পরিণত হয়েছিল। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শর্মা সরকার বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারের ২২,০০০টিরও বেশি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় ভূমি দখলের অভিযোগ তুলে। ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ সরকার বুলডোজার নিয়ে প্রচারণায় নামে এবং পঞ্চাশ হাজার একরেরও বেশি জমি থেকে সম্প্রদায়টিকে উচ্ছেদের দাবি করে। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে ২০১৬ সাল থেকে পরিচালিত এনআরসি প্রক্রিয়া ১৯ লাখ মানুষকে তালিকা থেকে বাদ দেয়। এর মধ্যে বাংলাভাষী মুসলমানের সংখ্যা ছিল অসামঞ্জস্যভাবে বেশি। 

বাংলাদেশের ডেইলি স্টার মিয়া সম্প্রদায়ের টিকে থাকার সংকট নিয়ে রিপোর্ট করেছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে আসা অভিবাসীদের উত্তরসূরিদের ব্রিটিশরা নদীতীরের জমি চাষের জন্য বসিয়েছিল। তারা ১৯৫১ সালে অসমীয়াকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিল, এরপরেও তারা বিদেশি তকমায় আটকে আছে। গ্লোবাল ভয়েসেস ২০১৬ সালের এনআরসি প্রক্রিয়া থেকে এই ধারাবাহিক ইতিহাস অনুসরণ করেছে, তুলে ধরেছে কীভাবে বিজেপি আসামের দীর্ঘস্থায়ী জাতীয়তাবাদী উত্তেজনাকে প্রচলিত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে রূপান্তরিত করেছে, এবং মিয়া মুসলমানদের বানিয়েছে স্থায়ী শত্রু।


ভোটের ফলাফলের প্রতিক্রিয়া 

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় উদযাপনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেন, বাংলার জনগণ 'অনুপ্রবেশকারী ও তাদের সহানুভূতিশীলদের এমন শিক্ষা দিয়েছে যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না'।

নির্বাচন-পূর্ব বিশ্লেষণে দ্য ডিপ্লোম্যাট সতর্ক করেছিল যে 'বাংলাদেশের ভূগোলটাই রাজনৈতিক আখ্যানের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে'। আল জাজিরা মূল্যায়ন করেছে যে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা সুসংহত করার সাথে সাথে 'অবৈধ' মুসলিম বাসিন্দাদের উপর দমন-পীড়নের আশঙ্কা আরও ব্যাপক হবে,  যার ঢেউ নয়াদিল্লি ও ঢাকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও পড়তে পারে।